ফার্মগেট মেট্রোস্টেশন
সকালে শরীরচর্চা ও দৌড়ের প্রশিক্ষণ শেষে টি-শার্ট ও হাফপ্যান্ট পরে মেট্রোরেলে উঠতে গিয়ে হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন অ্যাথলেট ও রানিং কোচ সাজ্জাদ হোসেন। তাঁর অভিযোগ, ঢাকার ফার্মগেট মেট্রোস্টেশনে দায়িত্বরত এক পুলিশ সদস্য তাঁর পোশাককে ‘অশালীন’ আখ্যা দিয়ে প্রায় ৪০ মিনিট দাঁড় করিয়ে রাখেন।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকালে এ ঘটনা ঘটে।
সাজ্জাদ হোসেন প্রায় ১০ বছর ধরে ম্যারাথন ও আল্ট্রাম্যারাথনের প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছেন। নিজেও নিয়মিত দৌড়ান। রাজধানীর বিভিন্ন পার্কে ভোরে তিনি দৌড়ের প্রশিক্ষণ করান।
ঘটনার পর নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ৫৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিও প্রকাশ করেন সাজ্জাদ। ভিডিওতে ‘জাকির’ নামের নেমপ্লেট পরা এক পুলিশ সদস্যকে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়।

ছবি: পুলিশ জাকির।
ভিডিওতে পুলিশ সদস্যকে বলতে শোনা যায়, ‘আপনাকে বলা হয়েছে, আপনি একটু শালীনতার সঙ্গে যান। এইটা একেবারে পুরোপুরি শালীনতার মধ্যে পড়ে না।’
এর জবাবে সাজ্জাদ জানতে চান, কোন পোশাক শালীন আর কোনটি অশালীন- এ বিষয়ে কোনো লিখিত নিয়ম আছে কি না। পুলিশ সদস্য বলেন, ‘এটা দেখা আমার দায়িত্ব।’
সাজ্জাদ হোসেনের ভাষ্য, সকালে রমনায় প্রশিক্ষণ করানোর পর ফার্মগেটে তাঁর একটি কাজ ছিল। কাজ শেষে বিজয় সরণি যাওয়ার জন্য তিনি ফার্মগেট মেট্রোস্টেশনে যান। টিকিট কেটে স্টেশনে প্রবেশের সময় দায়িত্বরত এক পুলিশ সদস্য তাঁকে ডেকে বলেন, ‘এই আপনি, এই সব কি ড্রেস পরেন, এই সব অশ্লীল ড্রেস পরে মেট্রোতে ঢোকা যাবে না!’
তখন তিনি নিজেকে রানিং কোচ হিসেবে পরিচয় দিয়ে জানান, প্রশিক্ষণ শেষে পরবর্তী গন্তব্যে যাওয়ার জন্য মেট্রোরেলে উঠছেন। মেট্রোরেলে শর্টস পরা নিষিদ্ধ- এমন কোনো নিয়ম থাকলে তা দেখাতেও অনুরোধ করেন তিনি।
সাজ্জাদের অভিযোগ, সেখানে থাকা আরও দুই পুলিশ সদস্যও তাঁর পোশাক নিয়ে আপত্তি জানান। তাঁদের একজন ট্রাউজার পরে আসতে বলেন। এমনকি শর্টস খুলে রেখে ট্রাউজার পরে আসার কথাও বলা হয়। এরপর তাঁকে টিকিট পাঞ্চ মেশিনের সামনে প্রায় ৪০ মিনিট দাঁড় করিয়ে রাখা হয়।
সাজ্জাদ আরও অভিযোগ করেন, মেট্রোরেলের কন্ট্রোল বোর্ডের একজন নারী কর্মকর্তাও তাঁর পোশাক নিয়ে প্রশ্ন করেন। ওই কর্মকর্তা তাঁর ছবি তুলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলতে যান বলেও জানান তিনি।
পরে মেট্রোরেলের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলার পর তাঁকে মেট্রোরেলে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়।
ঘটনার পর ফার্মগেট মেট্রোস্টেশনে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলেও জানান সাজ্জাদ। তাঁর দাবি, অভিযোগ দেওয়ার পর তাঁকে কোনো কপি দেওয়া হয়নি। অভিযোগের ছবি তুলতে চাইলে সেটিও করতে দেওয়া হয়নি।
বিষয়টি নিয়ে মেট্রোরেলের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, মেট্রোরেলে যাত্রী চলাচলের জন্য কোনো ড্রেস কোড নেই। শর্টস পরার কারণে একজন যাত্রীকে এভাবে আটকে রাখার বিষয়টি কেন ঘটেছে, তা তাঁর জানা নেই।
এ বিষয়ে এমআরটি পুলিশের জনসংযোগ কর্মকর্তার বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। তাঁকে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বাংলাদেশ ভলিবল ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মুমিন সাদ্দাম বলেন, ‘একজন ক্রীড়াবিদকে তাঁর খেলাধুলার পোশাকের কারণে গণপরিবহনে উঠতে বাধা দেওয়া এবং দাঁড় করিয়ে রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি শুধু একজন ব্যক্তিকে হয়রানির বিষয় নয়, এর সঙ্গে একজন ক্রীড়াবিদের মর্যাদা ও সম্মানের প্রশ্ন জড়িত। এছাড়া কোনো লিখিত বিধি ছাড়া একজন ক্রীড়াবিদকে আটকে রেখে মানসিকভাবে হেনস্তা করা দায়িত্বশীল আচরণ নয়। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কাছ থেকে আমরা আরও পেশাদার ও সংবেদনশীল আচরণ প্রত্যাশা করি।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমি মনে করি, ঘটনাটি যথাযথভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কে কী কারণে একজন ক্রীড়াবিদকে এতক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখলেন, কোন বিধির ভিত্তিতে তাঁকে বাধা দেওয়া হলো- এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত। ক্রীড়াবিদরা দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন; তাঁদের প্রতি সম্মান দেখানো এবং অযথা হয়রানি না করা সবার দায়িত্ব।’
ঘটনাটি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক সাজ্জাদ সিদ্দিকী বলেন, এমআরটি পুলিশের এমন আচরণ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার প্রকাশ।
তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি মবের মাধ্যমে আক্রান্ত হলে বা অন্যায়ভাবে হয়রানির শিকার হলে পুলিশের দায়িত্ব তাঁকে সুরক্ষা দেওয়া। কিন্তু পুলিশই যদি নিপীড়কের ভূমিকায় চলে যায়, তাহলে বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক।
অধ্যাপক সাজ্জাদ সিদ্দিকীর মতে, সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত উগ্রতার সঙ্গে পুলিশের পোশাক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার অপব্যবহার যুক্ত হলে তা সামাজিক অবক্ষয়ের আরও ভয়ংকর রূপ নেয়। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সাজ্জাদ হোসেনের ভাষ্য, একজন মানুষ শরীরচর্চা বা দৌড়ের প্রশিক্ষণ শেষে যে পোশাকে চলাচল করবেন, সেটিকে অশালীন আখ্যা দিয়ে গণপরিবহনে প্রবেশে বাধা দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। মেট্রোরেলে শর্টস পরা নিষিদ্ধ হলে তার লিখিত নিয়ম দেখানো উচিত ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।