প্রকাশিত : ০৩ আগস্ট, ২০২৬ ১৫:১৭ (বৃহস্পতিবার)
সিলেট ইনক্লুসিভ স্কুলের সাবেক প্রধান শিক্ষিকার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ: বিদেশে পালানোর পাঁয়তারা

জেলা প্রশাসন, সমাজসেবা অধিদপ্তর ও জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন পরিচালিত সিলেট ইনক্লুসিভ স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক প্রধান শিক্ষিকা ফারজানা ইশরাতের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, আর্থিক অনিয়ম, জাল সনদ ব্যবহার, অবৈধভাবে বেতন-ভাতা উত্তোলন, প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা বিনষ্টের একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সম্প্রতি এসব অনিয়ম নিয়ে গণমাধ্যমকর্মীরা অনুসন্ধান শুরু করলে তিনি গোপনে পদত্যাগপত্র জমা দেন। এরপর থেকেই তিনি বিদেশে চলে যাওয়ার পাঁয়তারা করছেন বলে গুঞ্জন উঠেছে।

একই প্রতিষ্ঠানের সহকারী শিক্ষিকা আকলিমা বেগম দীর্ঘদিন ধরে ফারজানা ইশরাতের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে জেলা প্রশাসক, জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে একাধিক লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তবে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও রহস্যজনক কারণে কোনো তদন্ত হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ফারজানা ইশরাত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বিদ্যালয়ে একের পর এক অনিয়ম সংঘটিত হতে থাকে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার পরিবেশ, আর্থিক স্থিতিশীলতা ও সুনামের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

অভিযোগ অনুযায়ী, জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের এমপিও নীতিমালার শর্ত অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিএসএড ডিগ্রি সম্পন্ন না করলেও তিনি দীর্ঘদিন সরকারি বেতন-ভাতা গ্রহণ করেছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফারজানা ইশরাত ২০২০ সালের ৬ আগস্ট প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। নীতিমালা অনুযায়ী, তিন বছরের মধ্যে বিএসএড ডিগ্রি অর্জন করতে না পারলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের বেতন-ভাতা বন্ধ হওয়ার বিধান রয়েছে। পরবর্তী দুই বছর বিনা বেতনে চাকরি করে ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ থাকলেও তিনি সেই ডিগ্রি অর্জন করেননি। অভিযোগ রয়েছে, পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার পরও তাঁর চাকরি থাকার কথা ছিল না। এরপরও আরও প্রায় এক বছর চাকরি করেছেন এবং বেতনও গ্রহণ করেছেন, যা অভিযোগকারীদের মতে সম্পূর্ণ আইনবিরোধী।

অভিযোগে আরও বলা হয়, নীতিমালায় শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে বেতন-ভাতা হিসেবে গ্রহণ করা অর্থ সরকারি তহবিলে ফেরত দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু সরকারি অর্থ ফেরত না দিয়ে তিনি কৌশলে চাকরি থেকে অব্যাহতি নিয়ে বিদেশে চলে যাওয়ার চেষ্টা করছেন; এমন গুঞ্জনও ছড়িয়ে পড়েছে।

জেলা প্রশাসক, জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন ও মন্ত্রণালয়ে দেওয়া আকলিমা বেগমের লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রধান শিক্ষিকা শিক্ষকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক ও অপমানজনক আচরণ করতেন, প্রকাশ্যে অশ্রাব্য ও অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতেন, ইচ্ছাকৃতভাবে অতিরিক্ত ক্লাস চাপিয়ে দিতেন এবং পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে শিক্ষক বিভাজন সৃষ্টি করতেন। এছাড়া সিসি ক্যামেরা ব্যবহার করে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত আলাপ পর্যবেক্ষণ এবং ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন তল্লাশির মতো কর্মকাণ্ড করতেন।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বিদ্যালয়ের স্বার্থে কোনো শিক্ষক অনিয়ম বা অব্যবস্থাপনার বিষয়ে কথা বললে তাদের বিভিন্নভাবে নাজেহাল করা হতো। বিদ্যালয়ের সভাপতি ও গভর্নিং বডির সদস্যদের কাছে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করে শোকজ, হয়রানি এবং চাকরিচ্যুতির পরিবেশ তৈরি করা হতো। এমনকি শিক্ষকদের হেয় করার উদ্দেশ্যে শিক্ষার্থীদেরও ব্যবহার করা হতো।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সাবেক প্রধান শিক্ষকের বিভিন্ন অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার বিষয়ে কথা বলায় এক সহকারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ এনে শোকজ করা হয়। এছাড়া, প্রধান শিক্ষকের ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে ওই সহকারী শিক্ষকের সদস্যপদ অপসারণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে শোকজ করা হয় এবং চাকরিচ্যুতির হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

এছাড়া বিদ্যালয়ের তহবিল ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক অনিয়ম, দাতা সদস্যদের অনুদানের অর্থ নিয়মিতভাবে প্রতিষ্ঠানের ফান্ডে জমা না দেওয়া, বিভিন্ন খাতে অর্থ ব্যবহারে স্বচ্ছতার অভাব এবং শিক্ষকদের বেতন-ভাতা সংক্রান্ত আর্থিক অসঙ্গতির অভিযোগও উত্থাপন করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, বিদ্যালয়টিতে সিলেটের দুইটি সরকারি শিশু পরিবারের ছেলে-মেয়েরাসহ নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানরা পড়াশোনা করে। এসব শিক্ষার্থীর কল্যাণে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন দাতা ব্যক্তি ও সংস্থা নিয়মিত আর্থিক অনুদান প্রদান করে থাকে। তবে অভিযোগ রয়েছে, সাবেক প্রধান শিক্ষক ফারজানা ইশরাত আর্থিক লেনদেনে কোনো স্বচ্ছতা বজায় না রেখে দানকৃত অর্থ ব্যক্তিগত বিকাশ নম্বর ও নিজস্ব ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে গ্রহণ ও পরিচালনা করেছেন।

এ পরিস্থিতিতে শিক্ষা প্রশাসনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে অভিযুক্ত সাবেক প্রধান শিক্ষকের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব ও বিকাশ নম্বরের সব ধরনের আর্থিক লেনদেন, জরুরিভিত্তিতে একটি নিরপেক্ষ আর্থিক অডিটের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী শিক্ষকরা।

আকলিমা আক্তার বলেন, ‘সিলেটের সাবেক এডিসি যাকে সম্প্রতি যুগ্ম-সচিব থাকা অবস্থায় বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে উনার স্ত্রী হওয়ার সুযোগে তিনি এসব প্রভাব দেখিয়েছেন। নিয়োগও পেয়েছেন উনার কারণে। তাঁর স্বামী এ. জেড. এম. নুরুল হকের প্রভাব ও হস্তক্ষেপের মাধ্যমে নিয়োগ এবং দীর্ঘদিন জবাবদিহিতার বাইরে ছিলেন।’

তিনি ইমজা নিউজকে বলেন, ‘ফারজানা ইশরাত ও আমি ২০১৫ সালের ১ এপ্রিল এই স্কুলে একই সাথে যোগদান করি। ২০২০ সালে উনি ১০ বছরের অভিজ্ঞতার একটি ভুয়া সনদ দিয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ হাতিয়ে নেন। অথচ উনার বিএসএড ডিগ্রি নেই এবং গত ৬ বছরেও তা অর্জন করতে পারেন নি। এবং এখানে প্রধান শিক্ষক হওয়ার পর থেকেই স্কুলের শিক্ষার মানের অধোপতন ঘটে। ২০২৫ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ৭ জন শিক্ষর্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কেউই পাশ করতে পারেনি। এরপর থেকে বিজ্ঞান বিভাগই উনি বন্ধ করে দিয়েছেন। শিক্ষার্থীর সংখ্যাও অর্ধেকে নেমে এসেছে।’

তিনি আরও বলেন, আইসিটি ল্যাব বন্ধ করাসহ বিদ্যালয়ে সৃজনশীল শিক্ষার উদ্যোগ গ্রহণ না করা, কোনো জাতীয় দিবস পালন না করা, পাঠ্যক্রম-বহির্ভূত কার্যক্রম পরিচালনা না করা, কোনো ধরনের ক্রীড়া সরঞ্জাম না থাকা স্কুলটি পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ। এছাড়া দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল প্রশাসন, শিক্ষক হয়রানি এবং শিক্ষাবান্ধব পরিবেশের অভাবে শিক্ষার্থী কমে গেছে বলেও তিনি দাবি করেন। তহবিল সঙ্কট ও শিক্ষকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রধান শিক্ষকের বিভিন্ন অনিয়মের কারণে বিদ্যালয়টি বর্তমানে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে এবং শিক্ষকদের বেতন-ভাতা অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।’

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক দাবি করেছেন, এই প্রধান শিক্ষিকার মতো আরও কয়েকজন শিক্ষকেরও প্রয়োজনীয় ডিগ্রি নাই এবং জাল সনদ ব্যবহার করে চাকরি করে যাচ্ছেন।

এ বিষয়ে এডিসি (শিক্ষা) মাসুদ রানা বলেন, ‘বিদেশে চলে যাওয়ার বিষয়টি জানি না। তবে তিনি চাকরি করতে ইচ্ছুক নন বলে জানিয়েছেন। তাছাড়া অনিয়মের বিষয়টি তাদের জানা নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘উনাকে চাকরি দিয়েছেন প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন। অনিয়ম হয়ে থাকলে তাদের সাথে কথা বলতে পারেন।’

বিষয়টি নিয়ে অভিযুক্ত সাবেক প্রধান শিক্ষিকা ফারজানা ইশরাত বলেন, ‘এসব অভিযোগ সত্য নয়। ভুল তথ্য সাংবাদিকদের কাছে সরবরাহ করা হয়েছে। বিদেশে যাওয়ার সাথে চাকরি ছাড়ার কি সম্পর্ক, আমার আত্মীয় স্বজন থাকলে তো বিদেশে যেতেই পারি।’

তিনি আরও বলেন, ‘৭৪টি প্রতিবন্ধী স্কুলের কারোরই এই বিএসএড ডিগ্রি নেই। বেতন তো আমাকে দেওয়া হয়েছে আমি তো জোর করে নেইনি। কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞেস করুন কেন আমাকে অতিরিক্ত ৩ বছর বেতন দিয়েছেন।’

তিনি দাবি করেন, ‘ডিগ্রী না নেওয়ায় তাকে একগ্রেড নিচে নামিয়ে ডিমোশন দিয়ে বেতন দেওয়া হয়েছে। এটাও একটা শাস্তি দেওয়া হয়েছে। আর সরকারি অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়ে বলেন, 'আমাকে কর্তৃপক্ষ কোনো তাগাদা দেয়নি। আমার বিরুদ্ধে আমার সহকর্মী অভিযোগ দিয়েছেন। কিন্তু উনি এই ডিগ্রি নিয়েছেন কত সালে দেখেন? আমার সভাপতি হলেন জেলা প্রশাসক। কিন্তু তিনি তো আমার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেননি। এই বিষয়ে জিজ্ঞেস করেন। আমার সময় ও আমার মান সম্মান বিনষ্ট করার চেষ্টা করছে।’