প্রকাশিত : ২০ জুলাই, ২০২৬ ০৪:২৭ (মঙ্গলবার)
মেসি যুগের শেষ প্রহর, ইয়ামালের সূর্যোদয়: স্পেনের রাজত্বে স্তব্ধ আর্জেন্টিনা

ছবি: সংগৃহীত

ফুটবল কখনো কখনো এমন এক নির্মম নাটক মঞ্চস্থ করে, যেখানে কিংবদন্তির বিদায় আর নতুন যুগের সূচনা একই সন্ধ্যায় লেখা হয়। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল ছিল তেমনই এক রাত। এক পাশে ছিলেন লিওনেল মেসি; দুই দশক ধরে ফুটবলকে নিজের জাদুতে মোহিত করে রাখা এক মহাতারকা। অন্য পাশে ছিল তরুণ স্পেন, যার প্রতীক হয়ে উঠেছেন লামিন ইয়ামালদের নতুন প্রজন্ম।

শেষ পর্যন্ত ইতিহাস লিখল স্পেন। অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে আর্জেন্টিনাকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের শিরোপা জিতে নিল লা রোজারা। আর হৃদয়ভাঙা পরাজয়ের মধ্য দিয়েই ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসির বিশ্বকাপ অধ্যায়ের পর্দা নেমে গেল।

তবে এটি শুধু একটি ফাইনালের পরাজয় ছিল না; এটি ছিল আধিপত্যের এক নির্মম প্রদর্শনী।

শুরু থেকেই স্পেন বলের দখল, পাস, আক্রমণ, ছন্দ; সবকিছুতেই আর্জেন্টিনাকে ছাপিয়ে যায়। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে ৬৪ শতাংশ বল নিজেদের দখলে রেখেছিল স্পেন। আর্জেন্টিনা যেন নিজের ছায়াকেও খুঁজে পায়নি। পুরো ম্যাচের ১১৬ মিনিট পর্যন্ত তারা প্রতিপক্ষের গোলে একটি শটও নিতে পারেনি। বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে এমন পরিসংখ্যান নজিরবিহীন।

অপটার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৬ সালে বিস্তারিত পরিসংখ্যান সংরক্ষণ শুরু হওয়ার পর এই প্রথম কোনো দল বিশ্বকাপ ফাইনালের প্রথম ৯০ মিনিটে লক্ষ্যে একটি শটও রাখতে পারেনি। শুধু তাই নয়, প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা একবারও স্পেনের পেনাল্টি বক্সে বল স্পর্শ করতে পারেনি; যা বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল ঘটনা।

ম্যাচের সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম যদি কেউ হয়ে থাকেন, তবে তিনি আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। একের পর এক অবিশ্বাস্য সেভ করে তিনি একাই দলকে ম্যাচে টিকিয়ে রেখেছিলেন। নির্ধারিত সময়ে স্পেনের লক্ষ্যে নেওয়া ১০টি শটই ঠেকিয়ে দেন তিনি। বিশ্বকাপ ফাইনালে এটি নতুন রেকর্ড। শেষ পর্যন্ত তার সব বীরত্ব ম্লান হয়ে যায় ১০৬ মিনিটে। নিকো উইলিয়ামসের নিখুঁত পাস থেকে বদলি খেলোয়াড় ফেরান তোরেস গোল করে স্পেনকে এগিয়ে দেন। পরে আরও একটি গোল করলেও অফসাইডের কারণে সেটি বাতিল হয়।

আর্জেন্টিনার পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে ইনজুরি সময়ে এনজো ফার্নান্দেজ দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লে। ১০ জনের দল নিয়ে অতিরিক্ত সময়ে তারা আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।

এই ফাইনালে লিওনেল মেসিকেও যেন খুঁজে পাওয়া যায়নি। স্পেনের সুশৃঙ্খল মার্কিং ও মাঝমাঠের চাপ তার সৃষ্টিশীলতাকে পুরোপুরি আটকে দেয়। যিনি বছরের পর বছর এক মুহূর্তে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিয়েছেন, সেই মেসি এই রাতে ছিলেন নিস্তেজ। স্পেন যেন তাকে ‘বোতলবন্দী’ করে রেখেছিল।

আর্জেন্টিনার ব্যর্থতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে পরিসংখ্যানে। পুরো ম্যাচে বলের দখল মাত্র ৩৪ শতাংশ, লক্ষ্যে শট শূন্য, আক্রমণের তীব্রতা প্রায় নেই বললেই চলে। ম্যাচে আর্জেন্টিনার হয়ে সবচেয়ে বেশি বল স্পর্শ করেছেন গোলরক্ষক মার্টিনেজ; যা স্পেনের একতরফা আধিপত্যেরই প্রতিচ্ছবি।

অন্যদিকে, স্পেন শুধু ফাইনালেই নয়, পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই ছিল সবচেয়ে পরিপূর্ণ দল। রক্ষণে দৃঢ়তা, মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ, আক্রমণে ধার; সব মিলিয়ে তারা ছিল সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দল। ফলে শিরোপা যে যোগ্য দলের হাতেই উঠেছে, তা নিয়ে বিতর্কের সুযোগ খুবই কম।

তবে আর্জেন্টিনার এই যাত্রা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নকআউট পর্বে তুলনামূলক সহজ পথ পেরিয়ে তারা ফাইনালে উঠলেও শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়ে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারালেও সেই ম্যাচে রেফারিং নিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে নানা বিতর্ক হয়েছিল। টুর্নামেন্টের আরও কয়েকটি ম্যাচ; বিশেষ করে জর্ডান, মিশর ও সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে; রেফারিং নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মাধ্যমে সমালোচনা দেখা যায়। তবে এসব অভিযোগের অনেকগুলোর স্বাধীন বা আনুষ্ঠানিক প্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি। তাই এগুলোকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে নয়, বিতর্ক ও জনআলোচনার অংশ হিসেবেই দেখা উচিত।

ফাইনালে অবশ্য কোনো বিতর্কের অবকাশ রাখেনি স্পেন। তারা ফুটবল খেলেছে আধিপত্যের, নিয়ন্ত্রণের এবং ধৈর্যের। আর্জেন্টিনা ছিল নিষ্প্রভ, স্পেন ছিল নির্ভুল।

ফুটবলের ইতিহাসে কিছু রাত থাকে, যেগুলো শুধু ফলাফলের জন্য নয়, একটি যুগের সমাপ্তি আর আরেকটি যুগের সূচনার জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকে। ২০২৬ সালের এই বিশ্বকাপ ফাইনাল তেমনই এক অধ্যায়।

সেই রাতে নিউ জার্সির আকাশে শুধু একটি ট্রফিই উড়েনি; বিদায় নিয়েছে মেসির বিশ্বকাপের মহাকাব্য, আর আরও উজ্জ্বল হয়েছে স্পেনের নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন। ফুটবল যেন নীরবে বলেছে; রাজারা বিদায় নেন, কিন্তু খেলার রাজত্ব কখনো শূন্য থাকে না।