প্রকাশিত : ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২১:০২ (রবিবার)
সিলেটের পর্যটন: সম্ভাবনার নতুন দ্বার, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নতুন পথ

ছবি: সংগৃহীত

সালাউদ্দিন বাবলু:: প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অপূর্ব সমন্বয়ে সিলেট বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন অঞ্চল। শাহজালাল, শাহপরান মাজার, জাফলং, রাতারগুল, বিছানাকান্দি, লালাখাল, সাদাপাথর, শ্রীমঙ্গলের চা-বাগান ও হাকালুকি হাওর প্রতিনিয়ত দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। এর পাশাপাশি সিলেটের সমৃদ্ধ ইতিহাস, সুফি-ঐতিহ্য, লোকসংস্কৃতি এবং আতিথেয়তা পর্যটনকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। এগুলো আমাদের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য বিশাল সম্ভাবনার দ্বার।

কিন্তু এই সম্ভাবনাকে কেবল সৌন্দর্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। পর্যটনকে সিলেটের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উদ্যোক্তা বিকাশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

একজন পর্যটক শুধু একজন দর্শনার্থী নন; তিনি স্থানীয় অর্থনীতির একজন অংশীদার। তাঁর ভ্রমণের সঙ্গে হোটেল, রেস্টুরেন্ট, পরিবহন, গাইড, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও স্থানীয় পণ্যের অসংখ্য উদ্যোক্তার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যুক্ত হয়। ফলে পর্যটনের বিকাশ সরাসরি স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

সিলেটের পর্যটনকে শুধু দর্শনীয় স্থান দেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। আমাদের প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও টেকসই পর্যটন ব্যবস্থা- যেখানে থাকবে উন্নত যোগাযোগ, নিরাপদ ভ্রমণ, মানসম্মত আবাসন, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, দক্ষ পর্যটনসেবা এবং স্থানীয় মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ। 

তবে উন্নয়নের সঙ্গে আমাদের দায়িত্বও আছে। প্রকৃতি ধ্বংস করে পর্যটন নয়- প্রকৃতিকে রক্ষা করেই পর্যটনের বিকাশ করতে হবে।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়- প্রকৃতি আমাদের পর্যটনের মূল সম্পদ। তাই পাহাড়, নদী, ঝরনা, হাওর ও বন ধ্বংস করে কোনো উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। প্রকৃতিকে সংরক্ষণ করেই পর্যটনের বিকাশ ঘটাতে হবে। প্রকৃতির সুরক্ষা সব উন্নয়নের কেন্দ্রে রাখতে হবে পরিবেশকে। পাহাড়, নদী, ঝরনা, হাওর, বন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করেই আমাদের পর্যটনকে এগিয়ে নিতে হবে।আজকের পর্যটন যেন আগামী প্রজন্মের জন্যও সিলেটের সৌন্দর্য অক্ষুণ্ণ রাখে- এটাই আমাদের দায়িত্ব। 

কিন্তু শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য থাকলেই একটি অঞ্চল আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হয়ে ওঠে না। প্রয়োজন পরিকল্পনা, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ। সিলেটের পর্যটনকে নতুন উচ্চতায় নিতে এখন প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক ও সমন্বিত পদক্ষেপ। 

 সিলেটের পর্যটন উন্নয়নে আমাদের এখনই কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন-

১. পরিকল্পিত পর্যটন জোন: জাফলং, বিছানাকান্দি, রাতারগুল, লালাখাল, সাদাপাথরসহ গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন করে পর্যটন জোন হিসেবে গড়ে তোলা। 

২. আধুনিক অবকাঠামো ও যোগাযোগ: পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে উন্নত সড়ক যোগাযোগ, পার্কিং, পরিচ্ছন্ন ওয়াশরুম, বিশ্রামাগার, তথ্যকেন্দ্র, নিরাপদ নৌযান ও পর্যটক সহায়তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। 

৩. নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন পর্যটন: পর্যটকদের নিরাপত্তা, জরুরি চিকিৎসা, প্রশিক্ষিত পর্যটনকর্মী এবং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। 

৪. স্থানীয় উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগ: হোটেল, রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট, পরিবহন, ট্যুর গাইড, হস্তশিল্প ও স্থানীয় পণ্যের ব্যবসায় বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানো এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পর্যটন অর্থনীতির অংশীদার করা। 

৫. সিলেটের ব্র্যান্ডিং: ডিজিটাল মার্কেটিং, আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলা ও সমন্বিত প্রচারণার মাধ্যমে সিলেটের পর্যটন সম্ভাবনাকে দেশ-বিদেশে তুলে ধরা। 

৬. পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পর্যটন: পাহাড়, নদী, ঝরনা, হাওর, বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে পর্যটনের উন্নয়ন নিশ্চিত করা। 

সরকারি উদ্যোগ, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সিলেটকে শুধু দেশীয় পর্যটকদের নয়, আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছেও একটি আকর্ষণীয় ও মানসম্মত গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব।  

তাই সিলেটের পর্যটন উন্নয়নে সরকারি সংস্থা, স্থানীয় প্রশাসন, ব্যবসায়ী সমাজ, পর্যটন উদ্যোক্তা, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

এই বিশ্ব পর্যটন দিবসে আমাদের প্রত্যয় হোক- সিলেটের পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাব, স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করব, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করব, এবং আমাদের প্রকৃতি ও ঐতিহ্যকে ভালোবেসে সংরক্ষণ করব। সিলেটের সৌন্দর্য আমাদের সম্পদ। সিলেটের পর্যটন আমাদের সম্ভাবনা। আর সেই সম্ভাবনাকে সমৃদ্ধিতে রূপ দেওয়াই আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব।সিলেট হবে একটি নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন, পরিবেশবান্ধব ও বিনিয়োগবান্ধব পর্যটন অঞ্চল।
 

লেখক: সালাউদ্দিন বাবলু, সহসভাপতি, রেষ্টুরেন্ট মালিক সমিতি, সিলেট জেলা।

সাধারণ সম্পাদক, ক্যাটারাস গ্রুপ অব সিলেট।