প্রকাশিত : ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:৩৬ (শুক্রবার)
সনাতন পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলনের অনুমতি মিললেও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে!

ছবি: সংগৃহীত

সিলেটের পাথর কোয়ারিগুলোতে চলতি মৌসুমেই পাথর উত্তোলন শুরু হতে পারে; এমন আশার কথা জানিয়েছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী এবং সিলেট-৪ আসনের সংসদ সদস্য আরিফুল হক চৌধুরী। সংরক্ষিত জাফলং এলাকা অক্ষত রেখে অন্যান্য এলাকায় সনাতন বা হস্তচালিত পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলনের বিষয়ে সরকার নীতিগতভাবে এগোচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

তবে পাথর উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হলে বাস্তবে তা কতটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে; এ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন পরিবেশবিদ ও সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে সনাতন পদ্ধতিতে অনুমোদনের আড়ালে যন্ত্রনির্ভর উত্তোলন, বোমা মেশিনের ব্যবহার এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য ঠেকানো যাবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ফেসবুকভিত্তিক একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘এই মৌসুমেই সিলেটের পাথর কোয়ারিগুলো চালু হবে বলে আমার আশা।’

মন্ত্রী বলেন, পর্যটন ও পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা জাফলংকে সংরক্ষিত রেখে বাকি এলাকাগুলোতে পাথর উত্তোলনের অনুমতি দেওয়ার বিষয়ে সরকার নীতিগতভাবে এগোচ্ছে। চলতি মৌসুমেই এ বিষয়ে সুখবর আসতে পারে।

তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনায় পাথর উত্তোলন নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে ছয়জন মন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট সচিবদের নিয়ে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটিও গঠন করা হয়েছিল।

আরিফুল হক চৌধুরীর ভাষ্য, আদালতের আদেশে সংরক্ষিত জাফলং এলাকা অক্ষত রেখে অন্যান্য এলাকায় হস্তচালিত পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলনের বিষয়ে ওই কমিটি নীতিগত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে।

তবে একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, পাথর উত্তোলন নিয়ে একটি মামলা বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন। এ কারণে সরকার আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে। আদালত যে সিদ্ধান্ত দেবেন, তার পরদিন থেকেই সরকার সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নেবে বলে জানান তিনি।

চলতি মৌসুমেই উত্তোলন শুরু হবে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, মামলার বাদীপক্ষ আদালতে তাদের বক্তব্য যথাযথভাবে উপস্থাপন করেছে। সরকারপক্ষও নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে।

‘আমরা বিশ্বাস করি, এই মৌসুমেই পাথর উত্তোলন শুরু হবে’-বলেন তিনি।

অনুমতি মিললে নিয়ন্ত্রণ করবে কে?

মন্ত্রীর এমন বক্তব্যে পাথর উত্তোলন নিয়ে নতুন করে আশার সঞ্চার হলেও পরিবেশ ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।

সিলেট-৪ আসনের কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর উপজেলায় রয়েছে জেলার গুরুত্বপূর্ণ পাথর কোয়ারিগুলো। দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশগত ক্ষতির কারণে এসব এলাকায় পাথর ও বালু উত্তোলন বন্ধ রয়েছে। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে অনেক এলাকায় উত্তোলনের সুযোগও নেই।

এ অবস্থায় সনাতন পদ্ধতিতে সীমিত পরিসরে পাথর উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হলেও সেটি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব হবে; তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

কারণ, যেসব এলাকায় বর্তমানে পাথর উত্তোলন নিষিদ্ধ, সেখানেও অবৈধভাবে যন্ত্র ব্যবহার করে পাথর ও বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে বারকি নৌকা, বোমা মেশিনসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ধ্বংস ও জব্দ করা হলেও অবৈধ উত্তোলন পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।

ফলে প্রশ্ন উঠছে-যেখানে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও অবৈধ উত্তোলন বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে, সেখানে বৈধভাবে সনাতন পদ্ধতিতে উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হলে তার আড়ালে যন্ত্রনির্ভর উত্তোলন ঠেকানো যাবে কীভাবে?

সনাতন পদ্ধতির আড়ালে ‘বোমা মেশিন’?

স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরেই পাথর ও বালু উত্তোলনের সঙ্গে যুক্ত একটি শক্তিশালী ব্যবসায়ী চক্রের বিরুদ্ধে পরিবেশবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অনুমোদিত বা সীমিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে অনেক সময় ড্রেজার, বোমা মেশিনসহ বিভিন্ন যন্ত্র ব্যবহার করে উত্তোলন করা হয়।

এমন পরিস্থিতিতে সনাতন পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হলে অনুমোদনের সীমারেখা ঠিক কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, কোন এলাকায় কতটুকু উত্তোলন করা যাবে এবং কে তা তদারক করবে-এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনও সামনে আসেনি।

বিশেষ করে সনাতন পদ্ধতির অনুমতি নিয়ে কেউ যদি রাতের আঁধারে বোমা মেশিন বা অন্য যন্ত্র বসিয়ে পাথর উত্তোলন করে, তখন প্রশাসন কীভাবে তা শনাক্ত ও বন্ধ করবে-এ প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বালু উত্তোলনেও একই চিত্রের অভিযোগ

সিলেট-৪ আসনের বিভিন্ন এলাকায় বালু উত্তোলন নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। সনাতন পদ্ধতিতে বালু উত্তোলনের অনুমোদনের সুযোগ নিয়ে কোথাও কোথাও ড্রেজার ব্যবহার করে প্রকাশ্যে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে।

এতে সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, একটি এলাকায় অনুমোদিত পদ্ধতি ও বাস্তব উত্তোলন পদ্ধতির মধ্যে যদি এমন ব্যবধান তৈরি হয়, তাহলে পাথর উত্তোলনের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটবে না-এর নিশ্চয়তা কী?

পরিবেশ সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, কার্যকর নজরদারি, নির্দিষ্ট সীমা, ডিজিটাল মনিটরিং ও কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে ‘সনাতন পদ্ধতি’ শেষ পর্যন্ত যান্ত্রিক ও নির্বিচার পাথর উত্তোলনের বৈধতার ঢাল হয়ে উঠতে পারে।

পাথর উত্তোলন বন্ধ থাকা অবস্থায়ও প্রশাসনকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হচ্ছে। এসব অভিযানে বোমা মেশিন, বারকি নৌকা ও অন্যান্য সরঞ্জাম ধ্বংস বা জব্দ করা হলেও অবৈধ উত্তোলনের অভিযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

তাই অনুমতি দেওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ। বিশেষ করে কোয়ারিগুলোতে স্থানীয় শ্রমিকদের পাশাপাশি বড় ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী মহলের সম্পৃক্ততা থাকলে অনুমোদিত সীমার বাইরে উত্তোলন ঠেকাতে প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের সক্ষমতা কতটা কার্যকর হবে, সেটিও এখন বড় প্রশ্ন।

পরিবেশ রক্ষার শর্ত কতটা কঠোর হবে?

সিলেটের জাফলং, সাদাপাথর, বিছনাকান্দি, উৎমাছড়া, শাহ আরেফিন টিলা, রতনপুরসহ বিভিন্ন পর্যটন ও পরিবেশগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পাথর ও বালু উত্তোলনের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই পরিবেশগত ক্ষতির অভিযোগ রয়েছে।

এমন প্রেক্ষাপটে সনাতন পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হলে পরিবেশের ক্ষতি যাতে আর না বাড়ে, সে জন্য সুনির্দিষ্ট শর্ত, উত্তোলন এলাকার সীমা, গভীরতা, সময়সীমা এবং নজরদারির ব্যবস্থা কী থাকবে-তা স্পষ্ট করা জরুরি বলে মনে করছেন পরিবেশসংশ্লিষ্টরা।

বিশেষ করে জাফলংকে সংরক্ষিত রেখে অন্যান্য এলাকায় উত্তোলনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হলেও সংরক্ষিত এলাকার সীমারেখা অতিক্রম করে অবৈধ উত্তোলন ঠেকানো সম্ভব হবে কি না, সেটিও বড় চ্যালেঞ্জ।

ফলে মন্ত্রীর ঘোষণায় পাথর ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের মধ্যে আশার সৃষ্টি হলেও পরিবেশ রক্ষা এবং অবৈধ যান্ত্রিক উত্তোলন ঠেকাতে ‘অনুমতি’ দেওয়ার চেয়ে ‘নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা’ কতটা কার্যকর হবে-সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

সরকার আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে। আদালতের সিদ্ধান্তের পর পাথর উত্তোলন নিয়ে সরকারের পদক্ষেপ স্পষ্ট হবে। তবে তার আগেই সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা; পাথর উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হলে যেন তা পরিবেশ রক্ষার শর্ত, স্বচ্ছতা ও কঠোর নজরদারির আওতায় থাকে; কোনোভাবেই যেন সনাতন পদ্ধতির নাম ব্যবহার করে আবারও নির্বিচার যন্ত্রনির্ভর পাথর উত্তোলনের সুযোগ তৈরি না হয়।