প্রকাশিত : ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৪:৫৫ (বৃহস্পতিবার)
মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্তের সমালোচনা ও প্রতিবাদ

মৌখিক পরীক্ষায় নাম্বার বাড়ানোর রাবিতে প্রতিবাদ (ছবি: সংগৃহীত)

সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার। ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারী নিয়োগে মৌখিক পরীক্ষার (ভাইভা) নম্বর সর্বোচ্চ ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বর কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এ-সংক্রান্ত খসড়া বিধিমালা ইতোমধ্যে প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটিতে অনুমোদন পেয়েছে। তবে এখনো এটি গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়নি।

প্রস্তাবিত পরিবর্তন সামনে আসার পর থেকেই সরকারি চাকরিপ্রত্যাশীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। মঙ্গলবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ হয়েছে। চাকরিপ্রত্যাশীরাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। তাদের অভিযোগ, লিখিত পরীক্ষার গুরুত্ব কমিয়ে ভাইভার নম্বর বাড়ানো হলে নিয়োগে তদবির, স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের সুযোগ বাড়তে পারে।

অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বর্তমান নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি পরীক্ষার্থী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের মতো অনিয়ম ঠেকিয়ে প্রকৃত যোগ্য প্রার্থী বাছাই করতেই পরীক্ষার মানবণ্টনে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দাবি, এটি মেধাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের অংশ।

প্রস্তাবিত ‘মন্ত্রণালয় বা বিভাগ ও এর আওতাধীন অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, দপ্তর ও সংস্থাগুলোর ১১-২০তম গ্রেডে সরাসরি নিয়োগের জন্য পরীক্ষার মানবণ্টন (বিশেষ বিধান) বিধিমালা, ২০২৬’-এ ১১ থেকে ২০ গ্রেডের পদগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব করা হয়েছে।

১১ ও ১২ গ্রেডের পদে বর্তমানে লিখিত পরীক্ষায় ৯০ এবং ভাইভায় ১০ নম্বর রয়েছে। নতুন প্রস্তাবে লিখিত পরীক্ষার নম্বর ১০০ এবং ভাইভার নম্বর ৫০ করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ ভাইভার নম্বর ১০ থেকে ৫০ হওয়ায় বৃদ্ধি হচ্ছে ৪০০ শতাংশ। একই সঙ্গে লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বর ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

১৩ থেকে ১৬ গ্রেডের পদে বর্তমানে লিখিত পরীক্ষা ৯০ এবং ভাইভা ১০ নম্বরে হয়। প্রস্তাবিত পদ্ধতিতে লিখিত পরীক্ষা হবে ৬০ নম্বরের এবং ভাইভা ৪০ নম্বরের। এ ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষায় পাসের সীমা ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪০ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে।

অন্যদিকে ১৭ থেকে ২০ গ্রেডের পদে বর্তমানে লিখিত পরীক্ষায় ৪০ এবং ভাইভায় ১০ নম্বর থাকে। নতুন প্রস্তাবে লিখিত ও মৌখিক-দুই পরীক্ষায় ২৫ নম্বর করে রাখার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ এই গ্রেডগুলোতেও লিখিত পরীক্ষার তুলনায় ভাইভার গুরুত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সচিব কমিটির কাছে দেওয়া যুক্তিতে বলেছে, ১১ থেকে ২০ গ্রেডের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি পরীক্ষার্থী, এআই এবং বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে পরীক্ষায় অনিয়মের চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে প্রকৃত যোগ্য প্রার্থীর পরিবর্তে অযোগ্য প্রার্থী চাকরি পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে পরীক্ষার মানবণ্টন পুনর্বিন্যাস করে প্রকৃত যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করছে মন্ত্রণালয়।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেছেন, সরকার মেরিটোক্রেসি বা মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করছে এবং এই উদ্যোগও তারই অংশ।

প্রস্তাবিত বিধিমালায় কারিগরি পদে লিখিত ও ব্যবহারিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর ভাইভায় অংশ নেওয়ার বিধানও রাখা হয়েছে। অর্থাৎ লিখিত ও ব্যবহারিক-দুই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই মৌখিক পরীক্ষার সুযোগ পাওয়া যাবে।

তবে প্রস্তাবিত বিধিমালা পুলিশ, বিজিবি, আনসার, কোস্ট গার্ড, র‌্যাবসহ বিভিন্ন বাহিনী এবং সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) আওতাভুক্ত পদে প্রযোজ্য হবে না।

প্রস্তাবিত পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় আপত্তি উঠছে ভাইভার নম্বর বাড়ানো নিয়ে। কারণ লিখিত পরীক্ষার উত্তরপত্র ও নম্বরের একটি দালিলিক রেকর্ড থাকে। বিপরীতে মৌখিক পরীক্ষায় পরীক্ষকের মূল্যায়নের ওপর নম্বর অনেকাংশে নির্ভর করে। ফলে ভাইভার ওজন যত বাড়বে, প্রার্থী বাছাইয়ে ব্যক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তের প্রভাব তত বাড়ার আশঙ্কা করছেন সমালোচকেরা।

সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসনবিষয়ক গবেষক আব্দুল আওয়াল মজুমদার মনে করেন, ভাইভার নম্বর বাড়ানো হলে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় জটিলতা আরও বাড়তে পারে। তাঁর মতে, ভাইভার জন্য ১০ নম্বরই যথেষ্ট, সর্বোচ্চ ২০ নম্বর পর্যন্ত রাখা যেতে পারে। তাঁর আশঙ্কা, এ ধরনের পরিবর্তন সুশাসনের জন্য ইতিবাচক হবে না।

সরকারের এ উদ্যোগ নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধিতাও তৈরি হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, সরকারের পছন্দের প্রার্থীদের সুবিধা দিতে ভাইভার নম্বর বাড়ানো হচ্ছে। লিখিত পরীক্ষায় তুলনামূলক কম নম্বর পেলেও মৌখিক পরীক্ষায় বেশি নম্বর দিয়ে কোনো প্রার্থীকে এগিয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে তারা মনে করছেন।

এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামও প্রস্তাবটি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। তিনি ভাইভার নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাব প্রত্যাহার এবং লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বর কমানোর সিদ্ধান্ত বাতিলসহ ছয় দফা দাবি জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গেজেট প্রকাশের আগেই সরকার চাইলে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে পারে।

প্রস্তাবিত মানবণ্টনের খবর প্রকাশের পর মঙ্গলবার রাত থেকেই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদ শুরু হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) বিক্ষোভ মিছিল করে। রাতের এ কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীরা ভাইভার নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাবকে ‘নব্য কোটা’ আখ্যা দিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করেন। সন্ধ্যা ৭টার দিকে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে থেকে মিছিলটি শুরু হয়ে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ভাইভার নম্বর বাড়ালে তদবির ও রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে নিয়োগের সুযোগ বাড়তে পারে।

এ ছাড়া জাহাঙ্গীরনগর, জগন্নাথ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও বিক্ষোভ ও সমাবেশ হয়েছে। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বুধবারও কর্মসূচি দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

সরকারি চাকরির নিয়োগ বিধিমালায় এ পরিবর্তনের বিষয়টি মঙ্গলবার সংসদেও আলোচনায় আসে। বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন নোটিশ দিয়েছেন। তবে তাঁর পয়েন্ট অব অর্ডার গ্রহণ করেননি স্পিকার।