প্রকাশিত : ০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:২০ (শুক্রবার)
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পেতে সামাজিকমাধ্যমে যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে

ছবি এআই জেনারেটেড

যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা, চাকরি, ব্যবসা, পরিবার নিয়ে বসবাস কিংবা ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন? তাহলে পাসপোর্ট, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, চাকরির কাগজপত্র ও শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি সামাজিকমাধ্যমে নিজের ‘ডিজিটাল পরিচয়’ নিয়েও সতর্ক থাকা জরুরি। কারণ, মার্কিন ভিসা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে আবেদনকারীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্যও বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে।

ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, এক্স, লিংকডইনসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে দেওয়া তথ্য যদি ভিসা আবেদনের তথ্যের সঙ্গে বড় ধরনের অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে আবেদনকারীর কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হতে পারে। একইভাবে সন্ত্রাসবাদ, সহিংসতা, উগ্রবাদ কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ও জননিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে—এমন অনলাইন কর্মকাণ্ডও নিরাপত্তা যাচাইয়ে গুরুত্ব পেতে পারে।

পাঁচ বছরের সামাজিকমাধ্যমের তথ্য

মার্কিন সরকারের ভিসা আবেদনসংক্রান্ত নির্দেশনা অনুযায়ী, নির্ধারিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মে আবেদনকারী গত পাঁচ বছরে যেসব পরিচয় বা হ্যান্ডেল ব্যবহার করেছেন, সেসব তথ্য চাওয়া হতে পারে। এখানে ‘সোশ্যাল মিডিয়া আইডেন্টিফায়ার’ বলতে ব্যবহারকারীর নাম, ইউজারনেম, হ্যান্ডেল, আইডি লিংক বা অনলাইনে তাকে শনাক্ত করার তথ্যকে বোঝানো হয়।

তবে সামাজিকমাধ্যমের হ্যান্ডেল চাওয়া আর পাসওয়ার্ড চাওয়া এক বিষয় নয়। ভিসা আবেদনে সামাজিকমাধ্যম অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড দেওয়ার নিয়ম নেই।

কোন কোন তথ্য গুরুত্বপূর্ণ

সামাজিকমাধ্যমে থাকা তথ্যের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে—

পরিচয়: আবেদনপত্রে দেওয়া নাম ও পরিচয়ের সঙ্গে সামাজিকমাধ্যমের তথ্যের বড় ধরনের অসামঞ্জস্য থাকলে প্রশ্ন উঠতে পারে।

চাকরি ও পেশা: DS-160-এ একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরির তথ্য দেওয়া হলেও ফেসবুক বা লিংকডইনে একই সময়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে চাকরির তথ্য থাকলে সেটি ব্যাখ্যার প্রয়োজন হতে পারে।

শিক্ষা: আবেদনপত্রে উল্লেখ করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ডিগ্রি বা সময়কালের সঙ্গে প্রকাশ্য অনলাইন তথ্যের বড় পার্থক্য থাকলেও বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে।

ভ্রমণের উদ্দেশ্য: যে ভিসার জন্য আবেদন করা হচ্ছে, সামাজিকমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্য বা কর্মকাণ্ড যদি সেই ভিসার উদ্দেশ্যের সঙ্গে গুরুতরভাবে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে তা প্রশ্নের কারণ হতে পারে।

নিরাপত্তা: সন্ত্রাসবাদ, সহিংসতা, উগ্রবাদ কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সমর্থনসূচক অনলাইন কনটেন্ট নিরাপত্তা যাচাইয়ে গুরুতর বিষয় হতে পারে।

রাজনৈতিক পোস্ট করলেই ভিসা বাতিল?

সামাজিকমাধ্যমে রাজনৈতিক মতামত প্রকাশ করলেই যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা বাতিল হবে—এমন কোনো সাধারণ নিয়মের কথা সরকারি নথিতে বলা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সমালোচনা করা এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করা এক বিষয় নয়।

তবে কোনো রাজনৈতিক পোস্টে সন্ত্রাসবাদে সমর্থন, সহিংসতার আহ্বান বা আইন অনুযায়ী ভিসার অযোগ্যতার অন্য কোনো বিষয় থাকলে সেটি ভিন্নভাবে বিবেচিত হতে পারে।

‘আমেরিকায় স্থায়ী হব’ লিখলেই ভিসা বাতিল নয়

সামাজিকমাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেই ভিসা বাতিল হবে—এমন সর্বজনীন নিয়মও নেই। বিষয়টি নির্ভর করে আবেদনকারী কোন ধরনের ভিসার জন্য আবেদন করছেন তার ওপর। ইমিগ্রেশন ভিসার ক্ষেত্রে স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়াই উদ্দেশ্য হতে পারে। আবার নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসার ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য ও আইনি শর্ত আলাদা।

পার্টি বা অ্যালকোহলের ছবি থাকলে?

ফেসবুকে পার্টি, বৈধ অ্যালকোহল গ্রহণ বা ধূমপানের ছবি থাকলেই ভিসা বাতিল হবে—এমন কোনো সাধারণ সরকারি নিয়মের উল্লেখ নেই। তবে কোনো প্রকাশ্য কনটেন্ট যদি মাদকসংক্রান্ত অপরাধ বা ভিসার অযোগ্যতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ করে, তাহলে সেটির গুরুত্ব ভিন্ন হতে পারে।

একইভাবে সামাজিকমাধ্যমে অশ্লীল ছবি বা রাগের পোস্ট দেখেই আবেদনকারীর ‘ব্যক্তিত্বের নম্বর’ দেওয়া হয়—এমন কোনো সরকারি নিয়মও নেই। মূল বিষয় হলো ভিসার আইনগত যোগ্যতা, পরিচয় ও নিরাপত্তা যাচাই।

পুরোনো পোস্ট মুছে ফেললে কী হবে?

ভিসা আবেদনের আগে পুরোনো পোস্ট মুছে ফেললেই মার্কিন কর্তৃপক্ষের সন্দেহ বাড়বে—এমন সরকারি নিয়ম পাওয়া যায়নি। তবে আবেদনপত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্য গোপন করা বা মিথ্যা তথ্য দেওয়া গুরুতর বিষয়।

তাই আতঙ্কিত হয়ে সামাজিকমাধ্যম থেকে সব পুরোনো পোস্ট, রাজনৈতিক মতামত বা ছবি মুছে ফেলার চেয়ে DS-160-এ সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জার চ্যাট?

DS-160-এ সামাজিকমাধ্যমের পরিচয় বা হ্যান্ডেল চাওয়া এবং ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জার কথোপকথন পড়া—দুটি আলাদা বিষয়। সরকারি প্রকাশিত নিয়মে মূলত সামাজিকমাধ্যমের পরিচয় বা হ্যান্ডেলের তথ্য চাওয়ার কথা বলা হয়েছে। ভিসা আবেদন করলেই কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জারের সব কথোপকথন পড়বেন—এমন দাবির সরকারি ভিত্তি নেই।

কিছু ভিসায় প্রোফাইল পাবলিক রাখার নির্দেশ

সাম্প্রতিক সময়ে নির্দিষ্ট কিছু ভিসা শ্রেণির আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে অনলাইন উপস্থিতি যাচাই আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। এসবের মধ্যে H-1B, সংশ্লিষ্ট H-4 এবং F, M ও J ভিসার আবেদনকারীরা রয়েছেন। ২০২৬ সালের ৩০ মার্চ থেকে আরও কয়েকটি নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা শ্রেণিকে এই বর্ধিত যাচাইয়ের আওতায় আনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

এ ধরনের নির্দিষ্ট শ্রেণির আবেদনকারীদের সামাজিকমাধ্যম প্রোফাইলের privacy setting ‘Public’ বা ‘Open’ রাখার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

২০১৯ সাল থেকেই সামাজিকমাধ্যমের তথ্য সংগ্রহ

যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা আবেদনে সামাজিকমাধ্যমের পরিচয় সংগ্রহ ২০২৬ সালের নতুন কোনো ব্যবস্থা নয়। ২০১৯ সালের ৩১ মে থেকে বিশ্বের অধিকাংশ অভিবাসী ও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা আবেদনকারীর কাছ থেকে নির্দিষ্ট সামাজিকমাধ্যমে ব্যবহৃত পরিচয় বা ‘সোশ্যাল মিডিয়া আইডেন্টিফায়ার’ সংগ্রহ শুরু হয়।

পরবর্তী সময়ে নির্দিষ্ট ভিসা শ্রেণির ক্ষেত্রে অনলাইন উপস্থিতি যাচাইয়ের পরিধি আরও বাড়ানো হয়েছে।

আবেদনকারীর করণীয়

যুক্তরাষ্ট্রের ভিসার জন্য আবেদনকারীদের কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত—

১. DS-160 সঠিক ও পূর্ণাঙ্গভাবে পূরণ করতে হবে।

২. গত পাঁচ বছরে ব্যবহৃত সামাজিকমাধ্যমের হ্যান্ডেল সঠিকভাবে উল্লেখ করতে হবে।

৩. চাকরি ও শিক্ষার তথ্য সামাজিকমাধ্যমের প্রকাশ্য প্রোফাইলের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হবে।

৪. ভিসার জন্য আলাদা ‘পরিষ্কার’ অনলাইন পরিচয় তৈরি করে প্রকৃত তথ্য গোপনের চেষ্টা করা উচিত নয়।

৫. ভিসার ধরন ও যুক্তরাষ্ট্র সফরের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামাজিকমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের বড় ধরনের বিরোধ আছে কি না, তা খেয়াল করতে হবে।

৬. সন্ত্রাসবাদ, সহিংসতা, উগ্রবাদ বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সমর্থনসূচক কনটেন্টের বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে।

৭. বর্ধিত অনলাইন স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকা আবেদনকারীদের প্রোফাইলের privacy setting নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।

সবশেষে, সামাজিকমাধ্যম যাচাইকে কেবল ‘চরিত্র পরীক্ষা’ হিসেবে না দেখে পরিচয়, যোগ্যতা, নিরাপত্তা ও প্রযোজ্য আইনি মানদণ্ডের অংশ হিসেবে দেখা উচিত। মার্কিন ভিসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আবেদনপত্রে সঠিক তথ্য দেওয়া এবং নিজের ভিসার ধরন ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করা।

সূত্র: মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ভিসা ও কনস্যুলারবিষয়ক সরকারি নির্দেশনা, Travel.State.Gov এবং U.S. Federal Register-এ প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট নীতিমালা।