প্রকাশিত : ০৮ আগস্ট, ২০২৬ ১৬:৫২ (রবিবার)
সিলেটের সড়কে ছয় মাসে ১১৭ প্রাণহানি: দায় নেবে কে?

সিলেট অঞ্চলের মহাসড়কগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়লেও কার্যকর জবাবদিহিতা এখনো স্পষ্ট নয়। হাইওয়ে পুলিশের সিলেট রিজিয়নের চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত প্রকাশিত পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মাত্র ছয় মাসে ১৮৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১১৭ জন, গুরুতর আহত হয়েছেন ১০৯ জন এবং সাধারণ আহত ১৬৬ জন। ক্রমাগত বাড়তে থাকা এই প্রাণহানি শুধু পরিসংখ্যানের খাতায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সিলেটের মহাসড়কে চলাচলকারী প্রতিটি মানুষের জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকেত হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন থেকেই যায়- এই মৃত্যুর দায় শেষ পর্যন্ত নেবে কে? একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির এমন আকস্মিক মৃত্যু কিংবা পঙ্গুত্ব বরণ করলে সেই পরিবারগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে- এর উত্তর আজও খুঁজে পান না স্বজনরা।

ফেব্রুয়ারি মাসে ১৩টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ১৪ জন। একই সময়ে গুরুতর আহত হন ১২ জন এবং সাধারণ আহত ৭ জন। মার্চে দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬টিতে, যেখানে নিহত হন ২৪ জন। গুরুতর আহত ১৯ জন এবং সাধারণ আহত ৪১ জন- পবিত্র ঈদ উল ফিতর উপলক্ষে ঈদ যাত্রায় এই মাসে আহতের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যাওয়া দুর্ঘটনার তীব্রতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। এপ্রিল মাসে ১৩টি দুর্ঘটনায় নিহত হন ১৪ জন, গুরুতর আহত ৭ জন এবং সাধারণ আহত ২৯ জন। 

মে মাসে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। এ মাসে সর্বোচ্চ ২২টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ২২ জন। গুরুতর আহত হন ২২ জন এবং সাধারণ আহত ৩০ জন। ৩ মে দক্ষিণ সুরমার তেলিবাজার এলাকায় মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ৮ জন নির্মাণ শ্রমিকের প্রাণহানি ঘটে। সেখানে চালক চলন্ত অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়লে অনভিজ্ঞ সহকারী গাড়ি চালাতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং ভয়াবহ সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। এই ঘটনাও প্রমাণ করে যে চালকের ক্লান্তি ও অনভিজ্ঞতা সড়ক দুর্ঘটনার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অপরদিকে, জুনে ১৯টি দুর্ঘটনায় নিহত হন ২৯ জন, যা ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ মৃত্যুর মাস হিসেবে চিহ্নিত। একই সময়ে গুরুতর আহত ২৮ জন এবং সাধারণ আহত ৩৪ জন। জুলাই মাসে ১২টি দুর্ঘটনায় নিহত হন ১৪ জন, গুরুতর আহত ২১ জন এবং সাধারণ আহত ২৫ জন। যদিও দুর্ঘটনার সংখ্যা তুলনামূলক কম, তবুও হতাহতের হার আশঙ্কাজনকই থেকে গেছে।

এই পরিসংখ্যানের মাঝেই গতকাল শুক্রবার নতুন করে যোগ হয়েছে আরও একটি মর্মান্তিক ঘটনা। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ওসমানীনগরের কাশিকাপন এলাকায় ইউনিক পরিবহন ও বেঙ্গল পরিবহনের দুটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৯ জন যাত্রী নিহত হন। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, একটি বাস পিকআপ ভ্যানকে ওভারটেক করতে গিয়ে বেপরোয়া গতিতে বিপরীত লেনে ঢুকে পড়ে। ভোরের ফাঁকা সড়কে অতিরিক্ত গতি এবং চালকের তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থাই এই দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। সংঘর্ষের পর দুটি বাসের চালকই পালিয়ে যায়, যাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, সিলেট মহাসড়কের অধিকাংশ বড় দুর্ঘটনার পেছনে একই ধরনের কারণ বারবার সামনে আসছে। দূরপাল্লার চালকদের একটানা দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানো, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব এবং রাতভর ড্রাইভিং তাদের তন্দ্রাচ্ছন্ন করে তোলে। ভোরবেলা ফাঁকা রাস্তায় গতি নিয়ন্ত্রণ না রেখে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর প্রবণতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় নিয়ম না মেনে ঝুঁকিপূর্ণ অভারটেকিং, যা প্রায়ই প্রাণঘাতী সংঘর্ষের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১৯টি দুর্ঘটনায় প্রায় ১৯ জন মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। আহতের সংখ্যা আরও বেশি, যা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে চালকদের জন্য বাধ্যতামূলক বিশ্রাম নিশ্চিত করা, মহাসড়কে নির্দিষ্ট বিরতিস্থল তৈরি, গতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি এবং অভারটেকিংয়ের বিরুদ্ধে কার্যকর আইন প্রয়োগ জরুরি।

সর্বশেষ ঘটনাগুলো এবং ছয় মাসের এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দিচ্ছে, সড়ক দুর্ঘটনা আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি এখন একটি ধারাবাহিক সংকটে পরিণত হয়েছে। চালকের এক মুহূর্তের তন্দ্রা কিংবা একটি ভুল সিদ্ধান্তই কেড়ে নিচ্ছে একাধিক প্রাণ। তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সিলেটের মহাসড়কগুলোতে এই মৃত্যুমিছিল থামানো কঠিন হয়ে পড়বে।