প্রকাশিত : ০৩ আগস্ট, ২০২৬ ১৯:০১ (মঙ্গলবার)
এখনও প্রাণ আছে সিলেটের হাইটেক পার্কের

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বর্ণি এলাকায় অবস্থিত হাইটেক পার্কে উৎপাদন হচ্ছে দেশের অন্যতম সেরা ব্রান্ড র‌্যাংগসের ফ্রিজ।

সিলেট হাইটেক পার্কে তৈরি হচ্ছে দেশের অন্যতম সেরা ব্রান্ড র‌্যাংগসের ফ্রিজ। পার্কের ১৬৩ একর এলাকায় উৎপাদনে আছে এই একটি প্রতিষ্ঠানই।

হাইটেক পার্কটির অবস্থান সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বর্ণি এলাকায়। উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাবে উপজেলাটির সীমান্তবর্তী মানুষ জড়িয়ে পড়েন চোরাচালানসহ নানান অবৈধ কার্যকলাপে।

সরেজমিন দেখা যায়, সরকারের ৩৩৬ কোটি টাকার এই প্রকল্প এলাকায় বর্তমানে দাঁড়িয়ে আছে কতগুলো ভূতুড়ে অবকাঠামো।

উৎপাদনে থাকা একমাত্র প্রতিষ্ঠান র‌্যাংগস ইলেকট্রনিক্স প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রার ৩০ ভাগ জনবল নিয়ে কারখানায় উৎপাদন শুরু করেছে। তাদের এই জনবলও নিয়মিত ও প্রশিক্ষিত নয়, তাদের প্রশিক্ষণ দিতে হচ্ছে।

র‌্যাংগস ইলেকট্রনিক্স লিমিটেডের ডিজিএম, প্রকৌশলি মো. মোরশেদুল আলম বলেন, প্রতিবন্ধকতায় পুরোদমে উৎপাদনে যেতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। তাতেও গড়ে তিন শতাধিক লোক এখন এখানে কাজ করছেন। মূল সংকট হচ্ছে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, গ্যাস এবং নিরাপত্তার অভাব। এছাড়া সিলেটের যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিনিয়োগে অনাগ্রহ তৈরি করছে। 

তিনি বলেন, সিলেট হাইটেক পার্কের এখনও বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। ভৌগলিক অবস্থানগত কারণে এখানে উৎপাদিত ইলেকট্রনিক্স পণ্য দেশের সীমানা ছাড়িয়ে সহজেই পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের সাতটি রাজ্যের বাজারে আধিপত্য তৈরি করতে পারে। তাতে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সাথে তৈরি হবে বিপুল কর্মসংস্থান এবং প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ জনবল।

নতুন কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার মাধ্যমে আর্ন্তজাতিক বাজারে প্রভাব বাড়ানো এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্য নিয়ে সিলেটের হাইটেক পার্কের অবকাঠামোগত কাজ শেষ হয় ২০২৩ সালে। পার্কের এলাকা প্রায় ১৬৩ একর। এ পর্যন্ত প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, ট্যাকনিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতালের মতো ১৩ টি প্রতিষ্ঠান জমি বরাদ্দ নিলেও বাস্তব বিনিয়োগে তাদের অনাগ্রহ। ধুঁকতে থাকা হাইটেক পার্ক নিয়ে হতাশ স্থানীয়রাও।

প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও অবকাঠামোগত কাজ শেষে ২০২৩ সালের নভেম্বরে দায়িত্ব সমঝে নেয় বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত এর নাম ছিল ‘বঙ্গবন্ধু হাইটেক পার্ক ’ । তবে ২০২৪ সালের নভেম্বরে এসে নানান ব্যর্থতার রেশ টেনে পুরো প্রকল্পটিই বাতিল করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেয় অর্ন্তবর্তী সরকার। শেষ হয়ে যায় দক্ষ-অদক্ষ অর্ধলক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান, দক্ষতাভিত্তিক জনশক্তি তৈরি, আইটি ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আর নতুন উদ্ভাবনের মাধ্যমে বিদেশি বাজার দখলের সব সম্ভবনা। ক্ষতির মুখে পড়েন বিনিয়োগকারীরাও। তবে বর্তমান সরকারের আন্তরিক আগ্রহ আবারও আশা জাগাচ্ছে বিনিয়োগকারী ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।

সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক ফাহিম আহমেদ চৌধুরী বলেন, প্রবাসী অধ্যূষিত সিলেটে বিনিয়োগের পরিবেশ পেলে প্রবাসীরা অবশ্যই এগিয়ে আসবেন। কিন্তু এক্ষেত্রে অহেতুক জটিলতা তৈরি করে রাখা হয়।

সরজমিন দেখা যায়, ৩৩৬ কোটি টাকার প্রকল্পে এখানে নির্মাণ হয়েছে আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার, প্রশাসনিক ভবন, ৩৩ কেভিএ লাইনের ১০ মেগাওয়াট বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন, দৈনিক ২০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহের ক্ষমতাসম্পন্ন গ্যাস স্টেশন, ইউটিলিটি ভবন, আনসার ব্যারাক, অভ্যন্তরীণ সড়ক, সেতু, গেস্ট হাউস ও কালভার্ট কাম স্লুইসগেট। এর মধ্যে ২০২২ সালের বন্যায় নদীতে বিলীন হয়েছে সীমানা প্রাচীরের মাটি। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের কারণে অনেকস্থানে দেয়াল ধসে গেছে। উম্মুক্ত ও অরক্ষিত প্রায় এক কিলোমিটার সীমানা। অভ্যন্তরীণ সড়কের স্থানে স্থানে কার্পেটিং ওঠে গেছে। শেষ হয়নি অনেক কালভার্টের কাজ।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, জমি বরাদ্দ নিলেও চাহিদামতো ঋণ না পাওয়া এবং নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগের অভাবে এখানে বড় অঙ্কের মূলধন খাটানোর সাহস পাচ্ছেন না বিনিয়োগকারীরা।

সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত ১২টি প্রতিষ্ঠানকে ৭১.৩৯৯ একর এবং ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে ১৪,৭৬০ বর্গফুট জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে র‌্যাংগস ইলেকট্রনিকস লিমিটেড ৩২ একর, আরএফএল ইলেকট্রনিকস লিমিটেড ২০, ব্যাবিলন রিসোর্সেস লিমিটেড ২, হেলথ ল্যান্ডমার্ক হোল্ডিং লিমিটেড ১.৫, রহমানিয়া সুপার মার্কেট ১, টুগেদার আইটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ১, ইএলবি ১, মেসার্স নুহ এবং সোহান এন্টারপ্রাইজ প্রায় সাড়ে ৩, অটোমেশন সার্ভিস লিমিটেড ১, আরটিএম আল কবির টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি ৮, ম্যাকডোনাল্ড স্টিল বিল্ডিং প্রোডাক্টস লিমিটেড ০.১৪৯, অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেড ০.৩৩০ একর জমি বরাদ্দ পেয়েছে। পাঁচ তারকা হোটেলের জন্য ৩ একর, বোর্ড ক্লাবের জন্য ২ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগকে ৪ হাজার বর্গফুট, সিমেড হেলথ লিমিটেডকে ১ হাজার, নুডস সল্যুশনকে ১ হাজার ৫০০, মেসার্স আব্দুল বাশির এন্টারপ্রাইজকে ২ হাজার ২৬০, ইন টাচ আইটিকে ২ হাজার বর্গফুট জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ছয়টি সিলেট অঞ্চলের। 

হেলথ ল্যান্ডমার্ক হোল্ডিং লিমিটেড, টুগেদার আইটি ইন্ডাস্ট্রিজের মতো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে কনস্ট্রাকশন কাজ শুরু হলেও সেটা দু বছর ধরে বন্ধ। বাকিরা কোনো কাজই শুরু করেনি। কাজ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে একমাত্র প্রতিষ্ঠান র‌্যাংগস ইলেকট্রনিক্স। 

র‌্যাংগস ইলেকট্রনিক্সের হাই-টেক শাখার সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোরশেদ আলম জানিয়েছেন, এই প্রকল্পে এখন পর্যন্ত হতাশা ছাড়া কিছু নেই। আর র‌্যাংগসের এই পরিণতি দেখে অন্য বিনিয়োগকারীরাও বিনিয়োগে সাহস পাচ্ছেন না।
এই দশার মধ্যেও আশা জাগাচ্ছে প্রধামন্ত্রীর আগ্রহ। সিলেটের আইটি পার্কটি দ্রুত সচল করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ২ মে সিলেট নগর ভবনে সুধী সমাবেশে তিনি বলেন, সিলেটে অনেক তরুণ আছেন যারা ফ্রিল্যান্সিং, ডেটা প্রসেসিং ও আইটির বিভিন্ন কাজে যুক্ত। কিন্তু পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবে তারা তাদের মেধা ও দক্ষতার পূর্ণ ব্যবহার করতে পারছেন না। আইটি পার্কটি সচল হলে এই তরুণরা সেখানে কাজ করার সুযোগ পাবেন। দেশি বিদেশি বিনিয়োগে এখানে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে।

পার্কটিকে সচল করতে সরকারিভাবে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিলেট হাইটেক পার্কের সহকারী পরিচালক এসএম আল মামুন। তিনি বলেন, কমিটির প্রস্তবনা এবং পরামর্শে কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। বরাদ্দ নেওয়া প্রতিষ্ঠান মালিকদের খুব দ্রুত কাজ শুরুর চিঠি দেওয়া হবে। তা না হলে বরাদ্দ বাতিল হবে।

পার্কটিকে বিদেশগামী জনবলের জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে তৈরির পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন স্থানীয় সাংসদ এবং প্রবাসী কল্যাণ, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা এই সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। দক্ষ জনশক্তির মাধ্যমে আমরা বৈদেশিক শ্রমবাজারে আধিপত্য বৃদ্ধি করতে চাই। এজন্য দরকার উপযুক্ত ট্রেনিং সেন্টার। নতুন ট্রেনিং সেন্টার বানাতে সময় লাগবে। এখানে একটি প্রায় মৃত প্রকল্প পড়ে আছে। ভাষা ও কার্যদক্ষতায় প্রশিক্ষিত তরুণ জনবল তৈরি করতে এই অবকাঠামোগুলোকে আমরা কাজে লাগাতে চাই।