প্রকাশিত : ২৯ জুলাই, ২০২৬ ১১:৫২ (বৃহস্পতিবার)
৫ হাজার ভিসা বাতিলের খবরে ভেঙে পড়ছেন আমিরাত প্রবাসী বাংলাদেশীরা

ছবি: এআই

বিমানটি যখন আবুধাবির মাটিতে নামল, তখন হয়তো তাহের হোসেনের মনে ছিল শুধু একটি চিন্তা; আবার কাজে ফিরবেন, মাস শেষে বেতন পাবেন, দেশের বাড়িতে থাকা বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী আর সন্তানের মুখে হাসি ফুটবে। দুই বছর পর এক মাসের ছুটি কাটিয়ে ফিরে আসা এই প্রবাসীর ব্যাগে ছিল পরিবারের ভালোবাসা, আর হৃদয়ে ছিল নতুন করে সংগ্রাম শুরু করার প্রত্যয়।

কিন্তু ভাগ্য যেন তার জন্য অন্য গল্প লিখে রেখেছিল।

ইমিগ্রেশন কাউন্টারে কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বদলে যায় আট বছরের প্রবাসজীবনের বাস্তবতা। কর্মকর্তা জানিয়ে দেন; তার কর্মভিসা বাতিল হয়ে গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রবেশের অনুমতি নেই। ফিরে যেতে হবে বাংলাদেশে।

বিমানবন্দরের ব্যস্ততার মাঝেও তখন একজন মানুষের পৃথিবী যেন থমকে দাঁড়ায়। চোখের সামনে ভেসে ওঠে ঋণের কিস্তি, সন্তানদের ভবিষ্যৎ, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের চিকিৎসা আর সংসারের অগণিত দায়। শেষ পর্যন্ত স্বপ্নভঙ্গের ভার কাঁধে নিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে আবার ফিরতে হয় দেশে।

তাহের হোসেন বলেন, ‘দুই বছর পর পরিবারের সঙ্গে এক মাস কাটিয়ে কাজে ফিরছিলাম। আবুধাবিতে নেমে জানতে পারলাম আমার ভিসা বাতিল। মনে হলো সব শেষ হয়ে গেছে। এখন কীভাবে সংসার চলবে, কীভাবে ঋণ শোধ করব, কিছুই বুঝতে পারছি না।’

তবে এই কান্না শুধু তাহেরের নয়। এটি আজ হাজারো বাংলাদেশি প্রবাসীর অজানা আতঙ্কের প্রতিধ্বনি।

সংযুক্ত আরব আমিরাতে কর্মরত প্রায় ১০ লাখের বেশি বাংলাদেশি শ্রমিকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে গভীর উদ্বেগ। পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই অনেকের কর্মভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কেউ বাংলাদেশে ছুটি কাটিয়ে কর্মস্থলে ফিরতে গিয়ে, আবার কেউ আমিরাতে নেমে ইমিগ্রেশন পার হওয়ার সময় জানতে পারছেন; তাদের ভিসা আর কার্যকর নেই।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, অনেকের নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক থাকা সত্ত্বেও এই ভিসা বাতিলের ঘটনা ঘটছে। ফলে প্রবাসীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ভয়, অনিশ্চয়তা এবং অসহায়ত্ব।

এই পরিস্থিতিতে নির্ধারিত সময়ের আগেই কর্মস্থলে ফিরতে চাইছেন অনেক প্রবাসী। কিন্তু নতুন বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে আকাশছোঁয়া বিমানভাড়া। কয়েকদিন আগেও যে একমুখী টিকিট ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকায় পাওয়া যেত, এখন তার দাম বেড়ে কোথাও কোথাও ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকায় পৌঁছেছে।

রাস আল খাইমাহপ্রবাসী এসএম করিম বলেন, স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ছুটিতে দেশে এসেছিলেন। এখন দ্রুত ফিরতে চান। কিন্তু ৩৫ হাজার টাকার টিকিটের জন্য ৯৫ হাজার টাকা চাওয়া হচ্ছে। এত টাকা জোগাড় করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।

অন্যদিকে, ছুটিতে দেশে আসার প্রস্তুতি নিয়ে দোটানায় পড়েছেন অনেক প্রবাসী। আবুধাবিপ্রবাসী শওকত আলী মীরন বলেন, আগামী সপ্তাহে দেশে আসার জন্য আগেই টিকিট কেটেছেন। কিন্তু এখন শুনছেন দেশে এলেই নাকি ভিসা বাতিল হয়ে যেতে পারে। ফলে একদিকে চাকরি হারানোর ভয়, অন্যদিকে টিকিটের অর্থ নষ্ট হওয়ার শঙ্কা; দুই দিক থেকেই চাপে রয়েছেন তারা।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এটি শুধু বাংলাদেশের নয়; পাকিস্তান, নেপালসহ আরও কয়েকটি দেশের কর্মীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঘটনা ঘটছে। কেন এমন হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং কূটনৈতিকভাবেও বিষয়টি উত্থাপন করা হবে।

জানা গেছে, গত ২২ জুলাই থেকে এই ভিসা বাতিলের ঘটনা সামনে আসতে শুরু করে। দেশে অবস্থানরত প্রায় পাঁচ হাজার বাংলাদেশির ভিসা বাতিল হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেলেও এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি সংযুক্ত আরব আমিরাত।

অনেক প্রবাসী অনলাইনে নিজেদের ভিসার স্ট্যাটাসে 'ক্যানসেল' দেখতে পেয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করছেন। আবুধাবিতে বাংলাদেশ দূতাবাস জানিয়েছে, প্রায় ৩০০টি আবেদন ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং আরও প্রায় ১ হাজার ৪০০ আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে।

সোমবার দূতাবাসের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে জানানো হয়, এটি কারিগরি ত্রুটি নাকি অন্য কোনো বিশেষ কারণে ঘটছে, তা অনুসন্ধান করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সতর্ক করা হয়েছে; সমস্যা সমাধানের নামে কোনো ব্যক্তি, দালাল বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন না করার জন্য।

প্রবাসীরা শুধু বৈদেশিক মুদ্রা পাঠান না, তারা দেশের অর্থনীতির নীরব কারিগর। তাদের ঘামে গড়ে ওঠে অসংখ্য পরিবারের স্বপ্ন, দেশের রিজার্ভে যোগ হয় বৈদেশিক মুদ্রা। অথচ আজ সেই মানুষগুলোর জীবনই ঝুলে আছে অনিশ্চয়তার দোলাচলে।

একটি ভিসা বাতিল হয়তো প্রশাসনিক নথিতে কেবল একটি শব্দ। কিন্তু সেই একটি শব্দের আড়ালে হারিয়ে যেতে পারে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, সন্তানের পড়াশোনা, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের চিকিৎসা কিংবা একজন মানুষের বহু বছরের ত্যাগের গল্প।

তাই এই সংকট শুধু ভিসার নয়; এটি হাজারো প্রবাসী পরিবারের বেঁচে থাকার লড়াই, অপেক্ষার দীর্ঘশ্বাস এবং স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার নীরব ইতিহাস।