রাতের ক্লান্তি শেষে ভোরের আলো ফুটতেই দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়া, কিন্তু স্টিয়ারিং হাতে চালকের এক মুহূর্তের তন্দ্রাচ্ছন্নতাই অগণিত যাত্রীর জীবনে ডেকে আনছে চূড়ান্ত বিপর্যয়। সিলেটের মহাসড়কগুলোতে দূরপাল্লার চালকদের অতিরিক্ত কাজের চাপ, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব আর তন্দ্রাচ্ছন্ন চোখ এখন মৃত্যুর নামান্তর হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি ওসমানীনগরে ৯ জনের প্রাণ কেড়ে নেওয়া বাস দুর্ঘটনার পেছনেও প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে চালকের ঘুমঘুম ভাব ও বেপরোয়া গতি। মর্মান্তিক এই ঘটনার পর চতুরতার সঙ্গে পালিয়ে যাওয়া দুই ঘাতক চালককে গ্রেপ্তার করতে এখন সাঁড়াশি অভিযানে নেমেছে পুলিশ।
শুক্রবার সকালে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ওসমানীনগরের কাশিকাপন এলাকায় ইউনিক পরিবহন ও বেঙ্গল পরিবহনের দুটি বাসের মুখোমুখি ভয়াবহ সংঘর্ষে রক্তে রঞ্জিত হয় সড়ক, প্রাণ হারান ৯ জন যাত্রী। ঘটনার পর ছড়িয়ে পড়া একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ইউনিক পরিবহনের বাসটি নিজস্ব লেনে স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। কিন্তু বিপরীত দিক থেকে আসা বেঙ্গল পরিবহনের বাসটি একটি পিকআপ ভ্যানকে ওভারটেক করতে গিয়ে বেপরোয়া গতিতে ভুল লেনে ঢুকে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যেই ঘটে যায় মুখোমুখি সংঘর্ষ, যার তীব্রতায় ইউনিক পরিবহনের বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের খাদে ছিটকে পড়ে দুমড়ে-মুচড়ে যায়। দুর্ঘটনার পরপরই দুই বাসের চালক কৌশল খাটিয়ে এলাকা থেকে সটকে পড়ে।
দুর্ঘটনার বিস্তারিত জানিয়ে সিলেটের শেরপুর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনিসুর রহমান বলেন, ভোরের দিকে মহাসড়ক ফাঁকা থাকায় বাস দুটির গতি ছিল অত্যাধিক। প্রাথমিক তদন্ত ও সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় মনে হচ্ছে, চালকদের ঘুমঘুম অবস্থায় গাড়ি চালানো এবং অতিরিক্ত গতিতে ওভারটেকিংয়ের চেষ্টা করায় এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। তিনি জানান, মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং পালিয়ে যাওয়া দুই চালককে আইনের আওতায় আনতে পুলিশের চিরুনি অভিযান অব্যাহত আছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দূরপাল্লার সড়কগুলোতে চালকদের একটানা বিরতিহীনভাবে গাড়ি চালানো, রাতের বেলা দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া এবং বিকল্প কোনো চালক না থাকার কারণেই স্টিয়ারিংয়ে বসেই চালকরা ঢুলে পড়েন। পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের সুযোগ না পেয়ে পরের ট্রিপেই গাড়ি নিয়ে নেমে পড়ায় চালকের এই তন্দ্রাচ্ছন্নতাই সাধারণ মানুষের জন্য মারাত্মক প্রাণঘাতী ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
সিলেটের মহাসড়কে চালকের তন্দ্রাচ্ছন্নতার কারণে এত বড় প্রাণহানির ঘটনা এবারই প্রথম নয়। চলতি বছরের ৩ মে সিলেটের দক্ষিণ সুরমার তেলিবাজার এলাকাতেও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ঘটছিল আরেক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। সে সময় একটি কাঠবোঝাই ট্রাকের মূল চালক চলন্ত অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়ায় গাড়ি চালানোর দায়িত্ব দেন তাঁর সহকারীর হাতে। অনভিজ্ঞ সহকারীর বেপরোয়া চালনায় ট্রাক ও পিকআপ ভ্যানের সংঘর্ষে অকালে প্রাণ ঝরে যায় ৮ জন নির্মাণ শ্রমিকের।
ঘন ঘন ঘটা এসব দুর্ঘটনা স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, চালকের ঘুম আর বেপরোয়া মানসিকতাই এখন মহাসড়কের যাত্রীদের জন্য সবচেয়ে বড় কাল হয়ে দেখা দিয়েছে। ওসমানীনগরের ঘাতক চালকদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পাশাপাশি মহাসড়কে চালকদের ক্লান্তি দূরীকরণে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন নিরাপদ সড়ক প্রত্যাশীরা।