প্রকাশিত : ০৯ অক্টোবর, ২০২৬ ২০:১২ (শনিবার)
কালোবাজারির শিকড় উপড়ে ফেলতে চাই শিক্ষা ও জনসচেতনতা

ছবি: সংগৃহীত

ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি বন্ধে সিলেট জেলা প্রশাসনের নতুন উদ্যোগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। আগামী ১২ অক্টোবর থেকে ট্রেনের টিকিটের সঙ্গে যাত্রীর জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) নাম ও পরিচয় যাচাই বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। টিকিটের নামের সঙ্গে পরিচয়পত্রের তথ্যের অমিল পাওয়া গেলে যাত্রা বাতিল এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণাও এসেছে। সাধারণ যাত্রীদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি বিবেচনায় এ উদ্যোগকে স্বাগত জানানোর যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়- কালোবাজারির উৎস বন্ধ না করে, যাত্রীদের সচেতন না করে এবং টিকিট কেনাবেচার নিয়ম সম্পর্কে প্রয়োজনীয় শিক্ষা না দিয়ে শুধু অভিযান চালিয়ে কালোবাজারি নির্মূল করা সম্ভব কি?

বাস্তবতা হলো, কালোবাজারি শুধু আইন প্রয়োগের ব্যর্থতা নয়; এর সঙ্গে মানুষের সচেতনতা, ভোক্তা-অধিকার সম্পর্কে জ্ঞান, অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার মানসিকতা এবং সেবাব্যবস্থার স্বচ্ছতার প্রশ্নও জড়িত। তাই ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি রোধে অভিযান ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি শিক্ষা এবং জনসচেতনতাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

সিলেট থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রামগামী ট্রেনের টিকিট ছাড়ার কয়েক মিনিটের মধ্যে শেষ হয়ে যাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। যাত্রীদের অভিযোগ, অনলাইনে কিংবা কাউন্টারে টিকিট না পেয়ে অনেকে বাধ্য হয়ে কালোবাজারিদের কাছ থেকে বেশি দামে টিকিট কেনেন।

এখানে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, প্রকৃত চাহিদার তুলনায় আসনসংখ্যা কম হলে টিকিটের সংকট তৈরি হতে পারে। দ্বিতীয়ত, এই সংকটকে কাজে লাগিয়ে কোনো অসাধু ব্যক্তি বা চক্র অবৈধভাবে টিকিট সংগ্রহ করে বেশি দামে বিক্রি করছে কি না, তা তদন্ত করে দেখতে হবে।

কিন্তু যাত্রীরা যদি না জানেন কীভাবে বৈধ উপায়ে টিকিট কিনতে হয়, টিকিট না পেলে কোথায় অভিযোগ করতে হয় কিংবা অতিরিক্ত দামে টিকিট কেনার পরিণতি কী হতে পারে, তাহলে তাঁরা সহজেই প্রতারণার শিকার হতে পারেন। আবার কেউ কেউ পরিস্থিতির চাপে জেনেশুনেও কালোবাজারিদের কাছ থেকে টিকিট কিনতে পারেন।

এই বাস্তবতায় জনসচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। মানুষকে বোঝাতে হবে, কালোবাজারির কাছ থেকে টিকিট কেনা তাৎক্ষণিকভাবে যাত্রার সুযোগ তৈরি করলেও এটি অবৈধ বাজারকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করতে পারে। চাহিদা থাকলেই কালোবাজারি লাভবান হয়। তাই বৈধ বিকল্প সম্পর্কে জানানো এবং অভিযোগ করার সুযোগ সহজ করা জরুরি।

টিকিট কালোবাজারি প্রতিরোধে শিক্ষার ভূমিকা বলতে শুধু অনলাইনে টিকিট কাটার পদ্ধতি শেখানো বোঝায় না। এর সঙ্গে নাগরিক দায়িত্ববোধ, আইন মানার অভ্যাস, নৈতিকতা এবং অন্যের অধিকারকে সম্মান করার শিক্ষা জড়িত।

একজন যাত্রী যখন জানবেন যে অন্যের জন্য বরাদ্দ বা নির্ধারিত নিয়মের বাইরে টিকিট সংগ্রহ করে অতিরিক্ত দামে বিক্রি করা সাধারণ মানুষের যাতায়াতের সুযোগ সংকুচিত করতে পারে, তখন তিনি এ ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে সচেতন হওয়ার সুযোগ পাবেন। একইভাবে, টিকিট বিক্রির কোনো পর্যায়ে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদেরও সততা, পেশাগত নৈতিকতা ও জবাবদিহির বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন।

স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং নাগরিক সংগঠনগুলো এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। নাগরিক শিক্ষা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমে সরকারি সেবা গ্রহণের নিয়ম, ভোক্তা-অধিকার, প্রতারণা শনাক্ত করা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

তরুণদের বিশেষভাবে সম্পৃক্ত করা জরুরি। কারণ, অনলাইন টিকিট ব্যবস্থার সঙ্গে তরুণদের পরিচিতি তুলনামূলক বেশি হতে পারে। তাঁরা নিজেরা সচেতন হওয়ার পাশাপাশি পরিবার, প্রতিবেশী ও বয়স্ক যাত্রীদেরও বৈধ উপায়ে টিকিট সংগ্রহে সহায়তা করতে পারেন।

সিলেট রেলওয়ে স্টেশনসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনগুলোতে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে। তবে তা যেন শুধু ব্যানার টাঙানো বা মাইকিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে।

প্রথমত, টিকিট বিক্রি শুরুর আগে এবং যাত্রীদের বেশি চাপের সময়ে স্টেশন, গণপরিবহনকেন্দ্র ও জনসমাগমস্থলে প্রচার চালাতে হবে। কীভাবে বৈধ টিকিট সংগ্রহ করতে হবে, টিকিটের সঙ্গে পরিচয়পত্রের তথ্য কেন মিলতে হবে এবং অন্যের নামে টিকিট কেনার ঝুঁকি কী- এসব সহজ ভাষায় বোঝাতে হবে।

দ্বিতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত তথ্যভিত্তিক প্রচারণা চালানো প্রয়োজন। ছোট ভিডিও, সচিত্র নির্দেশনা ও প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে টিকিট কেনার নিয়ম, প্রতারণা শনাক্ত করার উপায় এবং অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি তুলে ধরা যেতে পারে। যেসব মানুষ প্রযুক্তি ব্যবহারে স্বচ্ছন্দ নন, তাঁদের জন্য স্টেশনে সহায়তা ডেস্ক রাখা যেতে পারে।

তৃতীয়ত, যাত্রীদের জানাতে হবে- টিকিট না পেলে কী করবেন, কালোবাজারির প্রস্তাব পেলে কোথায় জানাবেন এবং অভিযোগ করার সময় কী ধরনের তথ্য বা প্রমাণ সংরক্ষণ করবেন। কার্যকর হটলাইন বা অভিযোগকেন্দ্র থাকলে তার নম্বর দৃশ্যমান স্থানে প্রকাশ করতে হবে। অভিযোগের পর ব্যবস্থা নেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে তা জানানোও জরুরি।

চতুর্থত, গণমাধ্যমকে নিয়মিতভাবে টিকিট বিক্রির নিয়ম, যাত্রীদের অধিকার এবং কালোবাজারির বিরুদ্ধে নেওয়া আইনগত পদক্ষেপ তুলে ধরতে হবে। তবে শুধু অভিযান বা গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশ করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। কীভাবে প্রতারণা এড়ানো যায় এবং বৈধ উপায়ে টিকিট পাওয়া সম্ভব—সেই তথ্যও মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

পঞ্চমত, জেলা প্রশাসন, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে ধারাবাহিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি নিতে হবে। এক দিনের অভিযান দিয়ে সাময়িক বার্তা দেওয়া সম্ভব, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের জন্য ধারাবাহিক উদ্যোগ প্রয়োজন।

সিলেট রেলওয়ে স্টেশনে অভিযানের সময় একাধিক যাত্রীর টিকিটের নামের সঙ্গে এনআইডির তথ্যের অমিল পাওয়ার কথা জানানো হয়েছে। এ ধরনের অনিয়ম যাচাই করা জরুরি। তবে নামের অমিল পাওয়া গেলেই প্রতিটি ক্ষেত্রে কালোবাজারির প্রমাণ পাওয়া গেছে- এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। বানানগত পার্থক্য, তথ্যগত ভুল বা অন্য কোনো যৌক্তিক কারণ রয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে প্রশ্ন করতে হবে, যাঁরা অবৈধভাবে টিকিট সংগ্রহ করছেন, তাঁদের শনাক্ত করার ব্যবস্থা কোথায়? অনলাইনে টিকিট বিক্রির তথ্য বিশ্লেষণ, অস্বাভাবিক বুকিং শনাক্ত করা, কাউন্টার ও অনলাইন বিক্রির রেকর্ড নিরীক্ষা এবং সন্দেহজনক লেনদেনের তদন্ত ছাড়া শুধু যাত্রীর পরিচয় যাচাই করে পুরো চক্র নির্মূল করা কঠিন।

এ ক্ষেত্রে শিক্ষা ও জনসচেতনতা আইন প্রয়োগের বিকল্প নয়; বরং আইন প্রয়োগকে কার্যকর করার সহায়ক শক্তি। যাত্রীরা নিয়ম জানলে অনিয়মের ফাঁদে পড়ার আশঙ্কা কমবে। তাঁরা অভিযোগ করতে উৎসাহিত হবেন এবং অনৈতিকভাবে টিকিট কেনাবেচার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাও কমতে পারে।

তবে কালোবাজারির মূল হোতাদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। সাধারণ যাত্রীকে সচেতন করার পাশাপাশি টিকিট বিক্রির পুরো ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

টিকিট কালোবাজারি বন্ধে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হবে প্রতিরোধ, সচেতনতা ও আইন প্রয়োগের সমন্বয়। মানুষকে বৈধ উপায়ে টিকিট কেনার সুযোগ দিতে হবে, নিয়মগুলো সহজ ভাষায় জানাতে হবে এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার নিরাপদ ও কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

একই সঙ্গে রেলওয়ের টিকিট বিক্রির প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। কোন ট্রেনে কতটি আসন রয়েছে, কখন টিকিট বিক্রি শুরু হচ্ছে, কতটি টিকিট বিক্রি হয়েছে এবং বাতিল হওয়া টিকিট কীভাবে পুনরায় বিক্রি হচ্ছে- এসব তথ্যের যথাযথ ব্যবস্থাপনা অনিয়ম শনাক্ত করতে সহায়তা করবে।

কালোবাজারির বিরুদ্ধে অভিযান চলবে, অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি হবে। কিন্তু পাশাপাশি মানুষকে বুঝতে হবে, অবৈধভাবে টিকিট কেনাবেচা কোনো স্বাভাবিক বাণিজ্য নয়; এটি অন্য যাত্রীর ন্যায্য সুযোগ কেড়ে নিতে পারে। এই বোধ তৈরি না হলে এক চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পর আরেক চক্র গড়ে ওঠার ঝুঁকি থেকেই যাবে।

সিলেট জেলা প্রশাসনের পরিচয় যাচাইয়ের উদ্যোগ বাস্তবায়নের পাশাপাশি এখন প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি জনসচেতনতা কর্মসূচি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে রেলস্টেশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে গণমাধ্যম- সব জায়গায় বৈধ টিকিট কেনা, যাত্রীর অধিকার এবং কালোবাজারির ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।

কালোবাজারির পথ বন্ধ করতে হবে টিকিট বিক্রির ব্যবস্থায়, আর কালোবাজারির সামাজিক ভিত্তি দুর্বল করতে হবে শিক্ষা ও জনসচেতনতার মাধ্যমে। শুধু অভিযান চালিয়ে অনিয়মের দৃশ্যমান অংশ নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে; কিন্তু মানুষের আচরণ, অনিয়মের সুযোগ এবং জবাবদিহির ঘাটতি পরিবর্তন করতে না পারলে স্থায়ী সমাধান কঠিন।

ট্রেনের টিকিট কোনো অসাধু চক্রের মুনাফার পণ্য নয়। এটি সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় যাতায়াতসেবার অংশ। তাই এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে যাত্রী বৈধ উপায়ে সহজে টিকিট পাবেন, প্রতারণার শিকার হলে প্রতিকার পাবেন এবং কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর কাছে জিম্মি হতে হবে না। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রশাসনের কঠোরতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন শিক্ষিত, সচেতন ও দায়িত্বশীল নাগরিক সমাজ।