ছবি: সংগৃহীত
ইরান যুদ্ধকে ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ইয়েমেন ও আশপাশের অঞ্চলে সামরিক প্রভাব বাড়াতে শুরু করেছে ইরানপন্থী হুতি গোষ্ঠী। সম্প্রতি সৌদি আরবে একযোগে ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পাশাপাশি ইয়েমেনের কৌশলগত লোহিত সাগর উপকূলে অভিযান জোরদার করেছে তারা। তীব্র লড়াইয়ের পর সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীকে হটিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোখা বন্দর দখল করেছে হুতিরা। এর পরদিন বাব আল-মানদেব প্রণালির মুখে অবস্থিত পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণও নেয় তারা।
মোখা বন্দর বাব আল-মানদেব প্রণালি থেকে ৫০ মাইলেরও কম দূরে। ফলে বন্দর ও পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ হুতিদের এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে প্রভাব বিস্তারের বড় সুযোগ করে দিয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সৌদি আরবের তেল পরিবহনও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। জুলাইয়ে হুতিদের নতুন করে হামলা শুরুর পর বাব আল-মানদেব দিয়ে সৌদি তেল রপ্তানি প্রায় ৯৫ শতাংশ কমে গেছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রাকে সৌদি আরবের জন্য বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে ইরান হরমুজ প্রণালিকে প্রায় অবরুদ্ধ করে রাখার পরিস্থিতিতে সৌদি তেল রপ্তানির বিকল্প পথ হিসেবে লোহিত সাগর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। এখন সেই পথেও হুতিদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা রিয়াদের ওপর দ্বিমুখী চাপ তৈরি করেছে।
হুতিদের এই আগ্রাসন একই সঙ্গে সৌদি আরবের নতুন প্রতিরক্ষা জোটের কার্যকারিতারও পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ৩০ জুলাই সৌদি আরব তুরস্ক, পাকিস্তান, মিসর, সুদান, জিবুতিসহ ১৪টি দেশকে নিয়ে লোহিত সাগরে যৌথ নৌ জোট গঠনের ঘোষণা দেয়। এর এক সপ্তাহ পর মক্কায় পাকিস্তান ও তুরস্কের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেন সৌদি ক্রাউন প্রিন্স। কিন্তু হুতিদের সাম্প্রতিক হামলার পরও তুরস্ক বা পাকিস্তান ইয়েমেন যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেয়নি। ইসলামাবাদও জানিয়েছে, মক্কা চুক্তিটি ইয়েমেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ফলে চুক্তিটির বাস্তব কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অন্যদিকে, হুতিদের সঙ্গে ইরানের সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। হুতিরা নিজেদের অভিযানকে স্থানীয় লড়াই হিসেবে তুলে ধরলেও সৌদি আরব ও দেশটির তেলবাহী জাহাজে হামলার মধ্য দিয়ে সংঘাতটি ইরান যুদ্ধের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট বিস্তৃত হওয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি ও আর্থিক বাজারে অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
হুতিদের সামরিক সাফল্যের ফলে রাজনৈতিক সমাধানের পথও কঠিন হয়ে পড়েছে। সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে গোষ্ঠীটিকে পুরোপুরি দমন করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। শুধু বিমান হামলার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে বলেও বিশ্লেষণে সতর্ক করা হয়েছে।
তবে সংঘাতের মধ্যেও রাজনৈতিক সমঝোতার একটি ক্ষীণ সুযোগ রয়েছে। সৌদি আরব ও ইয়েমেন সরকারকে আন্তর্জাতিক সহযোগীদের নিয়ে বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। কারণ অনিয়ন্ত্রিত ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ শুধু ইয়েমেন বা সৌদি আরবকেই নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্য এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকেও বড় সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে।