ছবি: সংগৃহীত
সিলেট নগরীর রায়নগরে তিন খুনের ঘটনায় নিহত গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমের বয়স নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের অসঙ্গতি। হত্যাকাণ্ডের পর থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বয়সের তথ্য সামনে এসেছে। কোথাও তাঁকে ২৫ বছর বয়সী বলা হয়েছে, পুলিশ পরে গণমাধ্যমকে তাঁর বয়স ১৫ বছর বলে জানিয়েছে। আবার বাবুল মিয়াকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানোর আবেদনে তাহমিনার বয়স উল্লেখ করা হয়েছে ১৮ বছর।
এর মধ্যে নিহত তাহমিনার বাবা আফতাব মিয়ার বক্তব্য আরও বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, তাঁর মেয়ের বয়স হবে ১২ থেকে ১৩ বছর। মামলার বাদীও তাহমিনাকে ‘বাচ্চা মেয়ে’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ফলে প্রশ্ন উঠছে; রায়নগরের তিন খুনের ঘটনায় নিহত তাহমিনা আসলে কত বছরের ছিলেন?
গত ১২ আগস্ট রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার একটি বাসা থেকে আব্দুস সাত্তার, তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর প্রথম দিকের বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে তাহমিনার বয়স ২৫ বছর উল্লেখ করা হয়।
পরে পুলিশ গণমাধ্যমকে জানায়, নিহত গৃহকর্মীর বয়স ১৫ বছর। ঘটনার পর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে পরিবারের সদস্যদের বরাত দিয়েও তাহমিনাকে ১৫ বছর বয়সী কিশোরী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। সেখানে বলা হয়, কোরবানির ঈদের পর তিনি রায়নগরের ওই বাসায় কাজে যোগ দেন।
তবে এখানেই শেষ নয়। বাবুল মিয়াকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানোর জন্য পুলিশের করা আবেদনে তাহমিনার বয়স ১৮ বছর উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে তাঁর বাবা আফতাব মিয়ার বক্তব্য, মেয়ের বয়স ১২/১৩ বছর। অর্থাৎ পরিবারের দেওয়া বয়স এবং পুলিশের আদালতে দেওয়া তথ্যের মধ্যেও রয়েছে কয়েক বছরের ব্যবধান।
হত্যাকাণ্ডের প্রথম দিকে গণমাধ্যমে তাহমিনার বয়স ২৫ বছর হিসেবে প্রকাশিত হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে পুলিশই তাঁর বয়স ১৫ বছর বলে জানায়। এর পর আদালতে দেওয়া পুলিশের আবেদনে আবার বয়স ১৮ বছর উল্লেখ করা হয়েছে।
একই ব্যক্তির বয়স নিয়ে এ ধরনের পার্থক্য সাধারণ ভুল হিসেবে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কম। কারণ বয়স এখানে শুধু পরিচয়গত তথ্য নয়; মামলার তদন্ত, ঘটনাপ্রবাহ এবং নিহত তাহমিনার সঙ্গে অভিযুক্ত বাবুল মিয়ার কথিত সম্পর্কের বিষয়েও এটি গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে পুলিশ যে ‘সম্পর্কের’ বিষয়টিকে হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কারণ হিসেবে সামনে এনেছে, সেখানে তাহমিনার প্রকৃত বয়স নিশ্চিত করা আরও জরুরি হয়ে পড়েছে।
তাহমিনার বাবা আফতাব মিয়া একজন দিনমজুর। পরিবারের সদস্যদের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গেছে, আর্থিক সংকটের কারণে অল্প বয়সেই তাহমিনাকে কাজে যেতে হয়েছিল। একটি প্রতিবেদনে তাঁকে ১৫ বছর বয়সী কিশোরী হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এখন তাঁর বাবার বক্তব্য, মেয়ের বয়স ১২/১৩ বছর।
একজন বাবা নিজের সন্তানের বয়স সম্পর্কে এমন বক্তব্য দিলে তা তদন্তে যাচাই করা প্রয়োজন। তাঁর মেয়ের জন্মনিবন্ধন, স্কুলের নথি, টিকা কার্ড বা অন্য কোনো সরকারি কাগজপত্র রয়েছে কি না, সেগুলো যাচাই করলেই বয়সের বিষয়ে একটি নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব।
তাহমিনার বয়স নিয়ে প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে মামলার বাদীর বক্তব্য। নিহত দম্পতির মেয়ে ও মামলার বাদী সেলিনা সুলতানা তাঁকে ‘বাচ্চা মেয়ে’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তাহমিনা তাঁদের কাছে অত্যন্ত পরিচিত ও বিশ্বস্ত একজন ছিল।
সেলিনা সুলতানা গণমাধ্যমকে বলেছেন, কাজের মেয়েটিকে বাঁচাতে গিয়ে তাঁর মা মারা গেছেন এবং তাহমিনাকে তিনি ‘বাচ্চা মেয়ে’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এ বক্তব্য পুলিশের দেওয়া ১৫ বছর বয়সের তথ্যের সঙ্গে কিছুটা সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও আদালতে দেওয়া আবেদনের ১৮ বছর বা প্রথম দিকের ২৫ বছর বয়সের তথ্যের সঙ্গে তা মেলে না।
রায়নগরের তিন খুনের ঘটনায় পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য ছিল, গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে বাবুল মিয়ার কথিত সম্পর্ক ও বিরোধের জেরে হত্যাকাণ্ড ঘটে। পুলিশ দাবি করেছে, তাহমিনাকে হত্যার পর তাঁকে বাঁচাতে এগিয়ে আসা গৃহকর্ত্রী সুরাইয়া বেগম এবং পরে গৃহকর্তা আব্দুস সাত্তারও হামলার শিকার হন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নিহত দম্পতির মেয়ে সেলিনা সুলতানা করা মামলায় সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ ও পূর্বশত্রুতার বিষয় সামনে এসেছে। তিনি অভিযোগ করেছেন, তাঁর বাবা-মা ও গৃহকর্মীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি পুলিশের সামনে আসা ‘প্রেমের সম্পর্কের’ বর্ণনাকেও প্রশ্ন করেছেন এবং তাহমিনাকে ‘বাচ্চা মেয়ে’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এ অবস্থায় তাহমিনার প্রকৃত বয়স নির্ধারণ তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত।
তাহমিনার প্রকৃত বয়স নিয়ে তৈরি হওয়া এই বিভ্রান্তির অবসান ঘটাতে তাঁর জন্মনিবন্ধন সনদ, স্কুলের রেকর্ড যাচাই করা প্রয়োজন।