প্রকাশিত : ১৯ আগস্ট, ২০২৬ ১৬:৫৪ (বৃহস্পতিবার)
হবিগঞ্জের সাতছড়ি-রেমায় গাছ লু/টের ‘মাস্টারমাইন্ড’ কারা? গোপন নথিতে সরকারি দলের নেতাকর্মীসহ ৬২ জনের নাম

ছবি: সংগৃহীত

হবিগঞ্জ জেলার সীমান্তবর্তী সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান ও রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্যকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে চলা সংঘবদ্ধ বন লুটপাটের এক চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে এসেছে একটি গোপনীয় তদন্ত প্রতিবেদনে। একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে, হবিগঞ্জের অনুসন্ধান এবং তার ভিত্তিতে সিলেট বন বিভাগের জারি করা সরকারি নির্দেশনায় স্পষ্ট হয়েছে- বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় স্থানীয় বনদস্যু ও রাজনৈতিক পরিচয়ধারী প্রভাবশালীদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট বছরের পর বছর ধরে মূল্যবান সেগুনসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কেটে পাচার করে আসছে।

প্রতিবেদনটি হাতে পেয়ে ৬২ জনের বিরুদ্ধেই চুনারুঘাট থানায় মামলা দায়ের করেছে বন বিভাগ। বুধবার বিকেলে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুর রহমান।  এর মধ্যে ৪২ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করে রেমা- কালেঙ্গা’র ডিপুটি রেঞ্জার এইচ এম এরশাদ এবং সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের ডিপুটি রেঞ্জার মোবারক হোসেন আরো একটি মামলা দায়ের করেন ২০ জনের বিরুদ্ধে ।  এ বিষয়ে এইচ এম এরশাদ জানান, গতকালই তারা চুনারুঘাট থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন। 

প্রতিবেদনে চুনারুঘাট উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল করিম সরকার, উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মারুফ মিয়া, উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম-আহবায়ক শফিক মিয়া মহালদার, উপজেলা শ্রমিক দলের সিনিয়র যুগ্ম-আহবায়ক জাহাঙ্গীর খানসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দায়ের করা হয়। এছাড়া অভিযুক্তের তালিকায় উপজেলার মিরাশী ইউনিয়ন কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান সোহাগের নামও রয়েছে। 

তবে অভিযুক্ত করিম সরকার, শফিক মিয়া ও জাহাঙ্গীর আলমের সাথে কথা হলে তারা ইমজা নিউজকে  এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন। প্রত্যেকেই দাবি করেন, একটা পক্ষ তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। তবে কে বা কারা এই ষড়যন্ত্র সেটা তারা জানাতে পারেননি।

সরকারি নথি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনার পর এই বিষয়ে তদন্ত শুরু হয় এবং পরবর্তীতে বন অধিদপ্তর ও পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একটি গোপনীয় প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের, জড়িত বনকর্মীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং চুনারুঘাট উপজেলায় গড়ে ওঠা অবৈধ করাতকল ও কাঠের ডিপো উচ্ছেদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ২১ জুলাই ২০২৬ তারিখে সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে এ সংক্রান্ত চিঠি জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠানো হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান ও রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্যের লুটপাটের বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান চুনারুঘাট ও মাধবপুর উপজেলায় প্রায় ২৪৩ হেক্টর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। সাতটি পাহাড়ি ছড়া থাকার কারণে এর নাম সাতছড়ি। এখানে সাতছড়ি ও তেলমাছড়া নামে দুটি বিট রয়েছে এবং বন বিভাগের অধীনে একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী দায়িত্বে থাকলেও নিয়মিত সেগুনসহ বিভিন্ন গাছ চুরির ঘটনা ঘটছে। তদন্তে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, দায়িত্বে থাকা কিছু বনকর্মীর যোগসাজশেই এই চুরি সংঘটিত হচ্ছে।

অন্যদিকে, চুনারুঘাট ও বাহুবল উপজেলায় বিস্তৃত প্রায় ১ হাজার ৭৯৫ হেক্টর আয়তনের রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্যে রেমা, কালেঙ্গা, ছনবাড়ি ও রশিদপুর নামে চারটি বিট রয়েছে। এখানে ২৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত থাকলেও বনদস্যুরা নিয়মিত বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে। এখানেও বন বিভাগের ভেতরের অসাধু চক্রের যোগসাজশের বিষয়টি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে মোট ৬২ জন ব্যক্তির নামের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে গাছ কাটা ও চুরির সঙ্গে জড়িত ১২ জনের মধ্যে রয়েছেন হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার দেওরগাছ গ্রামের মৃত শামসুদ্দিন মিয়ার পুত্র মারুফ মিয়া;  উত্তর আমকালদি গ্রামের মুনায়েম;  মাধবপুর উপজেলার রতনপুর, শাহজাহানপুর এলাকার মৃত মন্তর হোসেনের পুত্র শফিকুল ইসলাম আবুল;  চুনারুঘাট উপজেলার দেওরগাছ গ্রামের মনান মিয়ার পুত্র কালা মিয়া;  কাঠালবাড়ি গ্রামের আরজু মিয়ার পুত্র আব্দুল কুদ্দুস;  মাবিস্তাপুর গ্রামের মোস্তফার পুত্র জসিম;  গাজীপুর গ্রামের ওযায়ছ উল্লাহর পুত্র তাহির মিয়া;  বদরগাজী গ্রামের মৃত ইউনুস আলীর পুত্র আঃ জলিল মিয়া;  করমপুর গ্রামের মৃত মকছুদ আলীর পুত্র রফিক মিয়া;  করমপুর গ্রামের মৃত মকছুদ আলীর পুত্র হেলাল মিয়া; করমপুর গ্রামের মৃত মকছুদ আলীর পুত্র মকবুল মিয়া; এবং  মাধবপুর উপজেলার ইটখোলা গ্রামের মৃত সানা উল্লাহর পুত্র মাসুম বিল্লাহ।

রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্যে গাছ চুরির সঙ্গে জড়িত ৩৪ জনের তালিকায় প্রথমেই রয়েছে মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত। তারা হলেন, হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার মিরাশি ইউপির পীরেরগাঁও (পীরপুর) গ্রামের আব্দুল করিমের পুত্র সুমন;  রুবেল মিয়া;  আব্দুর রহিমের পুত্র শাহীন;  নিশ্চিতপুর গ্রামের কাছম আলীর পুত্র মানিক মিয়া (২৫);   সাহিদ মিয়া (৩০);  সফিক মিয়া (২৭);  তৈয়ব আলীর পুত্র রুবেল মিয়া (৩৫);  মিশন মিয়া (২৫);  আক্তার মিয়ার পুত্র দুলাল মিয়া (২৮);  আবু তাহেরের পুত্র পারভেজ মিয়া (২৪);  অলি মিয়ার পুত্র সামিল মিয়া (২৫);  ছলিম মিয়ার পুত্র সোহাগ মিয়া (২৪);  তোলারজুম গ্রামের আব্দুল নুরের পুত্র আব্দুল করিম;  মৃত আব্দুল জলিলের পুত্র তাজুল ইসলাম আঞ্জাস (৩৫);   মৃত আব্দুল জলিলের পুত্র সিদ্দিক মিয়া (৩৮);  মনাই মিয়ার পুত্র আরজু মিয়া (৩৫);  সামসু মিয়ার পুত্র জাবির মিয়া (৩২);  ইসলাম উদ্দিনের পুত্র কাজল মিয়া (৩২);  ইসলাম উদ্দিনের পুত্র তাজুল মিয়া (৩০);  জসিম আলীর পুত্র নূর আলী (২৬);  আলপি মিয়ার পুত্র তৌকির মিয়া (৩২);  মৃত আব্দুল মালিকের পুত্র মিজানুর রহমান কয়াল (৩২);  লুতু মিয়ার পুত্র সেলিম মিয়া (২৭);  আব্দুল মালেকের পুত্র বিল্লাল মিয়া (৩৩);  মৃত সুগা মিয়ার পুত্র আক্তার মিয়া (৩৫); মৃত আব্দুল জাহিরের পুত্র আব্দুল খালেক (৪০);  ছাদু মিয়ার পুত্র মোশাহিদ মিয়া ওরফে কালে;  মৃত আলতা মিয়ার পুত্র ফয়সাল আহমেদ তুহিন;  লাল মিয়ার পুত্র মোতাব্বির;  জাহাঙ্গীরের পুত্র আজাদ;  আফছিরের পুত্র রুবেল;  মৃত আঃ জলিলের পুত্র একলাছ মিয়া;  লাল মিয়ার পুত্র মাসুক; এবং  জানু মিয়ার পুত্র রাসেল মিয়া।

এছাড়া গাছ কাটা ও পাচারে সহায়তাকারী বন বিভাগের পাঁচ কর্মকর্তা-কর্মচারীর নামও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তারা হলেন, সাতছড়ি রেঞ্জের সাবেক বিট অফিসার মাসুনুর রশিদ, যিনি ইতোমধ্যে সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন; তেলমাছড়া ও সাতছড়ি বিটের বিট অফিসার মেহেদী হাসান; সাতছড়ি রেঞ্জের জুনিয়র ওয়াইল্ড স্কাউট নূর মোহাম্মদ; ফরেস্ট গার্ড সুমন বিশ্বাস; এবং বাগান মালী শেখ আহমেদ।
এছাড়া রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে রয়েছেন হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার ময়লাবাদ গ্রামের মৃত শামসুদ্দিনের পুত্র মারুফ মিয়া (উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব);  আইতন গ্রামের মোঃ আমির আলীর পুত্র জাহাঙ্গীর খান;  চন্দনা (ঘোলাইপাড়) গ্রামের শফিক মিয়া মহালদার (যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক);   পাকুড়িয়া গ্রামের মৃত আব্দুল হুকের পুত্র করিম সরকার (বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক);  রতনপুর গ্রামের তৌহিদুল ইসলামের পুত্র বেলাল;  বড়াচা গ্রামের মৃত মানিক মিয়ার পুত্র জমুরত;  পাকুড়িয়া গ্রামের মজিদ মিয়ার পুত্র সোহেল; এবং  রতনপুর গ্রামের ফনা মিয়ার পুত্র মিজানুর রহমান সোহাগ (কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক)।

প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, বনাঞ্চলে মোবাইল নেটওয়ার্কের দুর্বলতা, সন্ধ্যার পর মানুষের সীমিত চলাচল এবং দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের সুযোগে দুর্বৃত্তরা নির্বিঘ্নে গাছ কেটে পাচার করছে। একই সঙ্গে বনাঞ্চলের আশপাশে গড়ে ওঠা অবৈধ করাতকলগুলো চোরাই কাঠ প্রক্রিয়াজাত করার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়া এবং সড়ক-মহাসড়কে দুর্বল নজরদারির সুযোগে এই সিন্ডিকেট আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।

সব মিলিয়ে এই তদন্ত প্রতিবেদন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, বন বিভাগের ভেতরের অসাধু অংশের সহযোগিতা ছাড়া এত বড় পরিসরে বন লুটপাট সম্ভব নয়। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই বনাঞ্চল অচিরেই মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে- এমন আশঙ্কাই করছেন সংশ্লিষ্টরা।