প্রকাশিত : ২৫ জুলাই, ২০২৬ ২২:৫১ (রবিবার)
মালয়েশিয়া থেকে প্রায় ৫ হাজার মিয়ানমার নাগরিককে জান্তার কাছে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা

ছবি: সংগৃহীত

মালয়েশিয়ার অভিবাসন আটককেন্দ্রে (ইমিগ্রেশন ডিপো) থাকা প্রায় পাঁচ হাজার মিয়ানমারের নাগরিককে দেশটির সামরিক জান্তা সরকারের কাছে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা করছে মালয়েশিয়া। বিষয়টি নিয়ে দেশটিতে অবস্থানরত মিয়ানমারের শরণার্থী ও অভিবাসী শ্রমিকদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

মালয়েশিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাতুক লুকানিসমান আওয়াং গত ২৩ জুলাই সিনেটে এ তথ্য জানান।

মালয়েশিয়ার সংবাদমাধ্যম ফ্রি মালয়েশিয়া টুডেসহ একাধিক গণমাধ্যম তার বক্তব্য প্রকাশ করেছে।

উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, মিয়ানমারের সামরিক সরকার এসব নাগরিককে গ্রহণে সম্মত হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চূড়ান্ত হলে মিয়ানমারের নৌবাহিনীর জাহাজ তাদের নিতে মালয়েশিয়ায় আসবে।

মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত রাখাইন অঞ্চলের এক অভিবাসী অধিকারকর্মী বলেন, ‘ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের মধ্যে কিছুজনকে কালো তালিকাভুক্ত (ব্ল্যাকলিস্ট) করা হবে, যাতে তারা পুনরায় মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করতে না পারেন। তবে বৈধ পাসপোর্ট থাকলে কেউ কেউ ভবিষ্যতে আইনগতভাবে আবার মালয়েশিয়ায় আসার সুযোগ পেতে পারেন।’

দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক সংকট, গৃহযুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে হাজার হাজার মিয়ানমারের নাগরিক প্রতিবেশী দেশগুলোতে, বিশেষ করে মালয়েশিয়ায় আশ্রয় নিচ্ছেন। এর মধ্যে গণহারে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা শরণার্থী ও অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।

এরই মধ্যে গত ২৩ জুলাই মালয়েশিয়া সরকার নতুন করে আগত শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)-এর নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র (রিফিউজি কার্ড) প্রদান কার্যক্রম স্থগিতের নির্দেশ দেয়। ফলে যেসব মিয়ানমার নাগরিক এখনো শরণার্থী হিসেবে নিবন্ধনের অপেক্ষায় রয়েছেন, তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।

মালয়েশিয়ায় মিয়ানমারের নাগরিকদের সহায়তাকারী এক কাচিন মানবিক কর্মী বলেন, ‘যাদের ফেরত পাঠানো হতে পারে তাদের অনেকের শরণার্থী আবেদন এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। চরম অসহায় পরিস্থিতির কারণে তারা নিজ দেশ ছেড়ে জীবিকার সন্ধানে মালয়েশিয়ায় এসেছেন। বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত হতাশাজনক।’

এদিকে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন অভিযোগ করেছে, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া থেকে অতীতে যেসব মিয়ানমার নাগরিককে ফেরত পাঠানো হয়েছিল, তাদের অনেককে দেশে ফিরে সামরিক বাহিনীতে জোরপূর্বক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত আরেক রাখাইন শরণার্থী অধিকারকর্মী বলেন, মিয়ানমারে কাউকে ফেরত পাঠানো মানে তাকে কার্যত মৃত্যুঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া। বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ আইন কার্যকর থাকায় ফেরত যাওয়া ব্যক্তিরা জান্তা বাহিনীর নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। আন্তর্জাতিক মানবিক মানদণ্ড অনুসারে শরণার্থীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য তিনি মালয়েশিয়া সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে ২০২৬ সালের জুন মাসের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ হাজার মিয়ানমারের নাগরিককে দেশটির সামরিক সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

এ ধরনের প্রত্যাবাসন নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বহুবার মালয়েশিয়া সরকারের সমালোচনা করেছে। তাদের অভিযোগ, চলমান সংঘাত ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মুখে শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো আন্তর্জাতিক মানবিক নীতির পরিপন্থী।

যদিও মালয়েশিয়া জাতিসংঘের ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশনের সদস্য নয়, তবুও দীর্ঘদিন ধরে মানবিক বিবেচনায় ইউএনএইচসিআরকে শরণার্থীদের নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র দেওয়ার অনুমতি দিয়ে আসছিল। তবে অবৈধ অভিবাসন ও জাতীয় নিরাপত্তার উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে সম্প্রতি সরকার ইউএনএইচসিআরের নিবন্ধন কার্যক্রম স্থগিত এবং অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে প্রত্যাবাসন কার্যক্রম জোরদারের পদক্ষেপ নিয়েছে।