প্রকাশিত : ৩০ আগস্ট, ২০২৬ ১৮:৫৫ (সোমবার)
ঘণ্টার শব্দে বেঁচে গেল ১ হাজার ৬৪৩ শিশুর ভাগ্য

ছবি: সংগৃহীত

‘গ্রামটি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। আমাকে বলল, দৌড়াও।’
বন্ধুর ফোনে পাওয়া মাত্র কয়েকটি শব্দই যেন মুহূর্তে বদলে দিল নেপালের ত্রিশূলী উপত্যকার ত্রিভুবন ত্রিশূলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদির সকাল।

বুধবার সকাল ৯টা ২০ মিনিট। স্কুল ও আশপাশে তখন ব্যস্ততা। শ্রেণিকক্ষে পড়াশোনায় ব্যস্ত ১ হাজার ৬৪৩ শিক্ষার্থী। নদী থেকে প্রায় ৬০ মিটার উঁচুতে তিনতলা স্কুল ভবন হওয়ায় ৪৭ বছর বয়সী প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদিও প্রথমে বড় কোনো বিপদের আশঙ্কা করেননি।

কিন্তু বন্ধুর সতর্কবার্তা পাওয়ার পর বদলে যায় সবকিছু।

দাওয়াদি বুঝতে পারেন, স্বাভাবিক কোনো বন্যা নয়; দ্রুত ধেয়ে আসছে ভয়াবহ স্রোত। সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তার হাতে ছিল মাত্র কয়েক মিনিট। সেই মুহূর্তে তিনি কোনো ঝুঁকি নেননি।

স্কুলের ঘণ্টা বাজিয়ে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষ থেকে বের করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি। একই সঙ্গে স্কুলবাসের চালকদের ফোন করে শিশুদের দ্রুত সরিয়ে নিতে বলেন।

কেউ তখনও হয়তো বুঝে উঠতে পারেনি সামনে কী অপেক্ষা করছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। এক ছাত্রী ভয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে মোটরসাইকেলে করে উঁচু এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। বাকিরা যে যেভাবে পারে পায়ে হেঁটে নিরাপদ স্থানের দিকে ছুটতে থাকে। তাদের সঙ্গে ছুটছিলেন প্রধান শিক্ষকও।

শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা একটি বোধিবৃক্ষের নিচে আশ্রয় নেয়।

এর কিছুক্ষণ পরই ঘটে ভয়াবহ দৃশ্য। প্রচণ্ড বেগে ধেয়ে আসা বন্যার স্রোত স্কুল ভবনসহ আশপাশের স্থাপনা ভাসিয়ে নিয়ে যায়। যে ভবনটি কয়েক মিনিট আগেও ছিল শিশুদের কোলাহলে মুখর, মুহূর্তেই সেটি পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে।

তবে সেই ধ্বংসস্তূপের গল্পের সবচেয়ে বড় স্বস্তির জায়গাটি হলো; ১ হাজার ৬৪৩ শিক্ষার্থীর একজনও মারা যায়নি।

প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদির কয়েক মিনিটের উপস্থিত বুদ্ধি তাদের জীবন বাঁচিয়ে দেয়।

কিন্তু সবাইকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। ইতিহাসের শিক্ষক ৩২ বছর বয়সী সান্তোষ পারিয়ার সকালের নাশতা রান্না করতে নদীর পাশে নিজের ভাড়া করা ঘরে ফিরে গিয়েছিলেন। ভয়ংকর স্রোতে তিনি ভেসে যান। স্কুলের পরিচ্ছন্নতাকর্মী সুলতান লামাও দরজা বন্ধ করতে ফিরে গিয়ে প্রাণ হারান।

শিক্ষার্থীদের বাঁচানোর পর স্থানীয় মানুষের কাছে দাওয়াদি হয়ে ওঠেন নায়ক। কিন্তু নিজের কৃতিত্বের কথা বলতে চান না তিনি। ধ্বংস হয়ে যাওয়া স্কুল ভবনের দিকে তাকিয়ে তার সরল প্রশ্ন; ‘আমি আর কী করতে পারতাম?’