প্রকাশিত : ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২১:৫৬ (রবিবার)
ধামাইল কি এখনও ঐতিহ্য, নাকি এখন শুধুই ব্যবসা?

একসময় সন্ধ্যা নামলেই গ্রামের কোনো বাড়ির উঠোনে বসত ধামাইলের আসর। একজন গান ধরতেন, বাকিরা তালে তালে কণ্ঠ মেলাতেন। করতালির ছন্দে চলত নাচ। বিয়ে কিংবা পারিবারিক আনন্দের আয়োজন মুহূর্তেই পরিণত হতো পুরো পাড়ার উৎসবে।

কোনো মঞ্চ ছিল না, ছিল না ঝলমলে আলো। ছিল না পারিশ্রমিকের হিসাবও। মানুষের আনন্দ আর অংশগ্রহণই ছিল ধামাইলের আসল শক্তি।

সিলেট ও হাওরাঞ্চলের গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এই লোকসংস্কৃতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম মুখে মুখে ছড়িয়ে এসেছে। বিশেষ করে নারীদের অংশগ্রহণে ধামাইলের আসর হয়ে উঠত সামাজিক মিলনমেলার মতো।

কিন্তু সময় বদলেছে। বদলেছে ধামাইলও। আজ গ্রামের উঠোন পেরিয়ে ধামাইল জায়গা করে নিয়েছে শহরের মঞ্চে। বিয়ে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিভিন্ন উৎসব ও নানা আয়োজনে ধামাইলের দল ডাক পাচ্ছে। নির্দিষ্ট পারিশ্রমিকের বিনিময়ে হচ্ছে পরিবেশনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে এসব আয়োজনের ভিডিও। অর্থাৎ ধামাইলের জনপ্রিয়তা বেড়েছে, সঙ্গে তৈরি হয়েছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও। এতে শিল্পীদের আয় ও কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। নতুন প্রজন্মও ধামাইল শেখার সুযোগ পাচ্ছে। এই দিক থেকে পরিবর্তনকে ইতিবাচকভাবেও দেখা যায়।

তবে প্রশ্নটা অন্য জায়গায়-

ধামাইল যখন ‘বুকিং’ করে পরিবেশনের বিষয় হয়ে ওঠে, তখন তার ঐতিহ্যের জায়গাটা কোথায়?

আগে মানুষ ধামাইল করতেন। এখন অনেক ক্ষেত্রে মানুষ ধামাইল দেখেন। আগে একটি বাড়ির উঠোনে ধামাইল হলে পাশের বাড়ির মানুষও ছুটে আসতেন। আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী—সবাই মিলে অংশ নিতেন। এখন অনেক আয়োজনেই নির্দিষ্ট দল আসে, নির্দিষ্ট সময় পরিবেশন করে, তারপর শেষ হয় অনুষ্ঠান। আগের সেই স্বতঃস্ফূর্ততা কতটা আছে-এটাই এখন বড় প্রশ্ন।

বাণিজ্য কি ধামাইলের শত্রু?

অবশ্যই এমন সরলভাবে দেখার সুযোগ নেই। একজন শিল্পী তার শ্রমের মূল্য পাবেন, সম্মানী পাবেন- এটাই স্বাভাবিক। শিল্পকে পেশা হিসেবে টিকিয়ে রাখতে অর্থনৈতিক ভিত্তিও প্রয়োজন। ধামাইলের দল যদি নিয়মিত কাজ পায়, তাহলে নতুন শিল্পী তৈরি হওয়ার সুযোগ বাড়বে। কিন্তু সমস্যা তৈরি হতে পারে তখন, যখন বাজারের চাহিদা ধামাইলের নিজস্ব রূপকে বদলে দিতে শুরু করে।

গানের ভাষা, পুরোনো সুর, ঐতিহ্যবাহী নৃত্যভঙ্গি কিংবা পরিবেশনার নিজস্ব ধরন যদি ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়-

আমরা কি ধামাইলকে আধুনিক করছি, নাকি ধামাইলের পুরোনো পরিচয়টাই বদলে দিচ্ছি? মঞ্চে ধামাইল, কিন্তু উঠোনে কি নেই?

ধামাইলের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। একটি গান সবাইকে একসঙ্গে দাঁড় করাত। বয়সের পার্থক্য ভুলে মানুষ আনন্দে মেতে উঠত। নতুন প্রজন্ম শিখত বড়দের কাছ থেকে। এভাবেই একটি গান, একটি সুর, একটি নাচ বেঁচে থাকত প্রজন্মের পর প্রজন্ম। এখন সেই জায়গায় এসেছে মঞ্চ, সাউন্ড সিস্টেম, আলো আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।

এসব ধামাইলকে আরও মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে—এটিও সত্য। কিন্তু মঞ্চ যত বড় হচ্ছে, ধামাইলের সেই ছোট্ট উঠোনের গল্পটি কি ততটাই দূরে সরে যাচ্ছে?

ঐতিহ্য বাঁচাতে দরকার ভারসাম্য।

ধামাইলকে সময়ের সঙ্গে চলতে হবে। নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছাতে হবে। শিল্পীদের সম্মানী দিতে হবে। নতুন শিল্পী তৈরি করতে হবে। তবে একই সঙ্গে সংরক্ষণ করতে হবে পুরোনো ধামাইলের গান, সুর, ভাষা, নাচের ধরন ও ইতিহাস।

প্রবীণ শিল্পীদের কাছ থেকে পুরোনো গান সংগ্রহ করা, নতুন প্রজন্মকে ঐতিহ্যবাহী ধামাইল শেখানো এবং গ্রামের সামাজিক আয়োজনেও ধামাইলের চর্চা বাড়ানো যেতে পারে। কারণ শুধু মঞ্চে পরিবেশন করলেই কোনো লোকঐতিহ্য পুরোপুরি বেঁচে থাকে না। ঐতিহ্য বাঁচে মানুষের জীবনে।

আজকের প্রজন্ম ধামাইল দেখছে বড় মঞ্চে। আগামী প্রজন্ম হয়তো দেখবে আরও বড় আয়োজনের মধ্যে। কিন্তু তারা যদি একদিন জানতে চায়—ধামাইল কোথা থেকে এসেছে, গ্রামের সেই উঠোনে কীভাবে মানুষ একসঙ্গে গান গাইত, কেন ধামাইল ছিল মানুষের আনন্দের অংশ- তখন সেই গল্পগুলোও আমাদের কাছে থাকতে হবে।

কারণ একদিন যদি মঞ্চ থাকে, আলো থাকে, সাউন্ড থাকে, দর্শক থাকে- কিন্তু না থাকে সেই মাটির গন্ধ, মানুষের স্বতঃস্ফূর্ততা আর পুরোনো আবেগ-

তাহলে হয়তো ধামাইলের আয়োজন থাকবে, কিন্তু ধামাইলের আত্মাটা থাকবে না।

তাই প্রশ্নটা ধামাইল ব্যবসা হবে কি না- শুধু সেটি নয়।

প্রশ্ন হলো- ব্যবসার হাত ধরে ধামাইল আরও দূরে ছড়িয়ে পড়বে, নাকি বাণিজ্যের ভিড়ে হারিয়ে যাবে তার মাটির শেকড়?

উত্তরটা নির্ভর করছে আমাদের ওপরই।

ধামাইলের মঞ্চ বড় হোক, শিল্পীর সম্মানী বাড়ুক, নতুন প্রজন্ম এগিয়ে আসুক- কিন্তু বেঁচে থাকুক সেই পুরোনো উঠোনের ধামাইল।

কারণ ধামাইল শুধু গান-নাচ নয়; এটি আমাদের মানুষের গল্প, আমাদের স্মৃতি, আমাদের মাটির সুর।