ছবি: ইমজা নিউজ
সুনামগঞ্জের ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলার সীমান্তঘেঁষা চেলা নদীর ‘মৃত চেলা’ অংশে দিন-রাত চলছে ড্রেজার ও সেভ মেশিন। স্থানীয়দের অভিযোগ, শতাধিক ড্রেজার বসিয়ে নির্বিচারে বালু উত্তোলন করছে একটি প্রভাবশালী চক্র। তাঁদের দাবি, মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় অন্তত ২০ কোটি টাকার বালু তুলে নেওয়া হয়েছে। অবাধ বালু উত্তোলনে নদীর তলদেশে সৃষ্টি হচ্ছে গভীর গর্ত, ভাঙছে তীর, বদলে যাচ্ছে গতিপথ। এতে হুমকিতে পড়েছে বসতবাড়ি, কৃষিজমি, সড়ক, মসজিদ, মাদ্রাসা ও কবরস্থান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে চলা এই বালু উত্তোলনে ইতোমধ্যে কলাবাগান ও গেদুর ঢালা নামে পরিচিত বিস্তীর্ণ এলাকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একসময় ‘গেদুর ঢালা খাল’ নামে পরিচিত এলাকাটি এখন বিশাল জলভাগে পরিণত হয়েছে। কোথাও কোথাও এর বিস্তৃতি মূল চেলা নদীর অংশকেও ছাড়িয়ে গেছে বলে দাবি তাঁদের।
নদীর তীর ও গতিপথের এই পরিবর্তনে আশপাশের অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে ভিটেমাটি হারানোর আতঙ্ক। কৃষকেরা রয়েছেন জমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার শঙ্কায়। নদীর কাছাকাছি থাকা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও কবরস্থান নিয়েও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, বালু উত্তোলন এখন আর গোপন কোনো কর্মকাণ্ড নয়। দিনের আলোতেও নদীতে ড্রেজার চলছে, রাত নামলেই বাড়ছে এর তৎপরতা। একের পর এক ড্রেজার ও সেভ মেশিন দিয়ে নদীর তলদেশ থেকে বালু তুলে নেওয়া হচ্ছে।
তাঁদের প্রশ্ন, শতাধিক ড্রেজার যদি প্রকাশ্যে নদীতে চলতে পারে, তাহলে এসব যন্ত্রের মালিক কারা, কার অনুমতিতে এগুলো নদীতে অবস্থান করছে এবং উত্তোলিত বালু কোথায় যাচ্ছে- এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কেন খতিয়ে দেখছে না?
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। বিচ্ছিন্ন অভিযানে শ্রমিকদের আটক বা জরিমানা করা হলেও মূল নিয়ন্ত্রকেরা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে একটি শক্তিশালী প্রভাবশালী চক্র গড়ে ওঠার অভিযোগ করেছেন বাসিন্দারা। তাঁদের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব কাজে লাগিয়ে নদী থেকে বালু উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের সমর্থকদের বিভিন্ন অংশের লোকজন পরস্পরের সঙ্গে সমন্বয় করে এই বালু উত্তোলন কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করছেন। প্রশাসন, পুলিশ ও সংশ্লিষ্টদের ‘ম্যানেজ’ করে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নেতৃত্বে রাতের পর রাত বালু লুট চলছে বলেও অভিযোগ তাঁদের।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মৃত চেলা নদীর সংশ্লিষ্ট অংশে অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রেও প্রশাসনিক সীমানা নিয়ে জটিলতা রয়েছে। এলাকাটি প্রশাসনিকভাবে দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংহপুর ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হলেও সংশ্লিষ্ট মৌজা ছাতক উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের আওতাভুক্ত বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই প্রশাসনিক জটিলতার সুযোগ নিচ্ছে বালু উত্তোলনকারীরা। এক উপজেলার প্রশাসন অভিযান চালালে অন্য এলাকার সীমানার বিষয় সামনে আসে। ফলে নিয়মিত ও সমন্বিত নজরদারি না থাকায় অভিযান শেষ হলেই আবার নদীতে ড্রেজার নামছে।
দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, নদীপথের বিস্তৃতি এবং পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় নিয়মিত নজরদারি করাও কঠিন বলে জানিয়েছে প্রশাসন ও পুলিশ।
স্থানীয়দের দাবি, ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ, নৌ-পুলিশ, আনসার এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের সমন্বয়ে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
সম্প্রতি রাতে দোয়ারাবাজার উপজেলা প্রশাসনের একটি দল সেখানে অভিযান চালিয়ে দুই শ্রমিককে আটক করে। পরে তাঁদের এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযানে বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত ড্রেজারগুলো জব্দ করা হয়নি। অভিযান শেষ হওয়ার পরপরই আবার নদীতে বালু উত্তোলন শুরু হয়।
স্থানীয়রা বলছেন, শুধু শ্রমিক আটক বা জরিমানা করে এই কর্মকাণ্ড বন্ধ করা সম্ভব নয়। বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত ড্রেজার, সেভ মেশিন ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি জব্দ করার পাশাপাশি এর অর্থের উৎস, বালু পরিবহনের নেটওয়ার্ক এবং মূল নিয়ন্ত্রকদের শনাক্ত করতে হবে।
হাওর এরিয়া আপলিফটমেন্ট সোসাইটির (হাউস) নির্বাহী পরিচালক সালেহীন চৌধুরী শুভ বলেন, মৃত চেলা নদীতে যেভাবে বালু উত্তোলন চলছে, তাতে নদীর পরিবেশ ও প্রতিবেশব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর প্রভাব আশপাশের জনবসতি ও মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ওপরও পড়তে পারে।
তিনি নদীভাঙন রোধ এবং অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে দ্রুত যৌথ টাস্কফোর্সের কার্যকর অভিযান পরিচালনার দাবি জানান।
ছাতক নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক অরবিন্দ সরকার নদীতে বালু উত্তোলন এবং তীরবর্তী এলাকার ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, সীমাহীন বালু উত্তোলনের কারণে নদীর তীর ও কলাবাগান এলাকার ক্ষতি দৃশ্যমান হয়েছে। এ ঘটনায় গত সেপ্টেম্বরে ছাতক নৌ-পুলিশের পক্ষ থেকে একাধিক মামলা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, নিয়মিত অভিযান চালানো হলেও পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় ২৪ ঘণ্টা নদী এলাকায় পাহারা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অরূপ রতন সিংহ বলেন, এলাকাটি ভৌগোলিকভাবে দুর্গম এবং সেখানে যাতায়াত কঠিন। এ কারণে নিয়মিত অভিযান পরিচালনায় নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে মোবাইল কোর্ট ও টাস্কফোর্সের মাধ্যমে অভিযান চালিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ছাতক নৌ-পুলিশের একটি স্থায়ী বা অস্থায়ী ফাঁড়ি স্থাপন প্রয়োজন। পুলিশ, নৌ-পুলিশ, আনসার ও উপজেলা প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে অবৈধ বালু উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে।
সুনামগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মহাইমিনুল হক বলেন, অবৈধ ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর প্রতিবেশব্যবস্থা ও স্থানীয় পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় টাস্কফোর্সের সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় যারই হোক, নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে তদন্তের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে ড্রেজার ও সেভ মেশিন জব্দ, বালু পরিবহন বন্ধ এবং উত্তোলিত বালুর পরিমাণ ও অর্থনৈতিক লেনদেন খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তাঁদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে মৃত চেলার তীরবর্তী আরও বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে চলে যেতে পারে। হারিয়ে যেতে পারে কৃষিজমি, বসতভিটা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
শতাধিক ড্রেজারে দিন-রাত নদীর বুক চষে যদি বালু তোলা হয়, তাহলে এর পেছনে কারা- এ প্রশ্ন এখন স্থানীয়দের। কোথায় যাচ্ছে কোটি কোটি টাকার বালু, কারা নিয়ন্ত্রণ করছে এই বিশাল বালুবাণিজ্য এবং নদী ও জনপদ ধ্বংসের দায়ই বা নেবে কে- এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কার্যকর তদন্ত ও কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপের দাবি উঠেছে।
মৃত চেলা এখন শুধু বালু উত্তোলনের একটি স্থান নয়; নদী, পরিবেশ ও জনপদ রক্ষায় প্রশাসনের কার্যকারিতারও বড় পরীক্ষাক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।