প্রকাশিত : ০৬ অক্টোবর, ২০২৬ ০২:২৮ (মঙ্গলবার)
লাল শাড়ি আর পরা হলো না বৃষ্টির, বিয়ের দুই সপ্তাহ আগে ডেঙ্গুতে নিভল প্রাণ

ছবিঃ সংগৃহীত

বিয়ের আর মাত্র দুই সপ্তাহ বাকি। ঘরজুড়ে তখন নতুন জীবনের প্রস্তুতি। লাল শাড়ি কেনা হয়ে গেছে, কেনা হয়েছে সিঁদুরও। বিয়ের প্রয়োজনীয় প্রায় সব কেনাকাটাই শেষ। ১৬ অক্টোবর নতুন জীবনের গল্প শুরু হওয়ার কথা ছিল বৃষ্টি ঘরামির। কিন্তু সেই গল্প আর লেখা হলো না।

বিয়ের আনন্দের দিন গোনার বদলে ২৫ বছরের বৃষ্টিকে শেষ বিদায়ের আয়োজন করতে হলো পরিবারকে। ডেঙ্গু কেড়ে নিল তরুণ এই নার্সের প্রাণ। আর মৃত্যুর পরও তাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে সিঁদুর পরিয়ে দিলেন তার হবু বর; যেন অসমাপ্ত বিয়ের সব আয়োজন শেষ হলো এক মুঠো কান্নার ভেতর দিয়ে।

গোপালগঞ্জের বৃষ্টি ঘরামি ঢাকার শ্যামলীর একটি ট্রমা সেন্টারে নার্স হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরিবার জানায়, প্রায় নয় মাস ধরে সেখানে দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি। গত শুক্রবার সেখানেই তার মৃত্যু হয়। রোববার (৪ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে সিঁদুর পরা বৃষ্টির নিথর দেহের একটি ছবি। ছবিটিতে জীবনের উজ্জ্বল কোনো রং নেই, আছে শুধু এক অসমাপ্ত জীবনের নির্মম গল্প।

বৃষ্টির ফেসবুক আইডিতে দেখা যায়, মৃত্যুর দিন সকালেও তিনি বি নেগেটিভ রক্তের প্রয়োজনের কথা জানিয়ে একটি পোস্ট করেছিলেন। একটি ফোন নম্বর দিয়ে রক্তদাতাদের এগিয়ে আসার অনুরোধ করেছিলেন। হয়তো তখনও তিনি জানতেন না, জীবনের সঙ্গে তার সময় ফুরিয়ে আসছে। তার দেওয়া নম্বরে ফোন করা হলে কান্নায় ভেঙে পড়েন বৃষ্টির বড়বোন। কিছুক্ষণ কথা বলতে গিয়ে নিজেকে সামলে তিনি বলেন, ‘আমার বোন। আমার বোন আর নাই। ১৬ অক্টোবর বিয়ের দিন ছিল। সব কেনাকাটা শেষ। ডেঙ্গু বোনটাকে কেড়ে নিল।’

বৃষ্টির শেষ সময়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে বড়বোন জানান, তার শরীরের তাপমাত্রা ১০৮ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠেছিল। পরে হিট স্ট্রোক হয়।

পরিবারের অভিযোগ, সংকটাপন্ন সময়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা যথাসময়ে করা হয়নি। তাদের ধারণা, ১০ থেকে ২০ মিনিট আগেও যদি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেত, হয়তো বৃষ্টিকে বাঁচানো সম্ভব হতো। কিন্তু সেই ‘হয়তো’ এখন পরিবারের কাছে আজীবনের এক হাহাকার।

গোপালগঞ্জ নার্সিং ইনস্টিটিউটে পড়াশোনা করেছিলেন বৃষ্টি। সেখানেই গড়ে উঠেছিল স্বপ্ন—পেশাজীবন, সংসার আর ভালোবাসার। পার্শ্ববর্তী টেকেরহাট এলাকায় ছিল তার হবু বরের বাড়ি। দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ের দিনও ঠিক হয়েছিল ১৬ অক্টোবর। বিয়ের জন্য লাল শাড়ি কেনা হয়েছিল। সিঁদুর কেনা হয়েছিল। ঘর বাঁধার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও জড়ো হচ্ছিল ধীরে ধীরে। অথচ শেষ পর্যন্ত সেই সবকিছুই রয়ে গেল বৃষ্টির অনুপস্থিতির সাক্ষী হয়ে।

ঢাকা থেকে যখন বৃষ্টির মরদেহ গোপালগঞ্জের পথে, তখন তার শ্বশুর-শাশুড়িও সঙ্গে নিয়েছিলেন বিয়ের জন্য কেনা সব সামগ্রী। যে জিনিসগুলো নিয়ে কয়েকদিন পর বউ সাজিয়ে ঘরে তোলার কথা ছিল মেয়েটিকে, সেগুলোই এবার ফিরল তার মরদেহের সঙ্গে।

আর শেষবারের মতো বৃষ্টির কপালে সিঁদুর পরিয়ে দিলেন তার হবু বর। বড়বোনের কণ্ঠে তখন কেবলই কান্না। তিনি বলেন, ‘বোনজামাই ওকে সিঁদুর পরিয়ে দিয়েছে। ঢাকা থেকে মরদেহ নিয়ে আসার পথে ওর শ্বশুর-শাশুড়ি বিয়ের সব জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়ে আসেন। বৃষ্টির চলে যাওয়া আমাদের শত জীবনের শোক হয়ে থাকবে। বিয়ে নিয়ে কত আশা ছিল, কত যে গল্প করত।’ হয়তো বৃষ্টি ভেবেছিল, ১৬ অক্টোবর লাল শাড়িতে সেজে নতুন ঘরে পা রাখবে। হয়তো স্বপ্ন দেখেছিল নতুন সংসার, নতুন মানুষ আর নতুন জীবনের। সেই স্বপ্নের কত গল্পই না ছিল তার আপনজনদের সঙ্গে। কিন্তু ক্যালেন্ডারের পাতায় ১৬ অক্টোবর আর এল না বৃষ্টির জীবনে। এলো তার আগেই এক কালো শুক্রবার।

লাল শাড়িটি রয়ে গেল। সিঁদুর রয়ে গেল। বিয়ের কেনাকাটাগুলোও রয়ে গেল। শুধু রইল না সেই মানুষটি; যাকে ঘিরেই ছিল এত আয়োজন। একটি বিয়ে, যা হওয়ার কথা ছিল জীবনের নতুন অধ্যায়; সেটিই শেষ পর্যন্ত হয়ে রইল এক পরিবারের সবচেয়ে মর্মান্তিক স্মৃতি। বৃষ্টির হাতে মেহেদি ওঠেনি, কপালে বিয়ের টিপ জোটেনি, নতুন ঘরে তার পা পড়েনি। তবু মৃত্যুর পর তার কপালে সিঁদুর উঠেছে; ভালোবাসার শেষ স্বীকৃতি হয়ে।

বৃষ্টির বিয়ের বাজার আর ঘরে ফিরবে না কোনো উৎসবের দিনে। সেগুলো হয়তো পড়ে থাকবে কোনো এক কোণে-লাল শাড়ির ভাঁজে, সিঁদুরের কৌটায়, আর পরিবারের মানুষের বুকের গভীরে। সেখানে বৃষ্টি বেঁচে থাকবে; একটি অপূর্ণ বিয়ের গল্প হয়ে।