প্রকাশিত : ১৮ আগস্ট, ২০২৬ ১৫:৫৮ (মঙ্গলবার)
বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য ও ভিসা সহজীকরণে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে: বাণিজ্যমন্ত্রী

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ভৌগোলিক নৈকট্যকে কাজে লাগিয়ে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শিল্প সহযোগিতা আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেছেন, দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে বিদ্যমান বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা দূর করে স্বাভাবিক বাণিজ্য পরিবেশ ফিরিয়ে আনা, ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা এবং বেসরকারি খাতকে আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত করতে হবে।

মঙ্গলবার সচিবালয়ে ভারতের শিল্প সংগঠন ‘কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রি’ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন। বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক, বিদ্যমান সমস্যা এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন সংস্থাটির মহাপরিচালক চন্দ্রজিৎ ব্যানার্জি।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আয়তন ও অর্থনৈতিক সক্ষমতায় পার্থক্য থাকলেও বাংলাদেশ ও ভারতের ভৌগোলিক বাস্তবতা পারস্পরিক সহযোগিতার বড় সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের অবস্থান এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে ঘিরে বাণিজ্য, যোগাযোগ ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সম্মিলিত অর্থনীতি বড় হলেও আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্য এখনো তুলনামূলকভাবে কম। এই সংযোগ বাড়ানো গেলে শিল্পায়ন, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাণিজ্যকে আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আলোচনা জরুরি। এ বিষয়ে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ইতিবাচক অগ্রগতি আসবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বৈঠকে ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের ভিসা জটিলতা নিয়েও আলোচনা হয়। মন্ত্রী বলেন, চিকিৎসা, ব্যবসা ও অন্যান্য প্রয়োজনে নিয়মিত যাতায়াতকারীদের জন্য বারবার স্বল্পমেয়াদি ভিসার আবেদন বাস্তবসম্মত নয়। তাই দীর্ঘমেয়াদি ভিসা ব্যবস্থার জন্য দুই দেশের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

এদিকে, ভারতের শিল্প সংগঠনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের অবকাঠামো ও ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বাড়াতে দুটি যৌথ টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। এর মধ্যে একটি অবকাঠামো খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ ও পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ উন্নয়নে এবং অন্যটি সেমিকন্ডাক্টর, গ্রিন হাইড্রোজেন, ব্যাটারি স্টোরেজ ও ডাটা সেন্টারের মতো ভবিষ্যতমুখী শিল্পে কাজ করবে।

সংগঠনটি জানায়, ভারতে অবকাঠামো খাতে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ হয়েছে, যার বড় অংশ এসেছে বেসরকারি খাত থেকে। তাদের মতে, ভারতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশেও দেশি-বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ রয়েছে।

বৈঠকে স্থানীয় শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়। ভারতীয় প্রতিনিধিরা বলেন, অনেক স্থানীয় প্রতিষ্ঠান সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও নানা সমস্যার কারণে পিছিয়ে পড়ছে। স্থানীয় উৎপাদন বাড়লে আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন আরও দ্রুত হবে।

একটি উদাহরণ দিয়ে তারা জানান, স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য পরিবহনে দীর্ঘ সময় লাগছে, যা অনেক ক্ষেত্রে ৪০ থেকে ৪৫ দিন পর্যন্ত গড়াচ্ছে। স্থানীয় উৎপাদন শক্তিশালী হলে এই সমস্যা অনেকটাই কমে আসবে।

দ্রুত বিক্রয়যোগ্য ভোগ্যপণ্য খাতেও বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করা হয়। ঢাকার আশপাশে সাবান, গৃহস্থালি পণ্য ও সুগন্ধি সামগ্রী উৎপাদনে একটি আধুনিক সমন্বিত কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। একই সঙ্গে অনিবন্ধিত পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামো গঠনের আহ্বান জানানো হয়।

শিল্প খাতে জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারে শুল্ক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে। প্রতিনিধিরা জানান, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করলে টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক ও খাদ্য শিল্পে উল্লেখযোগ্য হারে গ্যাস সাশ্রয় সম্ভব। তবে শুল্ক জটিলতার কারণে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এছাড়া বাংলাদেশের তরুণদের ভারতীয় প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপ এবং বাংলাদেশি প্রকৌশলীদের তৃতীয় দেশে কাজের ক্ষেত্রে ভিসা জটিলতা নিরসনের প্রস্তাবও উঠে আসে।

বৈঠকের শেষে উভয় পক্ষই আনুষ্ঠানিক আলোচনার বাইরে ব্যবসায়ী পর্যায়ের যোগাযোগ বৃদ্ধি, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করা এবং যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ-ভারত অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও গতিশীল করার ওপর গুরুত্বারোপ করে।