প্রকাশিত : ২০ জুলাই, ২০২৬ ০৪:৫১ (মঙ্গলবার)
আর্জেন্টিনার বিতর্কের পথচলার শেষ লজ্জার রেকর্ডে, স্পেনের মাথায় বিশ্বমুকুট

ছবি: সংগৃহীত

২০২২ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা এসেছিল ইতিহাসের দরজায় কড়া নাড়তে। ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালে ইতালি, ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে পেলের ব্রাজিলের পর টানা দুইবার বিশ্বকাপ জিতে অমরত্বের কাতারে নাম লেখানোর হাতছানি ছিল তাদের সামনে। আর সেই স্বপ্নের কেন্দ্রে ছিলেন লিওনেল মেসি; যার বিশ্বকাপ অধ্যায়ের শেষ পৃষ্ঠা লেখার অপেক্ষায় ছিল পুরো ফুটবল বিশ্ব।

কিন্তু ইতিহাস সবসময় রূপকথা লেখে না।

২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে আক্রমণে সম্পূর্ণ নিষ্প্রভ ছিল আর্জেন্টিনা। ম্যাচের নির্ধারিত ৯০ মিনিটে একটিও শট নিতে পারেনি লিওনেল স্কালোনির দল, যা বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। শুধু তাই নয়, অতিরিক্ত সময়ের ১৫ মিনিটও, অর্থ্যাৎ ১০৫ মিনিট পর্যন্ত কোনো শট নিতে পারেনি তারা।

এর মাধ্যমে বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে প্রথম দল হিসেবে ৯০ মিনিট শেষ করার পর ১০৫ মিনিটেও কোনো শট নিতে না পারার রেকর্ড গড়ল আর্জেন্টিনা।

ফাইনালে অপেক্ষা করছিল এমন এক স্পেন, যারা পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই ছিল সবচেয়ে সংগঠিত, সবচেয়ে ধারাবাহিক এবং সবচেয়ে আধিপত্য বিস্তারকারী দল। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের গোলে ১-০ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে নেয় লা রোজা। আর হৃদয়ভাঙা পরাজয়ের মধ্য দিয়েই শেষ হয় মেসির বিশ্বকাপ যাত্রা।

তবে এই ফাইনাল কেবল একটি ট্রফির লড়াই ছিল না; এটি ছিল পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে চলা বিতর্কেরও এক নীরব বিচার।

বিশ্বকাপ শুরুর আগেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল তথাকথিত ‘রোড ম্যাপ বিতর্ক’। ড্রয়ের পর দেখা যায়, সেমিফাইনালের আগে কোনো ঐতিহ্যবাহী পরাশক্তির মুখোমুখি হতে হয়নি আর্জেন্টিনাকে। অনেক ফুটবল বিশ্লেষক ও সমর্থকের দাবি ছিল, আলবিসেলেস্তেদের পথ যেন তুলনামূলকভাবে অনেক সহজ হয়ে গেছে।

এরপর মাঠে বল গড়াতেই শুরু হয় নতুন বিতর্ক।

আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে কঠোর ফাউলের পরও কার্ড না দেখানো, কেপ ভার্দের বিপক্ষে কিছু সিদ্ধান্ত, মিশরের বিপক্ষে বিতর্কিত পেনাল্টি, মিশরের একটি গোল বাতিল এবং সালাহর দাবিকৃত পেনাল্টি না পাওয়া; এসব ঘটনা আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করে। পরে সুইজারল্যান্ড ম্যাচেও একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়রা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জন্ম নেয় নতুন শব্দ ‘FIFAntina’। সমালোচকদের দাবি ছিল, গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সিদ্ধান্তগুলো যেন বারবার আর্জেন্টিনার পক্ষেই যাচ্ছে। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে ফিফা কখনো কোনো অনিয়ম স্বীকার করেনি এবং অভিযোগগুলোরও কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ প্রকাশ পায়নি, তবু বিতর্কের আগুন টুর্নামেন্টজুড়েই জ্বলেছে।

ফুটবল ইতিহাসও যেন এই বিতর্ককে নতুন করে উসকে দেয়। ১৯৭৮ সালের পেরু ম্যাচ, ১৯৮৬ সালের ‘হ্যান্ড অব গড’, ১৯৯০ সালের তথাকথিত ‘হোলি ওয়াটার’ বিতর্ক; আর্জেন্টিনার অতীতের নানা অধ্যায় আবারও আলোচনায় ফিরে আসে। সমর্থকদের কাছে এগুলো ইতিহাস, সমালোচকদের কাছে বিতর্কের ধারাবাহিকতা।

কিন্তু ফাইনালে আর্জেন্টিনা ছিল যেন নিজের ছায়া।

১২০ মিনিট ফুটবল খেলেও প্রতিপক্ষের গোলমুখে একটি শট পর্যন্ত নিতে পারেনি তারা। বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে এমন দৃশ্য বিরল। বল দখল, পাস, আক্রমণ, ফাইনাল থার্ডে প্রবেশ; প্রতিটি পরিসংখ্যানে স্পেন ছিল বহু যোজন এগিয়ে।

যদি কোনো আর্জেন্টাইনকে সেই রাতে নায়ক বলা যায়, তবে তিনি এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। একের পর এক অবিশ্বাস্য সেভ করে তিনি একাই ম্যাচটিকে অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যান। অন্যথায় নির্ধারিত সময়েই হয়তো বড় ব্যবধানে হারতে হতো।

কিন্তু একজন গোলরক্ষক একা কতক্ষণ লড়বেন? 

১০৬ মিনিটে নিকো উইলিয়ামসের পাস থেকে ফেরান তোরেস যখন জালের ঠিকানা খুঁজে নিলেন, তখন যেন আর্জেন্টিনার স্বপ্নটাও নিভে গেল।

শেষ পর্যন্ত ফুটবলই জিতেছে

এই ফাইনালের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হয়তো রয়ে যাবে; স্পেনের মতো একটি পূর্ণাঙ্গ দলের বিপক্ষে যদি আর্জেন্টিনা এতটাই নিষ্প্রভ হয়, তবে টুর্নামেন্টের শুরুতেই যদি এমন প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতো, তাহলে কি তারা ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারত?

এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো কখনো জানা যাবে না।

কিন্তু একটি উত্তর মাঠ নিজেই দিয়ে দিয়েছে।

বিতর্ক, সমালোচনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রল কিংবা ষড়যন্ত্রের অভিযোগ; এসবের কোনোটিই শেষ পর্যন্ত ট্রফি জেতাতে পারেনি। ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে জয়ী হয়েছে সেই দল, যারা মাঠে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছে।

এই ফাইনাল যেন মনে করিয়ে দিল, ইতিহাসের পাতায় বিতর্ক জায়গা করে নিতে পারে, কিন্তু বিশ্বকাপের ট্রফি জেতে কেবল সেই দল, যারা মাঠে প্রতিপক্ষকে হারাতে পারে।

সেদিন স্পেন সেটাই করেছে।

আর আর্জেন্টিনা? তারা ইতিহাসের খুব কাছে গিয়েও থেমে গেছে। টানা দুই বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন, মেসির শেষ নৃত্য, বিতর্কের দীর্ঘ ছায়া; সবকিছু মিলিয়ে তাদের ২০২৬ বিশ্বকাপ অভিযান শেষ হয়েছে এক অসমাপ্ত মহাকাব্যের মতো।

ফুটবল তাই আবারও তার চিরন্তন সত্য উচ্চারণ করেছে; মাঠই শেষ বিচারক। সেখানে কোনো বিতর্ক, কোনো অভিযোগ, কোনো গল্প নয়; শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে শুধু ফুটবল।