চারপাশে দিগন্তজোড়া হাওরের বিস্তার, পাহাড়ঘেরা সবুজ চা-বাগান আর মাটির গভীরে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার মূল উৎস প্রাকৃতিক গ্যাসের অবারিত ভাণ্ডার। বাইরে থেকে দেখলে সিলেটের চিত্রটি চোখ ধাঁধানো- গ্রামের পর গ্রাম মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা ইউরোপীয় ধাঁচের রাজকীয় ডুপ্লেক্স বাড়ি, ব্যাংকে হাজার হাজার কোটি টাকার অলস আমানত আর উপচে পড়া প্রবাসী আয়। কিন্তু এই চাকচিক্যময় আবরণের নিচেই লুকিয়ে রয়েছে এক গভীর ও বিপজ্জনক অর্থনৈতিক স্থবিরতা। যে উর্বর মাটি একসময় খাদ্য জোগাত, সেই মাটি এখন খাঁ খাঁ করছে অবহেলায়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়া বিদেশযাত্রার তীব্র মোহ এই অঞ্চলের মানুষকে করে তুলেছে কায়িক শ্রম ও কৃষিবহির্ভূত। আর প্রবাসীদের রক্ত পানি করা কষ্টার্জিত রেমিট্যান্স উৎপাদনশীল শিল্পে রূপ না নিয়ে বন্দি হয়ে পড়ছে নির্জন ‘লন্ডনী বাড়ি’র চার দেয়ালে।
অনাবাদি জমির রাজত্ব
দেশে যখন প্রতি ইঞ্চি আবাদি জমি ব্যবহারের জাতীয় তাগিদ চলছে, তখন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। দেশের সবচেয়ে বেশি অনাবাদি বা পতিত কৃষিজমি এখন সিলেট বিভাগে। চার জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় মোট আবাদযোগ্য জমির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বছরের পর বছর কোনো ধরনের চাষাবাদ ছাড়াই ফেলে রাখা হচ্ছে। বিশেষ করে আমন ও আউশ মৌসুমে মাঠের পর মাঠ কেবল আগাছায় ভরে থাকে।
জমির মালিকদের সিংহভাগই যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। দেশে তাদের জমিগুলো দেখাশোনার দায়িত্বে থাকেন বয়োবৃদ্ধ কোনো স্বজন অথবা কেয়ারটেকার, যাদের কৃষিকাজে কোনো আগ্রহ নেই। এমনকি জমি বেদখল হয়ে যাওয়ার ভয়ে অনেকে স্থানীয় কৃষকদের কাছে বর্গা দিতেও রাজি হন না। ফলে যে পলিমাটিতে সোনা ফলানো সম্ভব ছিল, সেই মাটি এখন অলস পড়ে থেকে রূপ নিয়েছে দেশের অন্যতম বড় পতিত ভূমির রাজধানীতে।
হাওরের দেশেও মাছে সর্বনিম্ন আয়
সিলেটের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য যেখানে আশীর্বাদ হওয়ার কথা ছিল, সেখানে ব্যবস্থাপনা ও আধুনিকায়নের অভাবে কৃষকের আয় নেমে এসেছে তলানিতে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ক্ষুদ্র খাদ্য উৎপাদনকারীদের আয় ও উৎপাদনশীলতা সংক্রান্ত সাম্প্রতিক এক জরিপ পর্যালোচনায় দেখা যায়, সিলেট বিভাগে শস্য উৎপাদন থেকে কৃষকের বার্ষিক নিট আয় মাত্র ৯ হাজার ৪৫৩ টাকা। অথচ একই সময়ে খুলনা বিভাগের একজন কৃষক শস্য থেকে গড়ে আয় করছেন ১৫ হাজার ৫৬৭ টাকা এবং রাজশাহীতে এই আয় প্রায় ১২ হাজার টাকা।
সবচেয়ে বড় দুরবস্থা তৈরি হয়েছে মৎস্য খাতে। টাঙ্গুয়া, হাকালুকিসহ শত শত ছোট-বড় হাওর ও নদ-নদীবেষ্টিত সিলেট বিভাগ জলজ সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও পরিসংখ্যানে তার কোনো প্রতিফলন নেই। বিবিএসের তথ্যমতে, মৎস্য খাত থেকে সিলেটে একজন চাষির বার্ষিক নিট আয় মাত্র ২৪ হাজার ৩৯৩ টাকা, যা দেশের আটটি বিভাগের মধ্যে সর্বনিম্ন। অথচ এই একই খাতে নদী ও উপকূলীয় খুলনা বিভাগের চাষিদের গড় আয় ৮২ হাজার টাকার বেশি এবং ঢাকা ও রাজশাহীর চাষিরাও বছরে গড়ে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা আয় করছেন। স্থানীয়ভাবে বাণিজ্যিক মাছ চাষের আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ না করা এবং হাওরের জলমহালগুলো প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের দখলে থাকায় প্রকৃত মৎস্যজীবীরা নামমাত্র মজুরিতে কাজ করছেন, যার ফলে সামগ্রিক মৎস্য আয়ে সিলেট দেশজুড়ে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। প্রাণিসম্পদ খাতেও সিলেটের কৃষকদের বার্ষিক গড় আয় ৬৮ হাজার টাকার ঘরে, যা চট্টগ্রাম কিংবা ঢাকার চেয়ে অনেকটাই পিছিয়ে। আর এসবের সামগ্রিক প্রভাবে বিভাগে দারিদ্র্যের হার দাঁড়িয়েছে ১৮ দশমিক ৫ শতাংশে।
ইটের পাহাড়ে অলস পুঁজি
সিলেটের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের ভূমিকা অবিসংবাদিত হলেও এর ব্যবহার নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করছেন অর্থনীতিবিদরা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে রেমিট্যান্স আহরণে শীর্ষ তিন অঞ্চলের একটি সিলেট। কিন্তু এই বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার প্রায় পুরোটাই ব্যয় হচ্ছে অনুৎপাদনশীল খাতে।
গোলাপগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, বিশ্বনাথ বা জগন্নাথপুরের মতো প্রবাসী অধ্যুষিত উপজেলাগুলোতে গেলে চোখে পড়ে সারি সারি প্রাসাদোপম বাড়ি। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এসব বাড়িতে থাকে সুইমিং পুল, সুদৃশ্য বাগান আর আধুনিক স্থাপত্যের ছোঁয়া। তবে বাস্তবতা হলো, এসব বাড়ির বেশিরভাগেই সারা বছর কোনো মানুষ থাকে না। কোনো কোনোটিতে হয়তো একজন দারোয়ান বা বয়োবৃদ্ধ কেয়ারটেকার থাকেন। প্রবাসীরা হয়তো বছরে বা দুই বছরে একবার কয়েক সপ্তাহের জন্য আসেন, বাকি সময় বাড়িগুলো থাকে নিথর ও প্রাণহীন। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ধরনের বিনিয়োগ হলো অর্থনীতির ‘ডেড ক্যাপিটাল’ বা অলস পুঁজি। এই টাকা দিয়ে কোনো কলকারখানা তৈরি হয় না, স্থানীয় বেকারদের জন্য কোনো কর্মসংস্থান তৈরি হয় না, কিংবা তা কোনো পণ্যও উৎপাদন করে না। উল্টো বিলাসবহুল জীবনযাপন ও কৃত্রিমভাবে জমির দাম বাড়িয়ে দিয়ে তা স্থানীয় বাজারে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে তুলছে।
গ্যাসের ভাণ্ডারে শিল্পের খরা
হরিপুর, কৈলাশটিলা কিংবা বিবিয়ানা- সিলেটের ভূগর্ভস্থ গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়ে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ বা চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চল সচল রাখছে। অথচ যে মাটি থেকে এই অমূল্য জ্বালানি উঠছে, সেই সিলেটেই নেই কোনো ভারী শিল্পায়ন। চা প্রক্রিয়াকরণ এবং সীমিত কিছু সিমেন্ট কারখানা ছাড়া পুরো বিভাগে কর্মসংস্থান তৈরির মতো বড় কোনো উৎপাদনশীল খাত গড়ে ওঠেনি।
বাণিজ্যিক এই স্থবিরতার পেছনে স্থানীয় উদ্যোক্তার অভাব এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার বৈষম্যকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। সিলেটের ব্যাংকগুলোতে প্রবাসীদের পাঠানো হাজার হাজার কোটি টাকার আমানত জমা রয়েছে। কিন্তু সেই টাকা সিলেটে বিনিয়োগ হয় না। ঋণ-আমানত অনুপাত বা সিডিআরের দিক থেকে সিলেট দেশের সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে।
বিদেশযাত্রার মোহ ও শ্রমবিমুখতা
অর্থনৈতিক এই অচলাবস্থার পেছনে সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা। সিলেটের তরুণ সমাজের একটি বড় অংশের ধ্যানজ্ঞান কেবল একটাই- যেভাবেই হোক বিদেশে পাড়ি জমানো। এই মানসিকতা স্থানীয় যুবসমাজকে উৎপাদনশীল কাজ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
ফলে সমাজে এক ধরনের কৃত্রিম শ্রম সংকট তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের মাঝে শারীরিক শ্রম দিয়ে কৃষিকাজ করা কিংবা স্থানীয় প্রতিষ্ঠানে স্বল্প বেতনে কাজ করাকে সামাজিকভাবে হেয় চোখে দেখা হয়। চাষাবাদের জন্য পুরো সিলেটকে এখন নির্ভর করতে হয় দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে আসা মৌসুমি দিনমজুরদের ওপর। রোপণ ও কাটার মৌসুমে বাইরে থেকে আসা এই শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি এক হাজার টাকায় গিয়ে ঠেকে। উচ্চ উৎপাদন খরচ ও চড়া মজুরির কারণে সাধারণ কৃষকের পক্ষে ধান চাষ করে লাভ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে, যা মানুষকে বাধ্য করছে উর্বর জমি ফেলে রাখতে। অন্যদিকে যারা বিদেশে যেতে পারছেন না, তারা বছরের পর বছর কোনো কাজ না করে পরিবারের পাঠানো টাকায় অলস সময় কাটাচ্ছেন, যা সমাজে তৈরি করছে ছদ্মবেকারত্ব।
পরনির্ভরশীলতার ঝুঁকি ও উত্তরণের পথ
বাইরে থেকে দেখলে সিলেটে আপাত কোনো খাদ্যসংকট বা দারিদ্র্যের হাহাকার চোখে পড়ে না, কারণ প্রবাস থেকে প্রতি মাসেই টাকা আসছে। কিন্তু বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, এই আপাত সচ্ছলতা অত্যন্ত বিপজ্জনক ও ভঙ্গুর। বড় আকারের যুদ্ধ, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা বা অভিবাসন নীতিতে কোনো বড় ধাক্কা এলে এই ভঙ্গুর অর্থনীতি মুহূর্তের মধ্যে মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। সাম্প্রতিক চলমান আঞ্চলিক যুদ্ধগুলো তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। অথচ চাল, ডাল, মাছ, শাকসবজি- প্রতিটি নিত্যপণ্যের জন্য সিলেটকে এখন দেশের অন্য অঞ্চল কিংবা আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
এই অচলাবস্থা ভাঙতে হলে নীতি পর্যায়ে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, সিলেটের হাজার হাজার হেক্টর অনাবাদি জমিকে ফেলে রাখার সংস্কৃতি বন্ধ করতে চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদ বা সরকারি সহায়তায় আধুনিক কৃষিযন্ত্রের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে শ্রমিকের সংকটে ফসল নষ্ট না হয়। এছাড়া প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থ কেবল বাড়ি তৈরিতে অপচয় না করে তাদের জন্য বিশেষ শিল্প পার্ক বা কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ হাবে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করতে হবে।