আজ রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) ‘বিশ্ব পর্যটন দিবস’। পাহাড়ি ঝরনা, সবুজ চা-বাগান, রহস্যময় জলাবন আর হাওরের পসরা সাজানো প্রকৃতির রানি সিলেট। দেশের পর্যটন শিল্পে এই অঞ্চলের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু সম্ভাবনার বিপরীতে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। অবহেলা, অব্যবস্থাপনা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের চাপে সিলেটের পর্যটন খাত এখন এক ধরনের স্থবিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিক থেকে সিলেট দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চল হলেও প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার অভাবে এই খাত কাঙ্ক্ষিত বিকাশ পাচ্ছে না। বরং দিন দিন বাড়ছে নানা সংকট, যা পর্যটন নির্ভর অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে যোগাযোগ ব্যবস্থার দুরবস্থা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে জেলার বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রের সড়ক যোগাযোগ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিছনাকান্দি, রাতারগুল কিংবা লালাখালের মতো জনপ্রিয় স্পটে যেতে হলে পর্যটকদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ সড়কগুলো চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
মৌসুমী বন্যা ও জলবায়ুর প্রভাবও পর্যটন খাতে বড় আঘাত হানছে। অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে আকস্মিক বন্যা দেখা দিলে নিরাপত্তার কারণে প্রশাসনকে প্রায়ই পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ রাখতে হয়। এতে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবীদের আয় হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে যায়, সৃষ্টি হয় আর্থিক অনিশ্চয়তা।
অবকাঠামোগত দুর্বলতাও স্পষ্ট। ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর, জাফলং বা রাতারগুলের মতো জায়গায় পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত ওয়াশরুম, পোশাক পরিবর্তনের স্থান কিংবা আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নেই। ফলে একদিকে যেমন ভোগান্তি বাড়ছে, অন্যদিকে পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পরিবহন খাতে শৃঙ্খলার অভাব আরেকটি বড় অভিযোগ। নির্ধারিত ভাড়া বা কার্যকর তদারকি না থাকায় পর্যটকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে হয়রানি ও নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগও উঠছে, যা ভ্রমণকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
পরিবেশ বিপর্যয়ের বিষয়টিও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। জাফলং ও সাদা পাথর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে পাথর ও বালু উত্তোলনের ফলে নদীর স্বাভাবিক সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। একই সঙ্গে জলাবন রাতারগুলের পরিবেশগত ভারসাম্য নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে, যেখানে অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন পরিবেশবিদরা।
তবে এত সংকটের মধ্যেও সম্ভাবনার দিকটি উজ্জ্বল। প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের পাশাপাশি ধর্মীয় পর্যটনের ক্ষেত্রেও সিলেটের বিশেষ অবস্থান রয়েছে। হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজারসহ অসংখ্য আউলিয়ার মাজারে দেশ-বিদেশ থেকে নিয়মিত ভক্তরা আসেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও সমন্বিত উদ্যোগ নিলে সিলেটের পর্যটন খাত ঘুরে দাঁড়াতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক দ্রুত সংস্কার, পর্যটনকেন্দ্রে মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করা, পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করে টেকসই অবকাঠামো গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি।
সরকার, স্থানীয় প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত উদ্যোগই পারে অপার সম্ভাবনার এই খাতকে আবারও প্রাণ ফিরিয়ে দিতে।