সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও শত শত প্রার্থী নিয়োগপত্র না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) বিভিন্ন জেলায় নিয়োগপত্র বিতরণ শুরু হলে বিষয়টি সামনে আসে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও তালিকায় নাম থাকলেও নিয়োগপত্র না পাওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা প্রকাশ করছেন অনেকেই।
প্রার্থীদের তথ্য ও অনলাইন জরিপ বিশ্লেষণে অন্তত ২৭ জেলায় ৭৭৮ জন নিয়োগপত্র পাননি বলে জানা গেছে। তবে সব জেলার তথ্য যাচাই না হওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।
জেলা ভিত্তিক হিসাবে সুনামগঞ্জে ১২০, ভোলায় ৮৪, খুলনায় ৫৯, জামালপুরে ৫২, বগুড়ায় ৪৮, পিরোজপুরে ৪৫, মাগুরায় ৩৩, বাগেরহাটে ২৯, রাজশাহীতে ২৮, নরসিংদীতে ২৭, চাঁদপুরে ২৭, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২৪, মানিকগঞ্জে ২২, মাদারীপুরে ২১, চুয়াডাঙ্গায় ২০, পটুয়াখালীতে ২০, কুষ্টিয়ায় ১৬, রাজবাড়ীতে ১৫, ঝালকাঠিতে ১২, ফরিদপুরে ১২, নড়াইলে ৯, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৭, শরীয়তপুরে ৬, মুন্সিগঞ্জে ৩, পাবনায় ৩৫, সাতক্ষীরায় ২ এবং লক্ষ্মীপুরে ২ জন নিয়োগপত্র না পাওয়ার দাবি করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকজন প্রার্থী দাবি করেন, নিরাপত্তা যাচাইয়ে নেতিবাচক প্রতিবেদন আসায় তাদের নিয়োগ আটকে থাকতে পারে। কেউ কেউ এনএসআই ও ডিএসবি ভেরিফিকেশনের কথাও উল্লেখ করেছেন। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তালিকা বা ব্যাখ্যা দেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
ভোলার এক প্রার্থী অভিযোগ করেন, চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হওয়ার পরও ভেরিফিকেশন প্রতিবেদনের কারণে তার নিয়োগ আটকে গেছে। বাদ দেওয়ার কারণ জানতে চেয়ে তিনি সংশ্লিষ্টদের কাছে ব্যাখ্যা চান।
আমজাদ হোসেন ফাহিম নামে এক প্রার্থী জানান, চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও ভেরিফিকেশনের নেতিবাচক প্রতিবেদনের কারণে তার নাম নিয়োগপত্রের তালিকায় রাখা হয়নি। নিজের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা তথ্যগত অসংগতি না থাকার দাবি করে তিনি বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।
আরেক প্রার্থী রইচ উদ্দিন বলেন, কোনো অপরাধে জড়িত না থেকেও তিনি বারবার চাকরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দীর্ঘ অপেক্ষার পরও সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও নিয়োগ না পাওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন তিনি।
একইভাবে বন্যা মল্লিক নামে একজন প্রার্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, মেধাক্রমে এগিয়ে থাকা এবং একাডেমিক কাগজপত্রে কোনো সমস্যা না থাকা সত্ত্বেও তিনি নিয়োগপত্র পাননি। বাদ দেওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে চান তিনি।
মো. সায়েক আহমেদ নামে আরেকজন দাবি করেন, জমিজমা সংক্রান্ত তথ্য ভেরিফিকেশনে উঠে আসায় একজন প্রার্থীর নিয়োগে জটিলতা তৈরি হয়েছে, যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
তবে নিয়োগপত্র না পাওয়া মানেই প্রার্থীরা চূড়ান্তভাবে বাদ পড়েছেন—এমনটি এখনই বলা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।
অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী বলেন, নির্বাচিত প্রার্থীদের নিয়োগপত্র ডাকযোগে পাঠানো হয়েছে এবং বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছাতে সময় লাগতে পারে। এ কারণে যোগদানের সময় ১ অক্টোবর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। কিছুদিন অপেক্ষা করলে অনেকেই নিয়োগপত্র পেয়ে যাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ভেরিফিকেশন সংক্রান্ত প্রশ্নে তিনি বলেন, নির্দিষ্টভাবে কোনো প্রার্থী বাদ পড়েছেন—এমন তথ্য এখনো তাদের কাছে নেই। সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব রাজীব কুমার সরকার বলেন, নিয়োগপত্র প্রদানের তালিকা অধিদপ্তরের কাছে রয়েছে। তবে নির্বাচিত সবাই নিয়োগপত্র পাবেন কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন।
অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পুলিশ ভেরিফিকেশনে নেতিবাচক প্রতিবেদন, কাগজপত্রে অসংগতি কিংবা সংশ্লিষ্ট উপজেলায় শূন্যপদের সীমাবদ্ধতার কারণে কিছু প্রার্থী নিয়োগপত্র নাও পেতে পারেন।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, নিয়োগের সব ধাপ সম্পন্ন করার পরও বহু প্রার্থীকে দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তায় রাখা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকলে তাদের নিয়োগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনার দাবি জানান তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ভিপি সাদিক কায়েমও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, স্পষ্ট কারণ ছাড়া প্রার্থীদের বাদ দেওয়া অন্যায্য। তিনি পুনর্বিবেচনা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
গত ৯ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ৬৯ হাজার ২৬৫ জন প্রার্থী। মৌখিকসহ সব ধাপ শেষে ৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত চূড়ান্ত ফলে ১৪ হাজার ৩৮৪ জনকে সহকারী শিক্ষক পদে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত করা হয়।
এরপর দীর্ঘ অপেক্ষার পর নিয়োগপত্র বিতরণ শুরু হলে অনেকের অপেক্ষার অবসান ঘটে, তবে একাংশ প্রার্থীর জন্য তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা। নিয়োগপত্র পাওয়া প্রার্থীদের ১ অক্টোবরের মধ্যে যোগদানের নির্দেশনা রয়েছে এবং ৪ অক্টোবর থেকে পদায়ন শুরু হওয়ার কথা।
এখন নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীদের প্রশ্ন- তারা কি পরবর্তী সময়ে নিয়োগ পাবেন, নাকি চূড়ান্তভাবে বাদ পড়েছেন। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট ব্যাখ্যার অপেক্ষায় রয়েছেন তারা।