ছবি: সংগৃহীত
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশন গত দেড় বছরে হাজারো বাংলাদেশি শ্রমিক ও তাদের পরিবারের জন্য ৫২ কোটিরও বেশি টাকার ক্ষতিপূরণ ও আর্থিক সুবিধা আদায় করেছে। প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
হাইকমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কর্মস্থলে দুর্ঘটনা, স্থায়ী অক্ষমতা, মৃত্যু এবং অন্যান্য শ্রমসংক্রান্ত মোট ২ হাজার ৮৫৭টি দাবির বিপরীতে ১ কোটি ১৪ লাখ ১৮ হাজার মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত (প্রায় ৩৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা) ক্ষতিপূরণ ও অন্যান্য সুবিধা আদায় করা হয়।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে আরও ১ হাজার ৩৮১টি দাবির বিপরীতে ৫৮ লাখ ৮০ হাজার রিঙ্গিত (প্রায় ১৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা) আদায় হয়েছে। ফলে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত মোট আদায়কৃত ক্ষতিপূরণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৭২ লাখ ৯৮ হাজার রিঙ্গিত, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫২ কোটি টাকার সমান।
হাইকমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আদায়কৃত ক্ষতিপূরণের বড় অংশই কর্মস্থলে দুর্ঘটনার কারণে সাময়িকভাবে কর্মক্ষমতা হারানো শ্রমিকদের দেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালে এ ধরনের ২ হাজার ২৯৩টি দাবির বিপরীতে প্রায় ৩৫ লাখ রিঙ্গিত এবং স্থায়ী অক্ষমতায় আক্রান্ত ১৫৫ জন শ্রমিকের জন্য আরও প্রায় ৩৫ লাখ রিঙ্গিত প্রদান করা হয়।
এ ছাড়া ক্ষতিপূরণ প্যাকেজের আওতায় মৃত শ্রমিকদের স্বজনদের আর্থিক সহায়তা, দাফন ব্যয় এবং মরদেহ দেশে পাঠানোর খরচও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তারা বলেন, এই ক্ষতিপূরণ শুধু আর্থিক সহায়তা নয়; এটি প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় সরকারের অঙ্গীকারের প্রতিফলন। অনেক শ্রমিকই কর্মস্থলে দুর্ঘটনা বা মৃত্যুর পর ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত নন।
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার মঞ্জুরুল করিম খান চৌধুরী বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশিদের অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করা হাইকমিশনের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।
তিনি বলেন, ‘যাতে কোনো বাংলাদেশি শ্রমিক বা তাদের পরিবার ন্যায্য ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত না হন, সে জন্য আমরা নিয়মিত মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করছি।’
তিনি আরও জানান, দ্রুত কনস্যুলার সেবা, আইনি পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
হাইকমিশনের শ্রম কাউন্সেলর সিদ্দিকুর রহমান বলেন, হাইকমিশনারের দিকনির্দেশনায় শ্রম উইং বকেয়া বেতন, ক্ষতিপূরণের দাবি এবং অন্যান্য শ্রমসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, অনেক শ্রমিক এখনও নিজেদের আইনি অধিকার এবং ক্ষতিপূরণের আবেদন করার পদ্ধতি সম্পর্কে জানেন না। তাই দাবি নিষ্পত্তির পাশাপাশি শ্রমিকদের সচেতন করতে বিভিন্ন কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে। শ্রম উইং সব প্রকৃত দাবি দ্রুত যাচাই ও নিষ্পত্তিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।
বাংলাদেশি প্রবাসী কমিউনিটির নেতারা হাইকমিশনের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে তারা আইনি সহায়তা আরও জোরদার, শ্রমিকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য অতিরিক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তাদের মতে, ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা, জটিল কাগজপত্রের প্রক্রিয়া এবং কিছু অসাধু মধ্যস্বত্বভোগীর প্রতারণার কারণে অনেক শ্রমিক আইনগতভাবে প্রাপ্য সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হন।
কমিউনিটি নেতা তালহা মাহমুদ বলেন, মালয়েশিয়াজুড়ে বাংলাদেশি শ্রমিকদের সমন্বয়ে একটি কার্যকর নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা গেলে হাইকমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ আরও সহজ হবে এবং জরুরি সহায়তা ও প্রয়োজনীয় সেবা দ্রুত পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
প্রবাসী নেতারা আরও বলেন, শুধু হাইকমিশন নয়, বাংলাদেশি কমিউনিটি সংগঠন ও সামাজিক সংগঠনগুলোকেও শ্রমিকদের পাশে আরও সক্রিয়ভাবে দাঁড়াতে হবে।
তাদের মতে, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের এই ক্ষতিপূরণ আদায়ের সাফল্য প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের অধিকার, নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। একই সঙ্গে এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ প্রবাসী শ্রমশক্তির জন্য আরও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেছে।