ছবি: সংগৃহীত
ডারউইনের আকাশে যে বিজয়ের সূর্য উঠেছিল, ম্যাকাইয়ের গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনায় এসে যেন তার আলো হঠাৎই ম্লান হয়ে গেল। ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ঐতিহাসিক জয়ের যে গল্প শুরু করেছিল বাংলাদেশ, দ্বিতীয় টেস্টে এসে সেই গল্পের পাতায় জমল হতাশার কালো কালি। মাত্র দুই দিনে শেষ হয়ে গেল টেস্ট। ইনিংস ও ৫৮ রানের হারে সিরিজ ১-১ সমতায় শেষ করল বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া।
প্রথম টেস্টে ৯ উইকেটের অবিশ্বাস্য জয় বাংলাদেশকে দিয়েছিল স্বপ্ন দেখার সাহস। কিন্তু ম্যাকাইয়ে সেই স্বপ্নের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল মিচেল স্টার্কের আগুনঝরা গতি। টস জিতে বাংলাদেশকে ব্যাটিংয়ে পাঠিয়েছিলেন অস্ট্রেলীয় অধিনায়ক প্যাট কামিন্স। প্রথম ওভারের প্রথম বলেই সাদমান ইসলামকে ফিরিয়ে যে ধ্বংসযজ্ঞের সূচনা করেন স্টার্ক, তার রেশ কাটেনি পুরো ইনিংসজুড়ে।
তানজিদ হাসান, নাজমুল হোসেন শান্ত, মুমিনুল হক ও লিটন দাস; এক এক করে শূন্য রানে ফিরে গেলেন সাজঘরে। মাত্র ১২ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং তখন যেন ঝড়ের মধ্যে ভেসে যাওয়া নৌকা। শেষ পর্যন্ত তাইজুল ইসলাম ও শরিফুল ইসলামের ২৫ রানের ছোট্ট জুটি দলকে ৬৪ পর্যন্ত টেনে নেয়। একাই ৬ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন স্টার্ক।
কিন্তু ক্রিকেটের গল্প তখনও পুরোপুরি একপেশে হয়নি। অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়েও দাঁত বসান বাংলাদেশের পেসাররা। বিশেষ করে শরিফুল ইসলামের আগুনে স্পেলে কেঁপে ওঠে স্বাগতিকদের ব্যাটিং। প্রথম দিনেই ১৬৫ রানে ৮ উইকেট হারায় অস্ট্রেলিয়া। দ্বিতীয় দিনে ক্যামেরন গ্রিনের ৬৭ রানের প্রতিরোধ ভেঙে ২১০ রানে অলআউট করে বাংলাদেশ।
সেই ইনিংসে শরিফুল লিখেছেন নিজের ক্যারিয়ারের অনন্য এক অধ্যায়। মাত্র ১৫ ওভারে ৪৮ রান দিয়ে ৭ উইকেট; বিদেশের মাটিতে কোনো বাংলাদেশি বোলারের সেরা টেস্ট বোলিং ফিগার এটি। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ১৯৯৩ সালের পর কোনো সফরকারী বোলারেরও এটি সেরা বোলিং নৈপুণ্য।
কিন্তু পেসারদের সেই গর্জন ব্যাটারদের ব্যর্থতায় শেষ পর্যন্ত চাপা পড়ে যায়। ১৪৬ রানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংসে নামা বাংলাদেশ আবারও হারিয়ে ফেলে ব্যাটিংয়ের পথ। শুরুতেই ৫ রানে ২ উইকেট। এরপরও নাজমুল হোসেন শান্তর ৩১ ও মুশফিকুর রহিমের ২৯ রানের লড়াই কিছুটা আশা জাগিয়েছিল। কিন্তু সেই আশার প্রদীপও বেশিক্ষণ জ্বলল না।
টপ ও মিডল অর্ডারের একের পর এক দায়িত্বজ্ঞানহীন শট যেন নিজেদের কবর নিজেরাই খুঁড়ল। মাত্র ৩৮.৩ ওভারে ৯৫ রানে থেমে গেল বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংস। স্টার্ক নিলেন আরও ৪ উইকেট; কামিন্স ও নাথান লায়ন ভাগ করে নিলেন আরও ৬টি। পুরো ম্যাচে স্টার্কের শিকার ১০ উইকেট।
শেষ পর্যন্ত ম্যাকাই টেস্ট জায়গা করে নিল টেস্ট ইতিহাসের মাত্র দুই দিনে শেষ হওয়া ২৯তম ম্যাচ হিসেবে। অস্ট্রেলিয়া পেল ইনিংস ও ৫৮ রানের জয়, বাংলাদেশ পেল কঠিন এক শিক্ষা।
তবু এই সিরিজের গল্প শুধুই পরাজয়ের নয়। ডারউইনে ৯ উইকেটের ঐতিহাসিক জয় এবং ম্যাকাইয়ে পেসারদের আগুনঝরা বোলিং; দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ দেখিয়েছে, সামর্থ্যের অভাব তাদের নেই। অভাবটা হয়তো ধারাবাহিকতায়, ব্যাটিংয়ের দৃঢ়তায়, চাপের মুহূর্তে মাথা ঠান্ডা রাখার ক্ষমতায়।
ডারউইনের বিজয় যদি হয়ে থাকে বাংলাদেশের ক্রিকেটের আকাশে এক টুকরো রোদ, ম্যাকাইয়ের দুই দিনের পতন তবে সেই রোদের পাশে জমে থাকা কালো মেঘ। সিরিজ শেষ হয়েছে সমতায়, কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ২৩ বছর পর পাওয়া সেই ঐতিহাসিক জয় বাংলাদেশের ক্রিকেটে থেকে যাবে আলাদা এক উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে। আর ম্যাকাই মনে করিয়ে দেবে; বড় দলের বিপক্ষে স্বপ্ন দেখা যতটা সহজ, সেই স্বপ্নকে প্রতিদিন বাঁচিয়ে রাখা ততটাই কঠিন।