ছবি: সংগৃহীত
রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এবার ইউরোপীয় নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে। বুধবার (৭ অক্টোবর) রাজধানীর একটি হোটেলে এয়ারবাসের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে এ চুক্তি সই হয়।
এর আগে মার্কিন প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে বিমান। ফলে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার আট মাসের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত এয়ারলাইন্সটির বহরে যুক্ত করার জন্য মোট ৩৫টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হলো।
‘স্প্রেডিং আওয়ার উইংস টুগেদার’ শিরোনামে আয়োজিত চুক্তি সই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর, ইনভেস্ট বাংলাদেশের নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, বিমানের চেয়ারম্যান রুমি এ হোসেন এবং এয়ারবাস ইন্ডিয়া ও সাউথ এশিয়ার প্রেসিডেন্ট ইয়োর্গেন ওয়েস্টারমেয়ারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বিমানের চেয়ারম্যান রুমি এ হোসেন এবং এয়ারবাসের দক্ষিণ এশিয়ার প্রেসিডেন্ট ইয়োর্গেন ওয়েস্টারমেয়ার নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
অনুষ্ঠানে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও স্পেনের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার এবং ঢাকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের মিশনপ্রধান মাইকেল মিলারও উপস্থিত ছিলেন।
চুক্তি অনুযায়ী, এয়ারবাসের কাছ থেকে চারটি ওয়াইড-বডির এ-৩৫০-৯০০ এবং ছয়টি ন্যারো-বডির এ-৩২১নিও উড়োজাহাজ কিনবে বিমান।
এয়ারবাসের তথ্য অনুযায়ী, এ-৩৫০-৯০০ উড়োজাহাজ আগের প্রজন্মের উড়োজাহাজের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি জ্বালানি সাশ্রয়ী এবং কম কার্বন নিঃসরণ করে। তিন শ্রেণির আসন বিন্যাসে এ মডেলের একটি উড়োজাহাজে ৩৩২ থেকে ৩৫২ জন যাত্রী পরিবহন করা যায়। শুধু ইকোনমি শ্রেণির আসন থাকলে যাত্রী ধারণক্ষমতা ৪৮০ জন পর্যন্ত হতে পারে।
এ-৩৫০-৯০০-এর উড্ডয়ন সক্ষমতা প্রায় ১৮ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত বলে জানিয়েছে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। ফলে দীর্ঘপাল্লার আন্তর্জাতিক রুটে এসব উড়োজাহাজ ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে বিমানের।
অন্যদিকে, এ-৩২১নিও মূলত মাঝারি দূরত্বের রুটের জন্য তৈরি। এসব উড়োজাহাজ প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত উড়তে পারে। দুই শ্রেণির আসন বিন্যাসে এতে ১৮০ থেকে ২২০ জন এবং শুধু ইকোনমি শ্রেণিতে সর্বোচ্চ ২৪৪ জন যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব।
বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাইজার সোহেল আহমেদ বলেন, এ-৩৫০-৯০০ উড়োজাহাজ দিয়ে দূরপাল্লার এবং এ-৩২১নিও দিয়ে আঞ্চলিক ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।
এয়ারবাসের সঙ্গে বাংলাদেশের বিমানের এই চুক্তির পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের আলোচনা ও কূটনৈতিক তৎপরতা। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা সফরে এসে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশ এয়ারবাস থেকে ১০টি বড় উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
তখন আটটি যাত্রীবাহী ও দুটি পণ্যবাহী উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টি পর্যালোচনায় ছিল। একই সময়ে মার্কিন প্রতিষ্ঠান বোয়িংও বাংলাদেশের কাছে উড়োজাহাজ বিক্রির জন্য তৎপরতা চালায়।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতি ও শুল্কচাপের প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে অন্তর্বর্তী সরকার।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ বছরের এপ্রিলে প্রথম দফায় ১৪টি বোয়িং কেনার চুক্তি করে বিমান। পরে আরও ১১টি বোয়িং কেনার ঘোষণা আসে। সব মিলিয়ে বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হয়েছে।
এর মধ্যেই এয়ারবাস বিক্রির জন্য ইউরোপীয় দেশগুলোর কূটনৈতিক তৎপরতাও অব্যাহত ছিল। গত ২২ সেপ্টেম্বর ঢাকায় নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশে উড়োজাহাজ কেনার ক্ষেত্রে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’-এর গুরুত্বের কথা তুলে ধরেছিলেন। এর এক সপ্তাহের মাথায় বিমানমন্ত্রী এয়ারবাস কেনার ঘোষণা দেন। ঘোষণার এক সপ্তাহ পরই এলো আনুষ্ঠানিক চুক্তি।
বর্তমানে বিমানের বহরে কোনো এয়ারবাস উড়োজাহাজ নেই। এর আগে দেশের বেসরকারি এয়ারলাইন্স ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বহরে কয়েকটি এয়ারবাস যুক্ত হয়েছে।
এদিকে বোয়িংয়ের সঙ্গে করা ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তির মধ্যে রয়েছে ১৩টি ওয়াইড-বডির ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দুটি ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং ১০টি ন্যারো-বডির ৭৩৭-৮ উড়োজাহাজ।
বিমানের বহরে আগে যুক্ত হওয়া ছয়টি ড্রিমলাইনারও বর্তমানে বিভিন্ন রুটে যাত্রী পরিবহন করছে।
বর্তমানে বিমান ২৪টি আন্তর্জাতিক ও সাতটি অভ্যন্তরীণ গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। উত্তর আমেরিকায় টরন্টো এবং ইউরোপে লন্ডন, ম্যানচেস্টার ও রোমে বিমানের ফ্লাইট রয়েছে। অন্যান্য আন্তর্জাতিক রুট মূলত মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়াকেন্দ্রিক।
নতুন ৩৫টি উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত হলে বিমানের দীর্ঘপাল্লার ও আঞ্চলিক রুটের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারে আরও বিস্তৃতভাবে ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ তৈরি হবে।