প্রকাশিত : ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৫:১০ (বৃহস্পতিবার)
কাশবনে ‘অশ্লীলতা’ অভিযোগে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো কফি শপ!

ছবি: সংগৃহীত

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে কাশফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে যাওয়া মানুষের জন্য গড়ে ওঠা একটি চা ও কফি শপ গুঁড়িয়ে দিয়েছে পুলিশ। ‘অসামাজিক কার্যকলাপের’ অভিযোগ তুলে দুর্গম চরাঞ্চলের ওই স্থাপনা ভেঙে ফেলার ঘটনায় এখন প্রশ্ন উঠেছে; প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের একটি সম্ভাবনাময় বিনোদনকেন্দ্রকে কি অভিযোগের ভিত্তিতেই অপরাধের আখড়া হিসেবে চিহ্নিত করা হলো?

মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) বিকেলে চরভূরুঙ্গামারী ইউনিয়নের ইসলামপুরের চরে অভিযান চালিয়ে ‘কাশফুলের ঘাট’ নামের চা ও কফি শপটি গুঁড়িয়ে দেয় ভূরুঙ্গামারী থানা পুলিশ ও অর্ধশতাধিক গ্রামপুলিশের একটি দল।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ইসলামপুরের চরে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা বিস্তীর্ণ কাশবন বর্ষা শেষে ও শরতের সময়ে দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে। কাশফুল দেখতে, ছবি তুলতে কিংবা পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের নিয়ে কিছুটা সময় কাটাতে সেখানে মানুষের যাতায়াত বাড়ছিল। সেই দর্শনার্থীদের কথা মাথায় রেখেই গড়ে উঠেছিল চা-কফির ছোট একটি দোকান।

কাশফুলের সৌন্দর্য উপভোগ, ছবি তোলা কিংবা প্রকৃতির মধ্যে বসে চা-কফি খাওয়ার মতো সাধারণ বিনোদনকে ঘিরে এমন উদ্যোগ দেশের বিভিন্ন জায়গাতেই দেখা যায়। ফলে কোনো স্থানে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তার তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পুরো বিনোদনকেন্দ্রটিকেই ধ্বংস করে দেওয়া কতটা যৌক্তিক; সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

পুলিশের পক্ষ থেকে অবশ্য দাবি করা হয়েছে, কফি শপটির আড়ালে অসামাজিক কর্মকাণ্ড চলছিল। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নামে অশ্লীল নৃত্য, মাদক সেবন, ডিজে পার্টি এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগও করা হয়েছে। এমনকি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের সেখানে যাতায়াতের অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ, আটক ব্যক্তির সংখ্যা, মাদক উদ্ধারের তথ্য কিংবা অশ্লীল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নেওয়া আইনগত ব্যবস্থার তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগের সত্যতা, পরিধি এবং প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

অভিযোগ সত্য হলে অবশ্যই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু কয়েকজনের বিরুদ্ধে কোনো অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তার দায় পুরো একটি প্রাকৃতিক বিনোদনস্থানের ওপর বর্তাবে কি না, সেটিও বিবেচনার বিষয়। বিশেষ করে কাশফুল দেখতে আসা সাধারণ মানুষ, পরিবার কিংবা তরুণদের বিনোদনের সুযোগকে ‘অশ্লীলতা’ বা ‘অসামাজিকতা’র সঙ্গে এক করে দেখার প্রবণতা শেষ পর্যন্ত সুস্থ বিনোদনের পরিসরই সংকুচিত করতে পারে।

অভিযানের সময় ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমৃত দেবনাথ, ভূরুঙ্গামারী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মুনতাসির মামুন মুন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) জামিলুর রহমান এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আজিম উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন।

সহকারী পুলিশ সুপার মুনতাসির মামুন মুন বলেন, দুর্গম এলাকায় কফি শপের আড়ালে অসামাজিক ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছিল। কিশোর-কিশোরীদের নৈতিক অবক্ষয় রোধে শপটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বিনোদনের নামে চলা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে অপরাধ দমন অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই সঙ্গে এটিও জরুরি- প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের জায়গা, তরুণদের স্বাভাবিক বিনোদন কিংবা একটি ছোট উদ্যোক্তা উদ্যোগ যেন অযাচাইকৃত অভিযোগের কারণে ‘অশ্লীলতার আখড়া’ হিসেবে চিহ্নিত না হয়।

কাশবন ধ্বংস না করে, বিনোদনের সুযোগ বন্ধ না করে এবং সাধারণ দর্শনার্থীদের অপরাধীর চোখে না দেখে; অভিযোগ থাকলে সুনির্দিষ্টভাবে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই হতে পারে অধিকতর ভারসাম্যপূর্ণ পথ।

কারণ কাশফুল দেখা অপরাধ নয়, প্রকৃতিকে উপভোগ করাও অশ্লীলতা নয়। অপরাধ যদি থেকেও থাকে, সেটি শনাক্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই মূল কথা; পুরো বিনোদনকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়া নয়।