ছবি: সংগৃহিত।
সুরমার জলধারায় কত স্মৃতির স্রোত বয়ে যায়, কত নাম কালের গর্ভে হারিয়ে যায়। কিন্তু যাঁরা নিজেদের জীবনকে বিলিয়ে দেন ধরণীর আলো ফোটানোর সাধনায়, কালের নিয়মে তাঁরা হারিয়ে যান না; বরং থেকে যান ইতিহাসের ধ্রুবতারা হয়ে। সিলেটের প্রাতঃস্মরণীয় দুই আলোকবর্তিকা, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নির্ভীক বীর সেনানী সাংবাদিক নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামী এবং মুক্তিসংগ্রামের অনন্যা নারী সুহাসিনী দাস তেমনই দুটি নাম।
শনিবার ২৯ আগস্ট চালিবন্দরস্থ উমেশচন্দ্র-নির্মলাবালা ছাত্রাবাস প্রাঙ্গণে এক ভাবগম্ভীর ও আবেগঘন পরিবেশে পালিত হলো নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামীর ৩৩তম এবং সুহাসিনী দাসের ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকী। কেবল প্রথাগত শ্রদ্ধাঞ্জলি নয়, অনুষ্ঠানটি রূপ নিয়েছিল তাঁদের আদর্শে সমাজকে নতুন করে গড়ার অঙ্গীকারে এবং এক প্রাঞ্জল স্মৃতি-মিলনমেলায়।
স্মরণসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে সিলেট রামকৃষ্ণ মিশন ও আশ্রমের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ স্বামী চন্দ্রনাথানন্দ বলেন, 'সুন্দর ও কল্যাণময় সমাজ বিনির্মাণে নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামী ও সুহাসিনী দাস সমগ্র জীবন সাধনায় ব্রতী ছিলেন। তাঁদের ত্যাগ ও আত্মোৎসর্গের চেতনাকে ধারণ করেই আজকের তরুণ প্রজন্মকে সমাজের কাজে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে হবে।'
ছাত্রাবাস পরিচালনা কমিটির সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী মনোজ বিকাশ দেব রায়ের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক অবসরপ্রাপ্ত উপাধ্যক্ষ কৃষ্ণপদ সূত্রধরের স্বাগত ভাষণে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা হয়। বিশেষ অতিথির অলঙ্কার শোভিত করেন সিলেটের বরেণ্য শিক্ষাবিদ প্রফেসর নৃপেন্দ্র লাল দাশ, শিক্ষাবিদ প্রফেসর নন্দলাল শর্মা এবং শ্রীহট্ট গীতা মন্দিরের আচার্য বিনীত কুমার চক্রবর্ত্তী। এছাড়াও শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন উত্তরা ব্যাংকের প্রাক্তন জিএম ও সমাজসেবী নীরেশ চন্দ্র দাশ, এপেক্সিয়ান চন্দন দাশ, প্রফেসর বিজিত কুমার ভট্টাচার্য্য এবং প্রফেসর সত্যেন্দ্র কুমার শীল।
আলোকিত এই আয়োজনের সবচেয়ে হৃদয়গ্রাহী অংশ ছিল ছাত্রাবাসের শিক্ষার্থীদের স্মৃতিচারণ ও সাংস্কৃতিক সুরের মূর্ছনা। তিলোত্তমা শর্মা অনন্যা, অর্পিতা বাড়ৈ, অন্না রাণী রায়, আঁখি দাশ, ঋতু রাণী গোপ, পুস্পিতা দেবনাথ পৌষী ও ঋতু শুক্ল বৈদ্যের কণ্ঠে গীত সুর আর প্রত্যয় চক্রবর্ত্তীর তবলার লহরে মিলনায়তনে সৃষ্টি হয় এক আত্মিক আবাহন। সঞ্চালনায় ছিলেন শিক্ষার্থী ইতি সিনহা। প্রীতি রাণী নাথ পূর্ণা, বিথী রাণী নাথ বর্ণা, জয় পাল ও আলো রাণী শর্মার আবেগঘন স্মৃতিচারণে জীবন্ত হয়ে ওঠেন দুই মনীষী।
প্রয়াত গুণীজনদের স্মৃতিকে অম্লান রাখতে এবং আগামীর সুরভিত বার্তা ছড়িয়ে দিতে ৩৩ জন শিক্ষার্থীর হাতে তুলে দেওয়া হয় বিশেষ স্মৃতি বৃত্তি:‘নীহার সেন’ স্মৃতি বৃত্তি: ৩টি, ‘হরিদাস-বনলতা-রাকেশ’ স্মৃতি বৃত্তি: ১৬টি,‘শেফালী-নির্মলা’ স্মৃতি বৃত্তি: ১৪টি। প্রতিটি বৃত্তির মূল্যমান ছিল ৫ হাজার টাকা, যা শিক্ষার্থীদের বিদ্যাচর্চায় জোগাবে নতুন আলো।
দিনশেষে মধ্যাহ্নভোজের প্রীতি-আতিথেয়তায় শেষ হয় আয়োজনটি। সিলেটের গুণীজন, সুধী সমাজ এবং প্রাক্তনীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে পুরো প্রাঙ্গণ রূপান্তরিত হয়েছিল এক মহামিলনমেলায়, যেখানে শোক নয়, উদযাপিত হয়েছে দুই মহাপ্রাণের অমর জীবনগাথা।