প্রকাশিত : ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০০:২১ (মঙ্গলবার)
বাবুলের ১৬৪ জবানবন্দি নিয়ে প্রশ্ন, এডভোকেট সিরাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা দাবি

ছবি: ইমজা নিউজ

সিলেট নগরীর রায়নগরে আবদুস সাত্তার, তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনা বেগম হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও দ্রুত তদন্তের দাবি জানিয়েছে ‘ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা কমিটি’। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের তদন্তে ১৬৪ ধারায় দেওয়া আসামি বাবুল মিয়ার জবানবন্দি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কমিটির নেতারা। তাদের দাবি, পুলিশের শেখানো কথাই জবানবন্দিতে বলেছেন বাবুল।

এ ঘটনায় ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধের সূত্র ধরে অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানানো হয়েছে।

সোমবার সিলেট নগরীর একটি রেস্টুরেন্টে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানানো হয়। পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতি, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও লিজগ্রহীতাদের সমন্বয়ে গঠিত ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা কমিটির সমন্বয়ক মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, রিকাবীবাজারে নির্মাণাধীন ইম্পালস টাওয়ারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে ভূমি নিয়ে বিরোধ, মামলা-মোকদ্দমা ও নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। প্রায় ২০ বছর ধরে এ নিয়ে আইনি লড়াই চলছে। নিহত আবদুস সাত্তার এ-সংক্রান্ত একাধিক মামলার বাদী এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ছিলেন।

তাদের দাবি, ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ ও মামলা প্রত্যাহারের জন্য আবদুস সাত্তার ও তাঁর পরিবারকে দীর্ঘদিন ধরে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছিল।

সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, ২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারি অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে রায়নগরে আবদুস সাত্তারের বাসায় যান। সেখানে পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির ভূমির মালিকানা দাবি করে ২১১/২০২৩ নম্বর স্বত্ব মামলা প্রত্যাহারের জন্য তাঁকে চাপ দেওয়া হয়। সাত্তার এতে রাজি না হওয়ায় তাঁকে হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন বক্তারা।

এ ঘটনায় নিহতের মেয়ে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী সেলিনা সুলতানা ২০২৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি কোতোয়ালি মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

বক্তারা আরও অভিযোগ করেন, ২০২৫ সালের ১৮ মে আদালত প্রাঙ্গণে অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলামের হামলায় আবদুস সাত্তার ও তৌহিদুল ইসলাম আহত হন। পরে তাঁরা সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় করা সিআর ১০৫৭/২০২৫ নম্বর মামলা বর্তমানে ডিবি সিলেট তদন্ত করছে বলে দাবি করা হয়।

বাবুলের ১৬৪ ধারার জবানবন্দি নিয়ে প্রশ্ন

সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা কমিটির সমন্বয়ক তৌহিদুল ইসলাম ট্রিপল মার্ডার মামলার প্রধান আসামি বাবুল মিয়ার আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

তিনি দাবি করেন, বাবুল মিয়া পুলিশের শেখানো কথাই ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে বলেছেন। তাঁর বক্তব্য, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও এর পেছনে কারা রয়েছে, তা বের করতে তদন্তকারীদের জবানবন্দির পাশাপাশি মামলার অন্যান্য আলামত, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও পূর্বের বিরোধগুলোও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

তৌহিদুল ইসলাম বলেন, কোনো একটি জবানবন্দির ওপর নির্ভর না করে হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া উচিত। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের আগে নিহত আবদুস সাত্তারের সঙ্গে কারা বিরোধে জড়িত ছিলেন, তাঁকে কারা হুমকি দিয়েছিলেন এবং এসব হুমকির সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না; তা খতিয়ে দেখার দাবি জানান তিনি।

সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা দাবি

সংবাদ সম্মেলনে অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে ভূমি দখল, জাল দলিল তৈরি ও মামলাসংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগ তুলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।

বক্তাদের অভিযোগ, ৫৬৪/৯৬ নম্বর আমমোক্তারনামার মাধ্যমে ১৮৫২২/২০০৬ নম্বর দলিল তৈরি করে পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির মালিকানাধীন জমি দখল করে বহুতল ইম্পালস টাওয়ার নির্মাণ করা হয়েছে।

তাদের দাবি, এ-সংক্রান্ত মামলায় নিম্ন আদালত ১৮৫২২/২০০৬ ও ১৪০৬২/২০০৫ নম্বর দলিলকে অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করেছেন। পরবর্তীতে হাইকোর্ট বিভাগও সংশ্লিষ্ট আপিল খারিজ করে নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

ভূমি জালিয়াতি ও কবরস্থানের শ্রেণি পরিবর্তনের অভিযোগে সিরাজুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দুদক জিআর ০২/২০২১ নম্বর মামলা দায়ের হয়েছে বলেও দাবি করেন বক্তারা। তাঁদের ভাষ্য, ওই মামলায় সিরাজুল ইসলাম দীর্ঘদিন জেলহাজতে ছিলেন।

তদন্তে সব দিক খতিয়ে দেখার দাবি

ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা কমিটির পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও দুদকের প্রতি ট্রিপল মার্ডারের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে তদন্তের অগ্রগতি জনগণকে অবহিত করা, গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ভূমি-বিরোধের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানানো হয়।

বক্তারা অভিযোগ করেন, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতে এবং তদন্তকে বিভ্রান্ত করতে কিছু ফেসবুক আইডি থেকে মিথ্যা তথ্য ও গুজব ছড়ানো হচ্ছে। এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানান তাঁরা।

তাঁদের বক্তব্য, সংবাদ সম্মেলনের উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়; বরং আবদুস সাত্তার, সুরাইয়া বেগম ও তাহমিনা বেগম হত্যার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনা।

একই সঙ্গে লুসাই খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্যতা প্রকাশ এবং অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।