ছবি: সংগৃহীত
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন নিয়ে গিয়েছিলেন লিটন দাস। ফিরছেন অবশ্য সেই ইতিহাসের একেবারে বিপরীত প্রান্তে দাঁড়িয়ে; ব্যাট হাতে নিস্তব্ধতা আর পরপর তিনটি শূন্য নিয়ে। দুই টেস্টের তিন ইনিংসে ২৭ বল মোকাবিলা করেও রানের খাতা খুলতে পারেননি বাংলাদেশের এই তারকা ব্যাটার। প্রতিবারই তার সামনে ছিলেন এক নাম; মিচেল স্টার্ক।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এটিই ছিল লিটনের প্রথম দ্বিপাক্ষিক টেস্ট সিরিজ। ২০২২ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দেশটির মাটিতে পাঁচ ম্যাচে একটি ফিফটি করেছিলেন তিনি। তাই এবারের সফরে তার ব্যাটের দিকে ছিল বাড়তি প্রত্যাশা। কিন্তু সেই প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার দূরত্বটা হয়ে গেল বেশ বড়।
ডারউইনে সিরিজের প্রথম টেস্টে বাংলাদেশ যখন ৯ উইকেটের ঐতিহাসিক জয় তুলে নেয়, লিটন তখন নেমেছিলেন ছয় নম্বরে। মাত্র ১২ বল খেলেই স্টার্কের বলে ক্যাচ দিয়ে ফিরতে হয় তাকে। দলের জয় বলে সেদিন সেই ব্যর্থতা খুব একটা আলোচনায় আসেনি। বিজয়ের উল্লাসে চাপা পড়ে গিয়েছিল লিটনের শূন্য।
প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের ব্যাটিং যখন স্টার্কের আগুনঝরা বোলিংয়ে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে, তখন লিটনের কাছ থেকেও আসেনি কোনো প্রতিরোধ। ৫ বল খেলে এলবিডব্লিউ হয়ে ফিরলেন শূন্য রানে। বাংলাদেশ থামল মাত্র ৬৪ রানে; যেখানে দলের সর্বোচ্চ রান ১৪, করেছেন ১১ নম্বরে নামা শরিফুল ইসলাম।
এরপর দ্বিতীয় ইনিংস ছিল লিটনের জন্য শেষ সুযোগ। ১৪৬ রানে পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশ তখন ইনিংস হার এড়ানোর লড়াইয়ে। কিন্তু দলের সবচেয়ে প্রয়োজনের মুহূর্তেও ব্যাট হাসল না লিটনের। ১০ বল খেলেও রানের খাতা খুলতে পারলেন না। প্রথম ৯ বল কোনোভাবে সামলে নিলেও দশম বলে তৃতীয় স্লিপে ব্যু ওয়েবস্টারের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন তিনি।
তিন ইনিংস, ২৭ বল, শূন্য রান; অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে লিটনের প্রথম দ্বিপাক্ষিক সিরিজের পরিসংখ্যান তাই হয়ে থাকল দুঃস্বপ্নের এক সংক্ষিপ্তসার। প্রতিবারই স্টার্কের বলে আউট হওয়ায় যেন অস্ট্রেলিয়া অধ্যায়ের প্রতিটি দরজায় একই তালা ঝুলল।
অথচ এই সিরিজের আগে লিটনের ব্যাটে ছিল আত্মবিশ্বাসের আলো। পাকিস্তানের বিপক্ষে সর্বশেষ সিলেট টেস্টের দুই ইনিংসে করেছিলেন ১২৬ ও ৫৯ রান। সেই ফর্ম নিয়েই অস্ট্রেলিয়ায় পা রেখেছিলেন তিনি। পায়ের চোটের কারণে প্রথম ঘোষিত স্কোয়াডে জায়গা না পেলেও দ্রুত পুনর্বাসন শেষে শেষ মুহূর্তে তাকে দলে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মাঠে ফেরার পর সেই ব্যাট যেন নিজের পরিচিত ভাষাটিই ভুলে গেল।
ক্রিকেটে শূন্য শুধু একটি সংখ্যা নয়; কখনো কখনো সেটি হয়ে ওঠে ব্যর্থতার আয়না। লিটনের জন্য অস্ট্রেলিয়ার এই সফরে সেই আয়নাই বারবার সামনে এসেছে। তবে এই সিরিজ বাংলাদেশের জন্য পুরোপুরি হতাশার নয়; ডারউইনে ৯ উইকেটের ঐতিহাসিক জয় এনে দিয়েছে নতুন আত্মবিশ্বাস। সেই আলোয় লিটনের ব্যর্থতাও হয়তো ভবিষ্যতের প্রত্যাবর্তনের গল্পের একটি অধ্যায় হয়ে থাকবে।
টেস্ট ক্রিকেটে টানা তিন ইনিংসে ডাক খাওয়ার ঘটনা অবশ্য বিরল হলেও নজিরবিহীন নয়। বব হল্যান্ড, অজিত আগারকার ও মোহাম্মদ আসিফ টানা পাঁচ ইনিংসে শূন্যের রেকর্ড গড়েছেন। চার ইনিংসে করে ডাক আছে আরও ৩০ ব্যাটারের, যাদের তালিকায় বাংলাদেশের খালেদ আহমেদও রয়েছেন।
তবু লিটনের তিন ডাকের গল্পটা আলাদা। কারণ তিনবারই প্রতিপক্ষের হাতে একই অস্ত্র; মিচেল স্টার্ক। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়ের স্মৃতি যতদিন আলো ছড়াবে, লিটনের এই সফর ততদিন মনে করিয়ে দেবে ক্রিকেটের নির্মম সত্যটিও; এক ম্যাচের নায়ক হতে যেমন একটি ভালো দিন যথেষ্ট, তেমনি একজন ব্যাটারের আত্মবিশ্বাস ভেঙে দিতে কখনো কখনো একজন বোলারই যথেষ্ট।