ছবি: সংগৃহীত
কুমিল্লার লালমাইয়ে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন হত্যার ঘটনায় তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে হত্যাকাণ্ডের প্রধান অভিযুক্ত সুমনকে গ্রেপ্তার করেছে কুমিল্লা জেলা পুলিশ। তবে নিহত কিশোরীর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ওই ফোন থেকেই ঘটনার রাতে বাবার কাছে লাইভ লোকেশন ও তাকে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধসংবলিত বার্তা পাঠানো হয়েছিল বলে জানা গেছে।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান সুমনকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। পুলিশ এখন তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে হত্যাকাণ্ডে অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না, কী উদ্দেশ্যে তাজমিনকে হত্যা করা হয়েছে এবং নিখোঁজ মোবাইল ফোনটি কোথায়; এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে লালমাই উপজেলার পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগতপুর উত্তরপাড়ার মানুমুড়া জঙ্গলসংলগ্ন একটি ফসলি জমি থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহের গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। ঘটনাস্থলের আশপাশের একাধিক ধানক্ষেতে দৌড়াদৌড়ি ও ধস্তাধস্তির চিহ্ন পাওয়া যায়। পাশে পড়ে ছিল একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা। এসব আলামতকে কেন্দ্র করেই তদন্ত এগিয়ে নেয় পুলিশ।
নিহত জান্নাতুল তাজমিন যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল আলীমের মেয়ে। চাকরির সুবাদে আব্দুল আলীম পরিবার নিয়ে কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। তাজমিন নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয় তাজমিন। এরপর পরিবারের সদস্যরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে সে বান্ধবীদের বাসায় থাকার কথা জানায়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তার অবস্থান ও চলাফেরা নিয়ে অসংগতি দেখা দেয়।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে আসে, ৪ অক্টোবর কুমিল্লা থেকে বের হওয়ার পর তাজমিন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যায়। পরদিন কুমিল্লায় ফিরে আবার কক্সবাজারে যাওয়ার তথ্যও পাওয়া যায়। তবে এসব যাত্রায় কারা তার সঙ্গে ছিল, কোথায় কী ঘটেছিল এবং কীভাবে সে শেষ পর্যন্ত লালমাইয়ের নির্জন এলাকায় পৌঁছায়, তা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পুলিশের বরাত দিয়ে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তাজমিন ৭ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে রওনা হয়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকার নূরজাহান হোটেলের সামনে তাকে নামতে দেখা যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এরপর তার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
এই সময়ের পর থেকে তাজমিনের অবস্থান, তার সঙ্গে কারা যোগাযোগ করেছিল এবং কীভাবে সে জগতপুর এলাকার ধানক্ষেতে পৌঁছাল; এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে ওঠে তার বাবার মোবাইলে পাঠানো শেষ বার্তা ও লাইভ লোকেশন। তাজমিনের বাবা জানিয়েছেন, রাত আনুমানিক পৌনে ২টার দিকে মেয়ের কাছ থেকে বার্তা ও লাইভ লোকেশন আসে। সেখানে তাকে এসে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু তখন তিনি ঘুমিয়ে থাকায় সঙ্গে সঙ্গে বার্তাটি দেখতে পারেননি।
সকালে বার্তা দেখে লাইভ লোকেশন অনুসরণ করে মেয়েকে খুঁজতে গিয়ে তিনি তার মরদেহ উদ্ধারের খবর পান বলে গণমাধ্যমকে জানান।
তাজমিনের বাবার কাছে পাঠানো শেষ বার্তাটি এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বার্তাটির ভাষা হিসেবে উঠে এসেছে, ‘বাবা, আমাকে নিয়ে যাও’।
এই বার্তা থেকে বোঝা যায়, ঘটনার আগের রাতে তাজমিন বাবার সাহায্য চেয়েছিল। তবে সে তখন ঠিক কোথায় ছিল, কী পরিস্থিতিতে ছিল এবং কারও কাছ থেকে বিপদের মুখে পড়েছিল কি না; শুধু বার্তার ভিত্তিতে এসব বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
তার পাঠানো লাইভ লোকেশন, মোবাইলের যোগাযোগের তথ্য এবং সম্ভাব্য যাত্রাপথ বিশ্লেষণ করে পুলিশ ঘটনার সময়ক্রম পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। এ কারণে মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করা তদন্তের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
বৃহস্পতিবার সকালে লালমাই উপজেলার পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগতপুর উত্তরপাড়ার মানুমুড়া জঙ্গলসংলগ্ন এলাকায় মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাস্থল ঘিরে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়।
স্বাধীনভাবে ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রতিবেদন করা গণমাধ্যমের বর্ণনা অনুযায়ী, জগতপুর গ্রামের ভেতর দিয়ে যাওয়া নির্জন পাকা সড়কের দুই পাশে বিস্তৃত সবুজ মাঠ। সড়কের আশপাশের অন্তত চার থেকে পাঁচটি ধানক্ষেতে ধানগাছ মাড়ানো ও এলোমেলো অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। এসব চিহ্ন দেখে সেখানে দৌড়াদৌড়ি ও ধস্তাধস্তি হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
ধানক্ষেতের এক পাশে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা পড়ে ছিল। স্থানীয়রা সেটিকে রাস্তার ওপর তুলে আনেন। অটোরিকশাটির কাছাকাছি, আনুমানিক ২০ থেকে ৩০ গজ দূরে একটি ভ্যানিটি ব্যাগ পড়ে থাকার কথাও স্থানীয়দের বর্ণনায় উঠে এসেছে।
সেখান থেকে ধানক্ষেতের মাড়ানো অংশ ধরে সামনে এগিয়ে একটি ক্ষেতের মধ্যে তাজমিনের মরদেহ দেখতে পান স্থানীয়রা। মরদেহটি কাদামাটিতে ঢাকা ছিল এবং গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। উদ্ধারের সময় তার শরীরে পোশাক ছিল না বলে পুলিশ ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মরদেহ দেখতে পেয়ে স্থানীয়রা জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে এবং পাশে থাকা সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি জব্দ করে।
ধানক্ষেতের চিহ্নগুলো থেকে তাজমিন নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করে থাকতে পারে বলে স্থানীয়দের ধারণা। তবে ঠিক কী ঘটেছিল, কতজন সেখানে উপস্থিত ছিল কিংবা ধস্তাধস্তির চিহ্নের সঙ্গে কারা জড়িত; এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য তদন্ত ও ফরেনসিক আলামত বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
ঘটনাস্থলের পাশে পড়ে থাকা সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি শুরু থেকেই তদন্তকারীদের নজরে আসে। পুলিশ সেটি জব্দ করে এবং নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য ধরে অনুসন্ধান শুরু করে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অটোরিকশাটির ভেতর থেকে একটি ভ্যানিটি ব্যাগ ও পোশাকের অংশবিশেষ পাওয়ার কথা জানা যায়। তাজমিনের বাবা পোশাক দেখে সেটি মেয়ের বলে শনাক্ত করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা প্রশ্ন তুলেছেন, অটোরিকশাটি সেখানে কীভাবে এল এবং সেটি কারা ফেলে রেখে গেছে। তবে অটোরিকশাটি অপরাধে কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, কে সেটি চালাচ্ছিল এবং ঘটনাস্থলে সেটি ফেলে যাওয়ার কারণ কী; এসব এখনো তদন্তসাপেক্ষ।
ঘটনাস্থলে মরদেহের গলায় গামছা প্যাঁচানো অবস্থায় পাওয়া যায়। কুমিল্লার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সদর দক্ষিণ সার্কেল) মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস প্রাথমিকভাবে জানান, মরদেহে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি; তবে গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। এ অবস্থায় শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও ঘটনার বিস্তারিত জানতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণকে চূড়ান্ত চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
ময়নাতদন্ত শেষে বৃহস্পতিবার কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়।
ঘটনার দিন রাতে তাজমিনের বাবা আব্দুল আলীম বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। এরপর পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন, সিএনজি অটোরিকশা জব্দ, আলামত সংগ্রহ এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তদন্ত শুরু করে।
তদন্তের শুরুতে অটোরিকশার সূত্র ধরে চালকের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করা হয়। একই সঙ্গে তাজমিনের নিখোঁজ হওয়ার সময় থেকে মরদেহ উদ্ধারের আগ পর্যন্ত তার চলাফেরা ও যোগাযোগের তথ্য যাচাই করা হয়।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়, প্রযুক্তির সহায়তা ও বিভিন্ন সূত্রের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে প্রধান অভিযুক্ত সুমনকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করেছে কুমিল্লা জেলা পুলিশ।
পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বলে হয়েছে।
সুমনের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত এখনো চলমান। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ জানতে চাইছে তাজমিনের সঙ্গে তার কীভাবে যোগাযোগ বা পরিচয় হয়েছিল। ঘটনার দিন ও রাতে তাজমিনের সঙ্গে কী ঘটেছিল। হত্যাকাণ্ডে অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না। সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি কীভাবে ঘটনাস্থলে এল। তাজমিনের মোবাইল ফোনটি কোথায় এবং সেটি কার কাছে রয়েছে। কী উদ্দেশ্যে তাকে হত্যা করা হয়েছে।
সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, তাজমিনের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। অথচ বাবার কাছে পাঠানো শেষ বার্তা ও লাইভ লোকেশনের কারণে ফোনটি মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলামত।
ফোনটি উদ্ধার করা গেলে তার অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য, যোগাযোগের রেকর্ড এবং ঘটনার আগে কার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল; এসব বিষয়ে তদন্তে সহায়ক তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তবে ফোনে কী তথ্য রয়েছে এবং সেগুলো থেকে কী প্রমাণ পাওয়া যাবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। পুলিশ জানিয়েছে, ফোনটি উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তাজমিনের মরদেহ ময়নাতদন্তের পর বৃহস্পতিবার স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে পরিবারের সদস্যরা মরদেহ নিয়ে যশোরের উদ্দেশে রওনা হন এবং ছাতিয়ানতলা গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।