ছবি: সংগৃহীত
জোহরের বিস্তীর্ণ পাম অয়েল বাগান কিংবা সেলাঙ্গরের রাবার বাগানে হাঁটলে মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক সাফল্যের এক নীরব ইতিহাস চোখে পড়ে। দক্ষিণ আমেরিকার অ্যামাজন থেকে আসা রাবার গাছ এবং পশ্চিম আফ্রিকা থেকে আসা তেলপামই আজ দেশটির অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ভিত্তি। একসময় এ দুটিই ছিল ‘অভিবাসী’। অথচ সেই মালয়েশিয়াতেই বিদেশি শ্রমিক, বিশেষ করে অভিবাসীদের নিয়ে বিরূপ মনোভাব ক্রমেই বাড়ছে।
তান শ্রী ওমর সেন্টার ফর এসটিআই পলিসি স্টাডিজ, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটির গবেষক এবং ইউনিভার্সিটি মালয়ার তুংকু আজিজ সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের অ্যাডজাঙ্ক্ট অধ্যাপক প্রফেসর দাতুক ড. আহমদ ইব্রাহিম সম্প্রতি মালয় মেইল-এ প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে এ বৈপরীত্যের বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা অভিবাসী বীজকে ভালোবাসতে শিখেছি, কিন্তু অভিবাসী মানুষকে ভালোবাসতে ভুলে গেছি।’
প্রফেসর আহমদ ইব্রাহিমের মতে, আজকের বিশ্বে অভিবাসীবিরোধী মনোভাবের পেছনে রয়েছে অন্তত তিনটি প্রধান কারণ। প্রথমত, ‘আদিবাসী’ হওয়ার এক কৃত্রিম ধারণা। প্রায় প্রতিটি দেশই এমন একটি জাতীয় ইতিহাস নির্মাণ করেছে, যেখানে মনে হয় দেশ, মাটি ও মানুষ বরাবরই এক ও অভিন্ন ছিল। যুক্তরাষ্ট্র তার ‘প্রতিষ্ঠাতা পিতাদের’ স্মরণ করলেও তাঁরা যে একসময় ব্রিটিশ অভিবাসী ছিলেন, তা খুব কমই আলোচিত হয়। অস্ট্রেলিয়া ‘অ্যানজ্যাক’ ঐতিহ্য উদযাপন করলেও উপনিবেশ স্থাপনের ইতিহাসের অন্ধকার দিকগুলো আড়ালে থেকে যায়। ব্রাজিল বৈচিত্র্যের কথা বললেও দেশের ভেতরের অভ্যন্তরীণ অভিবাসীরাও বৈষম্যের শিকার হন।
তাঁর মতে, প্রতিটি দেশই একসময় আগন্তুকদের নিজেদের সমাজের অংশ হিসেবে গ্রহণ করে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নতুন অভিবাসীদের জন্য দরজা বন্ধ করে দেয়। যেমন, এক শতাব্দীর বেশি আগে মালয়েশিয়ায় আসা তেলপাম আজ ‘দেশীয়’ হিসেবে বিবেচিত হলেও কয়েক বছর আগে আসা একজন শ্রমিক এখনও ‘বিদেশি’।
দ্বিতীয় কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, অর্থনীতির জায়গা দখল করে নেওয়া পরিচয়-রাজনীতিকে। রাবার বা তেলপাম সীমান্ত পেরিয়ে এলে তা অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি বাড়ায়। কিন্তু মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে এলে সঙ্গে নিয়ে আসে ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি ও ভিন্ন পরিচয়। একটি গাছ কখনও ধর্মীয় ছুটি চায় না কিংবা আলাদা খাদ্যব্যবস্থার দাবি তোলে না। কিন্তু একজন অভিবাসী মানুষ দৃশ্যমান, আলাদা এবং সহজেই রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন।
মজুরি স্থবির হয়ে পড়া, আবাসন সংকট বা অর্থনৈতিক চাপের মতো সমস্যার জন্যও প্রায়ই অভিবাসীদের দায়ী করা হয়। অথচ গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদে অভিবাসন অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করে। কিন্তু সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের আশঙ্কা অনেক সময় বাস্তব অর্থনৈতিক তথ্যের চেয়েও বেশি প্রভাব বিস্তার করে।
তৃতীয় কারণ হলো, অভিবাসনের গতি ও ব্যাপকতা। অতীতে রাবার বা তেলপাম ধীরে ধীরে নতুন দেশে এসেছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে যুদ্ধ, দারিদ্র্য, জলবায়ু পরিবর্তন কিংবা রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে মানুষের অভিবাসন ঘটে দ্রুত এবং তাৎক্ষণিকভাবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা সীমান্তে মানুষের ভিড় দেখি, কিন্তু তাদের দেশ ছাড়ার পেছনের কারণগুলো খুব কমই দেখি। ফলে একটি পরিবারের আশ্রয়প্রার্থনাও অনেকের কাছে ‘আক্রমণ’ বলে মনে হয়।
প্রফেসর আহমদ ইব্রাহিম মনে করেন, সবচেয়ে বড় সত্য হলো আজ যে দেশগুলো অভিবাসীদের বিরোধিতা করছে, তাদের প্রায় প্রত্যেকটির উন্নয়ন ও রাষ্ট্রগঠন অভিবাসীদের হাত ধরেই হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রান্সকন্টিনেন্টাল রেলপথ নির্মাণে আইরিশ ও চীনা শ্রমিকদের অবদান, অস্ট্রেলিয়ার যুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে গ্রিক, ইতালীয় ও ভিয়েতনামি অভিবাসীদের ভূমিকা কিংবা ব্রাজিলের কফি শিল্পে জাপানি ও লেবানিজ অভিবাসীদের অবদান তারই উদাহরণ।
একইভাবে মালয়েশিয়ার রাবার ও পাম অয়েল শিল্প এখনও ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ ও নেপালের শ্রমিকদের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তাদের ছাড়া বাগান, কারখানা এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো বড় ধরনের সংকটে পড়বে।
তিনি লিখেছেন, অভিবাসীদের প্রতি বিরূপ মনোভাব অর্থনৈতিক প্রয়োজন নয়; বরং এটি একটি নৈতিক ব্যর্থতা। মানুষ গাছকে সহজেই গ্রহণ করতে পারে, কিন্তু মানুষকেই গ্রহণ করতে চায় না। অথচ ইতিহাস বলছে, দুই-তিন প্রজন্ম পর অভিবাসীরাই নতুন সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। মালয়েশিয়ার তেলপাম আজ আর আফ্রিকাকে মনে রাখে না, রাবার গাছও অ্যামাজনের কথা ভাবে না।
প্রবন্ধের শেষাংশে তিনি সতর্ক করে বলেন, অভিবাসীবিরোধী এই মনোভাব একদিন হয়তো কেটে যাবে। কিন্তু সেই সময়ের মধ্যে সমাজ ও রাষ্ট্র কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের মূল্যায়ন করবে কীভাবে মানবসম্পদকে লালনকারী দূরদর্শী সমাজ হিসেবে, নাকি এমন সংকীর্ণ মানসিকতার জাতি হিসেবে, যারা মানুষকে নয়, গাছকেই বেশি ভালোবেসেছিল।