প্রকাশিত : ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২০:৩৪ (বুধবার)
এল নিনো: দাবদাহ-খরা-দাবানলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে দরিদ্র দেশগুলো

ছবি: সংগৃহীত

চলতি বছরের শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে রেকর্ড দাবদাহ, তীব্র খরা, দাবানল ও পানির সংকট দেখা দিয়েছে। এর প্রভাবে আগামী কয়েক মাসে বিশ্বজুড়ে অতিরিক্ত প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষের তাপমাত্রাজনিত মৃত্যু হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাব।

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বাভাবিক বছরের তুলনায় চলতি বছরের জুন থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ পর্যন্ত এল নিনোর প্রভাবে অতিরিক্ত প্রায় ৪ লাখ ৫১ হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে।

গবেষকদের মতে, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলো। এসব দেশের অনেক অঞ্চল এরই মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, খাদ্যসংকট ও উচ্চ জ্বালানি মূল্যের মতো নানা সংকট মোকাবিলা করছে।

গবেষণার সহলেখক ও ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের সহপ্রতিষ্ঠাতা মাইকেল গ্রিনস্টোন বলেন, ফেব্রুয়ারি নাগাদ এল নিনোর প্রভাব শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তাপমাত্রাজনিত ঝুঁকি এরপরও অব্যাহত থাকতে পারে। চরম আবহাওয়ার প্রভাব আগামী বছরের গ্রীষ্মকাল পর্যন্ত অনুভূত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

তিনি বলেন, অতিরিক্ত তাপমাত্রা বিশেষ করে আগে থেকেই উষ্ণ ও দরিদ্র অঞ্চলের মানুষের জন্য বেশি প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। ধনী দেশগুলোতে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, নির্ভরযোগ্য পানি সরবরাহ ও উন্নত স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ তুলনামূলক বেশি থাকায় তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় সক্ষমতাও বেশি।

গবেষণায় বিশ্বের ২৪ হাজারের বেশি অঞ্চলের স্থানীয় তাপমাত্রার প্রাক্কলন এবং তাপমাত্রার সঙ্গে মৃত্যুহারের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গত তিন দশকের গড় তাপমাত্রাজনিত মৃত্যুহারের সঙ্গে ২০২৬ সালের জুন থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সম্ভাব্য মৃত্যুহার তুলনা করে অতিরিক্ত প্রাণহানির হিসাব করা হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে উন্নয়নশীল অঞ্চল

গবেষকদের সতর্কতা অনুযায়ী, এল নিনোর কারণে সৃষ্ট অতিরিক্ত গরমের সবচেয়ে বড় ধকল পড়তে পারে গ্লোবাল সাউথের উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর।

আফ্রিকার সাহারা মরুভূমির দক্ষিণ প্রান্তের শুষ্ক সাহেল অঞ্চলকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে এল নিনোর প্রভাবে অতিরিক্ত প্রায় ৬৬ হাজার ৮০০ মানুষের মৃত্যু হতে পারে।

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলও উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। গবেষণা অনুযায়ী, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ায় মিলিয়ে প্রায় ১৯ হাজার ৪০০ জন, ইন্দোনেশিয়ায় ১৯ হাজার ৩০০, ভারতে ১৫ হাজার ৮০০ এবং ব্রাজিলে ১৩ হাজার ৩০০ জন অতিরিক্ত মৃত্যুর ঝুঁকিতে থাকতে পারেন।

আগাম প্রস্তুতিতে বাঁচতে পারে প্রাণ

গবেষকরা বলছেন, সম্ভাব্য প্রাণহানি কমাতে সরকারগুলোকে আগাম প্রস্তুতি নিতে হবে। এর মধ্যে দাবদাহের আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা, শীতলীকরণ কেন্দ্র, বিনামূল্যে খাবার পানি সরবরাহ, খোলা জায়গায় কর্মরত শ্রমিকদের সুরক্ষা এবং হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ রয়েছে।

বয়স্ক ও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকা মানুষদের বিশেষ নজরদারির আওতায় আনার পাশাপাশি চরম তাপমাত্রা শুরু হওয়ার আগেই জরুরি অর্থ ও প্রয়োজনীয় সম্পদ প্রস্তুত রাখার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।

ভারতভিত্তিক জলবায়ু বিশেষজ্ঞ অভিযন্ত তিওয়ারি বলেন, গবেষণাটিকে আতঙ্ক তৈরির পূর্বাভাস হিসেবে না দেখে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা উচিত। তাঁর মতে, কোনো দেশের পরিকল্পনা থাকা এক বিষয়, আর মাঠপর্যায়ে তা কার্যকর করা ও প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ।

এল নিনোর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের যোগ

এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র। তবে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ইতোমধ্যে বেড়ে যাওয়ায় শক্তিশালী এল নিনো চরম তাপমাত্রার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের গবেষণা অনুযায়ী, এল নিনোর সময়ে বিশ্বের স্থলভাগের তাপমাত্রা স্বাভাবিক বছরের তুলনায় গড়ে প্রায় ১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হতে পারে। এর ফলে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় চরম তাপদাহের দিন প্রায় ৪৪ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে।

গবেষকদের মতে, চলতি বছরের তাপমাত্রার চিত্র ভবিষ্যতে আরও উষ্ণ পৃথিবীতে স্বাভাবিক আবহাওয়া কেমন হতে পারে, তার একটি ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাই কোথায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি রয়েছে এবং কোথায় দ্রুত পদক্ষেপ নিলে প্রাণহানি কমানো সম্ভব- তা এখনই চিহ্নিত করা জরুরি।