প্রকাশিত : ০৮ জুলাই, ২০২৬ ০১:৪০ (বৃহস্পতিবার)
অশ্রুর দুই রং: মেসির বেঁচে থাকা, মিশরের প্রশ্ন আর এক রাতের অনন্ত বিতর্ক

ছবি: সংগৃহীত

ফুটবলের কিছু রাত শুধু স্কোরলাইন দিয়ে লেখা যায় না। সেগুলো লেখা হয় অশ্রু দিয়ে, হৃদস্পন্দন দিয়ে, আর কিছু অপূর্ণ প্রশ্নের ভার দিয়ে। আর্জেন্টিনা–মিশর ম্যাচটি ছিল ঠিক তেমনই এক রাত; যেখানে শেষ বাঁশির পর কেউ আনন্দে কেঁদেছে, কেউ অবিচারের বেদনায়।

মিশরের ফুটবলার মোস্তফা জিকো। তাঁর চোখেও জল, তবে সেটি ছিল ক্ষোভের, হতাশার এবং হারিয়ে যাওয়া এক স্বপ্নের।

ফুটবল এমনই নিষ্ঠুর। যে রাতে একজন কিংবদন্তি ইতিহাস লেখেন, ঠিক সেই রাতেই আরেকটি দলের কাছে ইতিহাস হয়ে ওঠে বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাস।

শেষ বাঁশি বাজতেই লিওনেল মেসি ভেঙে পড়লেন কান্নায়। একের পর এক সতীর্থ তাঁকে জড়িয়ে ধরছেন, আর তাঁর চোখের জল যেন থামতেই চাইছে না। এই কান্না পরাজয়ের নয়, মুক্তির। মাত্র পনেরো মিনিট আগেও যে মানুষটি হয়তো ভাবছিলেন, বিশ্বকাপের মঞ্চে এটাই তাঁর শেষ সন্ধ্যা, তিনিই আবার নিজের পায়ে লিখলেন নতুন অধ্যায়।

স্কোরবোর্ড তখন বলছে-আর্জেন্টিনা ৩, মিশর ২।

কিন্তু সেই সংখ্যার ভেতরে লুকিয়ে আছে আরও অনেক গল্প।

প্রথম ৭৮ মিনিট ছিল মিশরের। সাহস, শৃঙ্খলা আর গতির এক অসাধারণ প্রদর্শনী। যেন মরুভূমির বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা পিরামিডের মতোই অটল ছিল তাদের রক্ষণ। মোহাম্মদ সালাহ হয়তো গোল করেননি, কিন্তু তাঁর উপস্থিতি আর নেতৃত্বে প্রতিটি পাল্টা আক্রমণ ছিল বিষাক্ত। ইব্রাহিমের হেড, জিকোর নিখুঁত ফিনিশ; সব মিলিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিদায়ের ঘণ্টা যেন বেজে উঠেছিল অনেক আগেই।

আর্জেন্টিনার খেলায় ছিল অস্থিরতা। লিওনেল স্কালোনির কৌশল বারবার থমকে যাচ্ছিল মিশরের সংগঠিত ডিফেন্সে। জুলিয়ান আলভারেজ, ম্যাক অ্যালিস্টার কিংবা অন্যরা নিজেদের খুঁজে পাচ্ছিলেন না। মেসিকে ঘিরে ছিল তিন-চারজনের পাহারা। এমনকি পেনাল্টি থেকেও গোল করতে ব্যর্থ হন তিনি। ফ্রি-কিক গিয়ে লাগে পোস্টে। ভাগ্যও যেন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল।

গ্যালারিতে তখন আর্জেন্টাইন সমর্থকদের চোখে জল। ধারাভাষ্যকারেরা বলতে শুরু করেছেন; আর মাত্র কয়েক মিনিট, তারপর হয়তো বিশ্বকাপে আর দেখা যাবে না মেসিকে।

কিন্তু কিংবদন্তিদের গল্প কখনো সময়ের নিয়ম মেনে চলে না।

৭৯ মিনিটে ডান প্রান্ত থেকে মেসির মাপা ক্রস। ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর হেডে প্রথম আঘাত। চার মিনিট পর আবার মেসি। ফিরতি বলে নিজেই গোল করে ম্যাচে ফেরালেন আর্জেন্টিনাকে। স্টেডিয়ামের বাতাস বদলে গেল। হতাশার ধ্বংসস্তূপে আবার জন্ম নিল বিশ্বাস।

আর যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে লাওতারো মার্তিনেজের নিখুঁত ক্রসে এনজো ফার্নান্দেজের হেড। যেন বজ্রপাত। ২–০ থেকে ৩–২। ফুটবল আবারও প্রমাণ করল; অসম্ভব বলে কিছু নেই।

কিন্তু এই রূপকথার রাতেই জন্ম নিল আরেকটি গল্প-যার নাম বিতর্ক।

ম্যাচ শেষে যতটা আলোচনা হয়েছে আর্জেন্টিনার প্রত্যাবর্তন নিয়ে, প্রায় সমান তীব্রতায় কথা হয়েছে রেফারিং ও VAR নিয়ে।

ম্যাচের শুরুতে আর্জেন্টিনা একটি পেনাল্টি পায়। সমালোচকদের প্রশ্ন, এত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে কেন প্রকাশ্য VAR পর্যালোচনা দেখা গেল না? অন্যদিকে, মিশরের একটি গোল দীর্ঘ VAR রিভিউয়ের পর বাতিল হয়। আক্রমণের শুরুতে ফাউলের ব্যাখ্যায় নেওয়া সেই সিদ্ধান্ত অনেকের কাছেই অস্পষ্ট থেকে গেছে।

শেষ দিকে আরও বড় বিতর্কের জন্ম দেন রেফারি। মিশরের দাবি, পেনাল্টি বক্সে মোহাম্মদ সালাহ স্পষ্ট ফাউলের শিকার হয়েছিলেন। কিন্তু রেফারি খেলা চালিয়ে দেন। VAR থেকেও অন-ফিল্ড রিভিউয়ের আহ্বান আসেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে ক্ষোভ। অনেক সাবেক ফুটবলার ও বিশ্লেষকও প্রশ্ন তোলেন; একই ম্যাচে প্রযুক্তির ব্যবহার কি দুই দলের জন্য সমান ছিল?

অবশ্য এর বিপরীত মতও রয়েছে। অনেকের মতে, VAR প্রতিটি স্পর্শ বা বিতর্কিত মুহূর্তে হস্তক্ষেপ করে না; কেবল ‘স্পষ্ট ও সুস্পষ্ট ভু ‘ থাকলেই করে। ফলে মাঠের রেফারির সিদ্ধান্তই বহাল ছিল।

তবু প্রশ্নগুলো থেকে গেছে।
ম্যাচ শেষে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে গিয়ে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি মিশরের ফরোয়ার্ড মোস্তফা জিকো।

অশ্রুসিক্ত চোখে তিনি বললেন, ‘রেফারি অন্যায় করেছেন, অন্যায় করেছেন। রেফারি একদমই ফেয়ার ছিলেন না। তিনি একজন জালিম। এটি দিবালোকের মতো পরিষ্কার যে আমাদের সঙ্গে অবিচার করা হয়েছে।’

কথাগুলো বলার সময় তাঁর কণ্ঠে ছিল ক্ষোভের কম্পন। যেন পরাজয়ের যন্ত্রণা নয়, বরং বিশ্বাস ভেঙে যাওয়ার বেদনা তাঁকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল।

এরপর আরও কঠিন ভাষায় তিনি বলেন, ‘তিনি একটি দেশের পুরো পরিশ্রমকে এক নিমিষে শেষ করে দিয়েছেন। ম্যাচের শুরু থেকেই তিনি আমাদের বিরুদ্ধে কাজ করেছেন।’ 

ফিফা কিংবা ম্যাচ কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা আসেনি। তাই বিতর্কের আগুনও নিভেনি। পক্ষপাতের অভিযোগ উঠেছে, কিন্তু তার পক্ষে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণও সামনে আসেনি।

হয়তো এটাই ফুটবলের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।

একটি দল ইতিহাসের অন্যতম সেরা প্রত্যাবর্তনের আনন্দে ভাসছে, আরেকটি দল ভাবছে-সব সিদ্ধান্ত যদি একই মানদণ্ডে হতো, তবে গল্পটা কি অন্যরকম হতে পারত?

মেসির কান্না ছিল স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার কান্না।

মিশরের নীরবতা ছিল হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনার।

একদিকে কোটি সমর্থকের উল্লাস, অন্যদিকে লাখো মানুষের প্রশ্ন-প্রযুক্তি কি সত্যিই সবার জন্য সমান?

ইতিহাস হয়তো মনে রাখবে, ওই রাতে লিওনেল মেসি আবারও নিজের জাদুতে আর্জেন্টিনাকে কোয়ার্টার ফাইনালে তুলেছিলেন। কিন্তু ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে একই সঙ্গে থেকে যাবে আরেকটি দৃশ্য; মিশরের খেলোয়াড়দের বিস্মিত দৃষ্টি, প্রতিবাদী হাত, আর উত্তরহীন কিছু প্রশ্ন।

কারণ ফুটবল শুধু গোলের খেলা নয়।

ফুটবল কখনো কখনো এক টুকরো কবিতা, যেখানে আনন্দ আর বেদনা একই পঙ্‌ক্তিতে লেখা থাকে। আবার কখনো তা এক অসমাপ্ত উপন্যাস-যেখানে শেষ বাঁশি বাজলেও বিতর্কের প্রতিধ্বনি অনেক দূর পর্যন্ত শোনা যায়।