ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে আর্জেন্টিনার কাছে ৩-২ গোলে হারের পর রেফারিং নিয়ে ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেছে মিশর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (ইএফএ)। সংস্থাটি বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোর তদন্তের পাশাপাশি ম্যাচের রেফারি ফ্রান্সের ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে ও তার সহকারীদের টুর্নামেন্টের বাকি ম্যাচগুলো থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আবেদন জানিয়েছে।
ম্যাচ শেষে মিশরের প্রধান কোচ হোসাম হাসান অভিযোগ করেন, রেফারির কয়েকটি সিদ্ধান্ত ম্যাচের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলেছে। ইএফএর সভাপতি হানি আবু রিদাও দাবি করেন, ভিএআরের মাধ্যমে মিশরের একটি গোল বাতিল এবং আর্জেন্টিনার তৃতীয় গোলের আগে সম্ভাব্য ফাউল পর্যালোচনা না করাই বিতর্কের মূল কারণ।
তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি ফিফা।
মিসর কোচ হোসাম হাসান দাবি করেন, মিসরের সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে। অভিযোগ করেন, ফিফা ও ম্যাচ কর্মকর্তারা আর্জেন্টিনা এবং লিওনেল মেসিকে টুর্নামেন্টে রাখতে চেয়েছেন।
বলেন, ভিএআরের মাধ্যমে মিসরের দ্বিতীয় গোল অন্যায্যভাবে বাতিল করা হয়েছে। অভিযোগ করেন, আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের আগে আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের ফাউল ভিএআরে দেখা হয়নি। দাবি করেন, মোহাম্মদ সালাহর ওপর ফাউল হলেও পেনাল্টি দেওয়া হয়নি, এমনকি ভিএআরও হস্তক্ষেপ করেনি।
বলেন, আর্জেন্টিনা সব ধরনের সমর্থন পেয়েছে, কিন্তু মিসর ন্যায্য বিচার পায়নি। অভিযোগ করেন, ফ্রান্সের রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়েকে নিয়োগের বিরোধিতা করেছিল মিসর, কারণ ফ্রান্স–আর্জেন্টিনার অতীত সম্পর্ক নিয়ে তাদের শঙ্কা ছিল। ম্যাচ শেষে রেফারিকে সরাসরি বলেন, ‘এটা অন্যায়’ এবং ইঙ্গিত দেন, রেফারির লুকানোর কিছু থাকতে পারে।
ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই টুর্নামেন্টের আর কোনো ম্যাচ তিনি দেখবেন না।
মিসরের ফরোয়ার্ড মোস্তাফা জিকো বলেন, রেফারি শুরু থেকেই মিসরের বিপক্ষে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। অভিযোগ করেন, রেফারি চাননি মিসর জিতুক।
রেফারিকে ‘জুলুম’ করার অভিযোগ তোলেন। দাবি করেন, ম্যাচটি আগেই পাতানো ছিল। ব্যঙ্গ করে বলেন, ‘আর্জেন্টিনাকে আরেকটি বিশ্বকাপ জয়ের আগাম অভিনন্দন’।
তাঁর মতে, ২-০ এগিয়ে থাকার পর থেকেই ধারাবাহিকভাবে মিসরের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে।
ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের সাবেক রেফারি গ্রাহাম স্কট মত দেন, মিসরের বাতিল হওয়া গোলটি বৈধ ছিল। বলেন, মারওয়ান আত্তিয়া ও লিসান্দ্রো মার্তিনেজের সংঘর্ষটি স্বাভাবিক শরীরী লড়াই, ফাউল নয়। তাঁর মতে, ভিএআরের হস্তক্ষেপই ভুল ছিল। বলেন, ঘটনাটি গোলপোস্ট থেকে প্রায় ১০০ গজ দূরে, তাই আর্জেন্টিনার রক্ষণ গুছিয়ে নেওয়ার যথেষ্ট সময় ছিল।
মন্তব্য করেন, এটি ভিএআরের হস্তক্ষেপ করার মতো ‘স্পষ্ট ও পরিষ্কার ভুল’ ছিল না। অভিযোগ করেন, ভিএআর প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পেছনে গিয়ে ঘটনাটি খুঁজে বের করেছে।
তাঁর মতে, ভিএআর তার সীমা অতিক্রম করেছে। সাবেক ফিফা রেফারি মার্ক ক্ল্যাটেনবার্গ বলেন, এটি ফাউল ছিল না। মত দেন, গোল বাতিল করতে ভিএআরের হস্তক্ষেপ করা উচিত হয়নি। মন্তব্য করেন, এ ধরনের ঘটনায় মাঠের রেফারির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত থাকা উচিত ছিল। অভিযোগ করেন, ভিএআর অপ্রয়োজনীয়ভাবে ‘চুলচেরা বিশ্লেষণ’ করেছে। বলেন, চলতি বিশ্বকাপে রেফারিংয়ে ধারাবাহিকতার অভাব রয়েছে। দাবি করেন, আগের ম্যাচগুলোতে একই ধরনের ঘটনায় ভিএআর এত কঠোর ছিল না। মন্তব্য করেন, আর্জেন্টিনা এই সিদ্ধান্ত থেকে স্পষ্ট সুবিধা পেয়েছে। বলেন, বিশ্বজুড়ে অনেক মানুষ এটিকে ভিএআরের অন্যায্য হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখবে।
ম্যাচের ধারাভাষ্যকারদের মতে, এই ঘটনায় ভিএআরের হস্তক্ষেপ করার এখতিয়ার ছিল না। মাঠের রেফারির সিদ্ধান্ত বদলানো উচিত হয়নি বলেও মত দেন। মিসরের সমর্থক ও সামাজিক মাধ্যমে অনেকের অভিযোগ একই ধরনের দুটি ঘটনায় ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মিসরের গোল বাতিল করা হলেও আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের আগে সম্ভাব্য ফাউল উপেক্ষা করা হয়েছে। এতে দ্বৈত মানদণ্ড (Double Standard) প্রয়োগ করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।
সমালোচকদের যুক্তি ছিল; সালাহর পায়ে সংস্পর্শ হয়েছিল। তাই অন্তত ঘটনাটি অন-ফিল্ড রিভিউ (OFR)-তে দেখা উচিত ছিল। তাঁদের মতে, যদি মিসরের গোলের আগে দূরের একটি ফাউল VAR দেখে, তাহলে সালাহর ঘটনাটিও একই গুরুত্বে দেখা উচিত ছিল।
ভিন্নমতও রয়েছে
সাবেক রেফারি অ্যান্ডি ডেভিস (ইএসপিএন বিশ্লেষক) মনে করেন, ভিএআরের সিদ্ধান্ত নিয়ম অনুযায়ী সঠিক ছিল এবং গোল বাতিল করা ঠিক হয়েছে।
ফক্স স্পোর্টসের রেফারিং বিশেষজ্ঞ ড. জো মাচনিক বলেন, একই আক্রমণপর্বে ফাউল থেকে গোল হলে দূরত্ব বা সময় বিবেচ্য নয়, তাই গোল বাতিল করা আইএফএবির নিয়ম অনুযায়ী বৈধ।
ইএসপিএনের রেফারিং বিশ্লেষক অ্যান্ডি ডেভিস এবং ফক্স স্পোর্টসের রেফারিং বিশেষজ্ঞ ড. জো মাচনিক-এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী সালাহ ও আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডারের বুটের মধ্যে কিছু সংস্পর্শ হয়েছিল। তবে সেটি ছিল দুই খেলোয়াড়ের স্বাভাবিক দৌড়ের গতির কারণে হওয়া সংস্পর্শ। ডিফেন্ডারের পক্ষ থেকে অসতর্ক, বেপরোয়া বা ফাউলসুলভ চ্যালেঞ্জের পর্যাপ্ত প্রমাণ ছিল না। তাই রেফারি খেলা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
অন্যদিকে রেফারিং বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে; দুই ঘটনার প্রকৃতি এক নয়। সালাহর ঘটনায় কেবল স্বাভাবিক সংস্পর্শ ছিল, স্পষ্ট ফাউল নয়। আর সংস্পর্শ হওয়ার আগে সালাহ বলের দখল হারিয়ে ফেলেছিলেন। সংস্পর্ষ ঘটিয়ে দখল নেওয়া হয়নি। তাই আইন অনুযায়ী পেনাল্টি না দেওয়া এবং VAR-এর হস্তক্ষেপ না করাই সঠিক সিদ্ধান্ত। আর মিশরের বাতিল করা গোলের ক্ষেত্রে বলের পজিশন ছিল আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়ের পায়ে বল ছিলো। ফাউল করেই বলের দখল নেওয়া হয়েছিল। তাই গোল বাতিল সঠিক সিদ্ধান্ত।