গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংস্কার না করলে বর্তমান বিএনপি সরকার তাদের পাঁচ বছরের মেয়াদ সম্পূর্ণ করতে পারবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।
শনিবার (২৫ জুলাই) বিকেলে সিলেট নগরীর সরকারি আলিয়া মাদরাসা মাঠে আয়োজিত ১১ দলীয় জোটের বিভাগীয় মহাসমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। জুলাই গণহত্যার বিচার, সংবিধান সংস্কার এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
বক্তব্যের শুরুতেই ভারতে চলমান ছাত্র আন্দোলনের মুখে সে দেশের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের প্রসঙ্গ টেনে নাহিদ ইসলাম বলেন, "ভারতের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে কয়েক সপ্তাহ ধরে আন্দোলন চলছিল। সেই আন্দোলনের মুখে শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। আমরা বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার পক্ষ থেকে, জুলাই বিপ্লবীদের পক্ষ থেকে ভারতের আন্দোলনরত ছাত্র-তরুণদেরকে সাধুবাদ জানাই, আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই। জুলাই বিপ্লব দেশ থেকে দেশে ছড়িয়ে যাচ্ছে।"
তিনি অভিযোগ করেন, জুলাই বিপ্লবের পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশের সরকার যেখানে ছাত্র-জনতার প্রতি সতর্ক ও শ্রদ্ধাশীল হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার তার উল্টো পথে হাঁটছে। গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষ সংস্কারের পক্ষে রায় দিলেও সরকার সেই রায়কে অবজ্ঞা করছে।
বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, "এই সরকার যদি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন না করে, আগামী পাঁচ বছরের মেয়াদ তারা সম্পূর্ণ করে যেতে পারবে না।"
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উদ্দেশে তিনি বলেন, "তিনি কি পাঁচ বছর নির্বাচিতভাবে ক্ষমতায় থাকতে চান, নাকি শেখ হাসিনাসহ পৃথিবীর অন্যান্য জায়গায় জনগণের রায়কে উপেক্ষা করার যে করুণ পরিণতি হচ্ছে, সেই পরিণতি তিনি ভোগ করতে চান- সিদ্ধান্ত তারেক রহমানকেই নিতে হবে।"
দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি নিজ দলের অভ্যন্তরে কোনো সংস্কার আনেনি এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কারের ন্যূনতম ঐকমত্য মেনে নেয়নি বলে অভিযোগ করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, "যদি সে জুলাই বিপ্লবকে ভুলে যায়, যদি সে ছাত্র-তরুণদের আন্দোলনকে ভুলে যায়, যদি এ দেশের হাজারো মানুষের আত্মত্যাগকে ভুলে যায়, তাহলে তার পরিণতি বিএনপি ও তারেক রহমানের সরকারকেই ভোগ করতে হবে।"
সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে 'সংস্কার বনাম সংশোধন' বিতর্কের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ঐকমত্য কমিশনে সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে সংশোধনের মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিবর্তন সম্ভব নয়, এ জন্য সংস্কার পরিষদ বা গণপরিষদ প্রয়োজন। কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পর বিএনপি সংস্কারের প্রশ্ন ভুলে শুধু সংশোধনের কথা বলছে। বিএনপি তাদের '৩১ দফা'র মুলা ঝুলিয়ে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
দেশের অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংকটের কথা তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বলেন, ঢাকায় তীব্র গ্যাস সংকট চলছে। অন্যদিকে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও সিলিন্ডারের মূল্যবৃদ্ধি করে সাম্প্রতিক বাজেটে মধ্যবিত্তের ওপর করের বোঝা চাপানো হয়েছে। সরকার প্রয়োজনীয় সংস্কার না করায় অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও পাওয়া যাচ্ছে না।
নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি দাবি করেন, সরকার নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ করছে। এ কারণে আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগেই নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন অথবা বর্তমান কমিশনারদের পদত্যাগ করতে হবে।
উল্লেখ্য, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের দেশব্যাপী ধারাবাহিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে সিলেটে এই মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম-এর সভাপতিত্বে সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকসহ ১১ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারা। এই সমাবেশের মধ্য দিয়েই জোটের বর্তমান দফার ধারাবাহিক বিভাগীয় কর্মসূচি সম্পন্ন হলো।