প্রকাশিত : ২৫ জুলাই, ২০২৬ ২১:১২ (রবিবার)
এইচএসসি রসায়ন দ্বিতীয় পত্রে ৮ সৃজনশীল প্রশ্নের ৪টিতেই ভুল

ছবি: সংগৃহীত

আন্দোলন, নানা আলোচনা-সমালোচনা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেও গত বুধবার (২২ জুলাই) অনুষ্ঠিত হয়েছে ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের রসায়ন দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা। তবে পরীক্ষা শেষে প্রশ্নপত্রে একাধিক ভুল ধরা পড়ায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর আগে পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের প্রশ্নেও ভুল থাকার কারণে পরীক্ষার্থীদের পূর্ণ নম্বর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

প্রশ্নপত্র বিশ্লেষণ এবং রসায়ন বিষয়ের একাধিক শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সৃজনশীল ও বহুনির্বাচনী- উভয় অংশেই একাধিক ত্রুটি রয়েছে, যা পরীক্ষার্থীদের বিভ্রান্তিতে ফেলেছে এবং মূল্যবান সময় নষ্ট করেছে।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, সৃজনশীল প্রশ্নের ১ নম্বর উদ্দীপকের (ii) অংশে বিক্রিয়ক থেকে চারটি উৎপাদ তৈরি হলেও কোন উৎপাদের ভর ২.৫ গ্রাম তা উল্লেখ করা হয়নি। ফলে জারকের ভর নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি।

৫ নম্বর উদ্দীপকে ‘পাত্র-১’ উল্লেখ থাকলেও ‘গ’ ও ‘ঘ’ প্রশ্নে সেটিকে ‘A-পাত্র’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা পরীক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করেছে।

এছাড়া ৬ নম্বর উদ্দীপকের ‘গ’ প্রশ্নে ২৫০ মিলিলিটার গ্যাস উৎপন্ন করতে প্রয়োজনীয় মাতৃ যৌগের পরিমাণ নির্ণয়ের জন্য গ্যাসের তাপমাত্রা ও চাপের তথ্য দেওয়া হয়নি। একই উদ্দীপকের ‘ঘ’ প্রশ্নে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী CO₂ গ্যাসের জন্য Z = 4.0 পাওয়া যায়, যা বাস্তব গ্যাসের ধর্ম এবং তরলীকরণ তত্ত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে জানিয়েছেন শিক্ষকরা।

৮ নম্বর উদ্দীপকের ‘ঘ’ প্রশ্নে ‘ভ্যান ডার ওয়ালস সমীকরণ’কে ‘আদর্শ গ্যাসের সমন্বয় সমীকরণ’-এর পরিবর্তিত রূপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা সংজ্ঞাগতভাবে ভুল। যদিও দেশের কিছু পাঠ্য ও সহায়ক বইয়ে বিষয়টি ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

শুধু সৃজনশীল নয়, বহুনির্বাচনী অংশেও ভুল পাওয়া গেছে। যমুনা (ঘ) সেটের ১০ নম্বর প্রশ্নে প্রদত্ত বিকল্পগুলোর মধ্যে কোনো সঠিক উত্তর নেই বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা। তাদের দাবি, পাঠ্যবই অনুযায়ী কেবল iii সঠিক হলেও i ও ii সঠিক নয়।

পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী ইমতিয়াজ নোমান বলেন, ‘কয়েকটি প্রশ্নের তথ্যই বুঝতে পারছিলাম না। বোর্ড পরীক্ষার প্রশ্ন ভুল হতে পারে- এটা বিশ্বাস করতে পারিনি। তাই অনেক সময় নষ্ট হয়েছে। শেষ পর্যন্ত অনুমান করে উত্তর দিতে হয়েছে।’

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মিশু খান ফেসবুকে মন্তব্য করেন, ‘এর আগেও পরীক্ষায় কিছু নম্বর বোনাস পেয়েছি, এবারও কিছু নম্বর বোনাস পাব। এটাই সায়েন্স।’

অনলাইনভিত্তিক রসায়ন শিক্ষক আরিফ হক বলেন, প্রশ্নপত্রে ভুলের ঘটনা নতুন নয়। তবে এসব ভুল পরীক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করে এবং পরীক্ষার সময় অযথা সময় নষ্ট করে।

তিনি বলেন, ‘এই ভুলগুলো শুধু প্রশ্নপ্রণেতাদের নয়; অনেক ক্ষেত্রে সিলেবাস ও কিছু পাঠ্যবইয়ের অসঙ্গতিরও প্রতিফলন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় মেধাবী শিক্ষার্থীরা। তারা প্রশ্নের অসঙ্গতি নিয়ে বেশি ভাবতে গিয়ে সময় হারায়, ফলে তাদের ফলাফলেও প্রভাব পড়ে।’

এ বিষয়ে জানতে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক জেসমিন তাসলিমা বানুর সঙ্গে অন্তত পাঁচবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

এছাড়া আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামানের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

এদিকে প্রশ্নপত্রে ধারাবাহিকভাবে ভুল ধরা পড়ায় পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা ও প্রশ্ন প্রণয়নের মান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষকদের দাবি, ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে প্রশ্ন প্রণয়ন ও যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়াকে আরও কঠোর ও নির্ভুল করতে হবে, যাতে পরীক্ষার্থীদের মেধা সঠিকভাবে মূল্যায়িত হয়।