প্রকাশিত : ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৩:৫২ (শুক্রবার)
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশিদের সাড়ে ৪০০ অভিযোগ, সমাধান ৩৩০

ছবি: সংগৃহীত

পরিবারে স্বচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে প্রতিবছর লাখ লাখ বাংলাদেশি বিদেশে পাড়ি জমালেও সবার ভাগ্য বদলায় না। মালয়েশিয়ায় বৈধভাবে কলিং ভিসায় গিয়ে অনেক বাংলাদেশি শ্রমিককে মোকাবিলা করতে হচ্ছে নিয়োগ-সংক্রান্ত ঋণের বোঝা, বকেয়া বেতন, ভিসা ও অভিবাসন জটিলতা এবং দেশে ফেরার প্রক্রিয়ায় নানা সমস্যার। এসব সংকটের প্রতিকার চেয়ে ২০২২ সালে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরুর পর থেকে বাংলাদেশ হাইকমিশনে জমা পড়েছে প্রায় ৪৫০টি অভিযোগ।

এর মধ্যে ৩৩০টির বেশি অভিযোগ নিয়োগকর্তা ও কর্মীদের মধ্যে মধ্যস্থতা এবং মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও অন্যান্য অংশীজনের সহযোগিতায় সমাধান করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছে হাইকমিশন।

অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে বেতন পরিশোধে বিলম্ব বা বকেয়া, ভিসা নবায়ন, নিয়োগসংক্রান্ত জটিলতা এবং কর্মসংস্থান নিয়ে বিরোধ। শ্রমিকদের একটি অংশ মালয়েশিয়ায় আসার আগে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে ঋণগ্রস্ত হন। পরে প্রতিশ্রুত চাকরি বা বেতন না পেলে সেই ঋণের চাপ আরও বাড়তে থাকে।

মালয়েশিয়ায় কর্মরত একাধিক বাংলাদেশি শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদেশে আসার আগে চাকরি, বেতন ও কর্মপরিবেশ সম্পর্কে যে তথ্য দেওয়া হয়, বাস্তবে অনেক সময় তার সঙ্গে মিল পাওয়া যায় না। এতে নতুন কর্মীরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন।

একজন শ্রমিকের ভাষ্য, মালয়েশিয়ায় আসার পর বেতন ও চাকরির শর্ত নিয়ে সমস্যা হলে অনেক শ্রমিক শুরুতে বুঝতেই পারেন না কোথায় গেলে দ্রুত প্রতিকার পাওয়া যাবে। বিশেষ করে ঋণের কিস্তি, পরিবারের খরচ এবং বৈধ কাগজপত্র ঠিক রাখার চাপ একসঙ্গে থাকায় তারা অনেক সময় সমস্যার মধ্যেই কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য হন।

আরেক শ্রমিক জানান, নিয়োগের সময় সব শর্ত পরিষ্কারভাবে লিখিত ও যাচাইযোগ্য থাকলে মালয়েশিয়ায় এসে অনেক বিরোধ এড়ানো সম্ভব। নিয়োগকর্তা পরিবর্তন, বেতন বকেয়া কিংবা ভিসা জটিলতার ক্ষেত্রে দ্রুত অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা থাকাও জরুরি।

কমিউনিটি নেতারাও বলছেন, শ্রমিকের সমস্যা দেখা দেওয়ার পর সমাধানের চেয়ে নিয়োগের শুরুতেই অনিয়ম বন্ধ করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মতে, বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানোর আগে চাকরির ধরন, বেতন, কর্মস্থল, আবাসন, নিয়োগকর্তা এবং অন্যান্য শর্ত যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

একজন কমিউনিটি নেতার মতে, শ্রমিকদের সুরক্ষায় বাংলাদেশি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তা, সরকারি সংস্থা ও হাইকমিশনের মধ্যে আরও শক্তিশালী সমন্বয় প্রয়োজন। অভিযোগ নিষ্পত্তির পাশাপাশি একই ধরনের অভিযোগ যাতে বারবার না আসে, সেদিকেও নজর দিতে হবে।

আরেক কমিউনিটি প্রতিনিধি বলেন, শ্রমিকের কাছ থেকে অতিরিক্ত নিয়োগ ব্যয় আদায়, প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তব চাকরির অমিল এবং বেতনসংক্রান্ত বিরোধ—এসব বিষয়ে শুরুতেই কঠোর নজরদারি থাকলে পরবর্তী সংকট অনেকটাই কমে আসবে।

এদিকে গত ৮ সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়ার পেনাংয়ে রেসপনসিবল বিজনেস অ্যালায়েন্স (আরবিএ) আয়োজিত ‘কমিটমেন্ট থেকে অ্যাকশন: সরবরাহ শৃঙ্খলে মানবাধিকার যথাযথ পর্যালোচনার সর্বোত্তম চর্চা’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় মালয়েশিয়ায় অভিবাসী কর্মীদের সুরক্ষায় বাংলাদেশের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ ও সর্বোত্তম চর্চা তুলে ধরে বাংলাদেশ হাইকমিশন।

আলোচনায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের ডেপুটি হাইকমিশনার শাহানারা মনিকা অভিবাসী কর্মীদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং তাদের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, কর্মী, নিয়োগকর্তা, মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং অন্যান্য অংশীজনের মধ্যে সমন্বয় করে অভিযোগের সমাধান, ক্ষতিপূরণ ও প্রতিকার নিশ্চিতকরণ, কল্যাণমূলক সহায়তা এবং মর্যাদাপূর্ণভাবে দেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে হাইকমিশন কাজ করছে।

হাইকমিশনের হিসাবে, প্রায় ৪৫০টি অভিযোগের মধ্যে ৩৩০টির বেশি সমাধান হওয়া শ্রমিকদের জন্য ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে এখনও যেসব অভিযোগ নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে, সেগুলোর দ্রুত সমাধানের পাশাপাশি ভবিষ্যতে একই ধরনের অভিযোগের পুনরাবৃত্তি ঠেকানোও জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কমিউনিটি নেতাদের মতে, শুধু অভিযোগ পাওয়ার পর প্রতিকার নয়, নিয়োগের প্রথম ধাপ থেকেই শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এতে একদিকে শ্রমিকের আর্থিক ক্ষতি কমবে, অন্যদিকে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের সুনাম ও আস্থাও বাড়বে।

শ্রমিকদের প্রত্যাশা, বিদেশে যাওয়ার আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ও মালয়েশিয়ায় পাওয়া বাস্তব সুযোগের মধ্যে যেন কোনো ফারাক না থাকে। আর সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত, স্বচ্ছ ও কার্যকর প্রতিকারই হতে পারে তাদের সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।