ছবি: সংগৃহীত
শিউলিঝরা ভোর, শিশিরভেজা ঘাস আর নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা; প্রকৃতির এমন স্নিগ্ধ আয়োজন যেন নীরবে ঘোষণা করছে দেবীপক্ষের আগমন। শরতের স্নিগ্ধ আলোয় আজ ভক্তহৃদয়ে ধ্বনিত হবে চণ্ডীপাঠের অমৃত বাণী, বাতাসে ভেসে আসবে ‘রূপং দেহি, জয়ং দেহি, যশো দেহি, দ্বিষো জহি’ মন্ত্রের অনুরণন। আজ মহালয়া। অশুভের বিনাশ আর শুভশক্তির জাগরণের বার্তা নিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রাণে প্রাণে শুরু হবে শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রতীক্ষার নতুন অধ্যায়।
মহালয়া কেবল একটি তিথির নাম নয়; এটি বিশ্বাস, ঐতিহ্য, স্মৃতি ও মাতৃবন্দনার এক আবেগঘন সন্ধিক্ষণ। পুরাণের বর্ণনায়, দেবতাদের সম্মিলিত শক্তির প্রতীক মহিষাসুরমর্দিনী দেবী দুর্গার আবির্ভাব অশুভ শক্তির বিনাশ এবং ন্যায় ও সত্যের প্রতিষ্ঠার বার্তা বহন করে। তাই মহালয়ার প্রভাত থেকেই ভক্তদের মনে জেগে ওঠে দেবী বন্দনার আকুলতা। দূর কৈলাস থেকে মর্ত্যে মায়ের আগমনের প্রতীক্ষায় যেন প্রকৃতিও ধারণ করে নতুন সাজ।
মহালয়ার ভোর মানেই চণ্ডীপাঠ, স্তোত্র আর আগমনী গানের মায়াবী আবহ। অন্ধকার ভেদ করে যখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করে, তখন বেতার ও বিভিন্ন মাধ্যমে ভেসে আসে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ অনুষ্ঠানের চিরচেনা সুর। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের গম্ভীর কণ্ঠে চণ্ডীপাঠ এবং সুরেলা আগমনী সংগীত বাঙালির হৃদয়ে যুগ যুগ ধরে জাগিয়ে রেখেছে দুর্গোৎসবের আবেগ।
‘যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা’; এই মন্ত্রোচ্চারণে দেবীকে স্মরণ করা হয় জগতের প্রতিটি প্রাণে বিরাজমান মাতৃশক্তির প্রতীক হিসেবে। ধূপের সুগন্ধ, শঙ্খধ্বনি আর ভক্তির নিবেদনে মন্দিরে মন্দিরে শুরু হয় দেবীর আবাহনের প্রস্তুতি। মহালয়ার এই পবিত্র প্রভাত যেন মানুষের মনে নতুন করে জাগিয়ে তোলে সাহস, আশা ও কল্যাণের প্রত্যয়।
মহালয়ার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পিতৃপুরুষদের স্মরণ ও তর্পণের প্রাচীন ধর্মীয় ঐতিহ্য। হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এদিন প্রয়াত পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তি কামনায় তাঁদের উদ্দেশে জল ও তিল নিবেদন করা হয়। অনেকেই নদী, জলাশয় কিংবা নির্ধারিত স্থানে তর্পণ করে পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
জীবনের ব্যস্ততায় হারিয়ে যাওয়া শেকড়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনেরও যেন এক প্রতীক এই আচার। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা স্মৃতি, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার বন্ধন মহালয়ার দিনে নতুন করে অনুভূত হয়। দেবীপক্ষের সূচনায় তাই আনন্দের পাশাপাশি থাকে শ্রদ্ধা, স্মরণ ও আত্মিক নিবেদনের আবহ।
মহালয়াকে ঘিরে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মন্দির ও পূজামণ্ডপে নেওয়া হয়েছে নানা আয়োজন। ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির, স্বামীবাগের শ্রীশ্রী লোকনাথ আশ্রম ও মন্দিরসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে চণ্ডীপাঠ, দেবীর আবাহন, সংগীতানুষ্ঠান ও প্রসাদ বিতরণের মতো কর্মসূচি পালিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, প্রতিমাশিল্পীদের তুলিতে দেবীর মুখমণ্ডলে ফুটে উঠছে শান্তি, মমতা ও শক্তির অপূর্ব সম্মিলন। কোথাও চলছে মণ্ডপসজ্জার শেষ মুহূর্তের কাজ, কোথাও প্রস্তুত হচ্ছে আলোকসজ্জা। ঢাকিরাও অপেক্ষায় রয়েছেন সেই মাহেন্দ্রক্ষণের, যখন ঢাকের তালে মুখর হয়ে উঠবে পূজামণ্ডপের আঙিনা।
প্রচলিত পূজার সূচি অনুযায়ী, মহালয়ার পরবর্তী সময়ে বোধন ও অন্যান্য আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা এগিয়ে যায়। ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল শারদীয় দুর্গাপূজার আয়োজন।
দেবী দুর্গা বাঙালির কাছে কেবল পুরাণের এক মহাশক্তির প্রতীক নন; তিনি মমতা, সাহস, আত্মবিশ্বাস ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রেরণা। মহিষাসুরের বিরুদ্ধে তাঁর বিজয়ের কাহিনি যুগে যুগে মানুষকে শিখিয়েছে, অশুভ যত প্রবলই হোক, শুভশক্তির সম্মিলিত জাগরণে তার পরাজয় অনিবার্য।
শরতের স্নিগ্ধ সকালে তাই মহালয়া নিয়ে আসে নতুন প্রত্যাশার বার্তা। শিউলির শুভ্রতা, কাশফুলের দোলা আর আগমনী সুরের আবেশে মানুষের মন প্রস্তুত হয় আনন্দের উৎসবের জন্য। অপেক্ষা তখন কেবল মায়ের আগমনের; ঢাকের বাদ্য, শঙ্খের ধ্বনি আর প্রদীপের আলোয় যিনি ভক্তের হৃদয়ে জাগিয়ে তুলবেন শক্তি ও আশার নতুন দীপশিখা।
মহালয়ার এই প্রভাতে তাই চারদিকে যেন একটাই আহ্বান; জাগো দুর্গা, জাগো মহাশক্তি; অন্ধকার পেরিয়ে আলো আসুক, অশুভের অবসানে প্রতিষ্ঠিত হোক শুভ ও সুন্দর।
সিলেটে মহালয়ার যত আয়োজন
সিলেটে মহালয়া উপলক্ষে মিরাবাজারস্থ বলরাম আখড়ায় সকাল সাড়ে ৮ টায় মহালয়া উদযাপন পরিষদ শ্রীহট্টের সহ সম্পাদক বিশ^জিৎ চক্রবর্ত্তী সুমনের পরিচালনায় শ্রীশ্রী চণ্ডী মায়ের পূজা ও শ্রীমা সারদা সংঘ সিলেটের সম্পাদিকা বর্ণালী পুরকায়স্থের পরিচালনায় সমবেত চণ্ডীপাঠ। সকাল ১০টায় নৃত্য প্রতিযোগিতা উপকমিটির আহবায়ক মৃনাল কান্তি চৌধুরী মঞ্জুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সিলেটের সহকারী ভারতীয় হাইকমিশনার অনিরুদ্ধ দাস। শ্রীমা সারদা সংঘ সিলেটের সাংস্কৃতিক সম্পাদক হেপী দেব শিল্পীর পরিচালনায় ও প্রশিক্ষণার্থী শিশু-কিশোরবৃন্দের পরিবেশনায় দুপুর ২ টায় ধর্মীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
মহালয়া উদযাপন পরিষদ শ্রীহট্ট ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের সভাপতি এ্যাপেক্সিয়ান জি.ডি. রুমুর সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক দ্বীপক কুমার দাশ এর সঞ্চালনায় সন্ধ্যা ৬টায় ধর্মসভা, পুরস্কার বিতরণী ও ‘অরুণ আলোর অঞ্জলি’ মোড়ক উন্মোচন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এমপি। সম্মানিত অতিথি ও মূখ্য আলোচক হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সিলেট রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রমের সম্পাদক শ্রীমৎ স্বামী চন্দ্রনাথানন্দজী মহারাজ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সিলেটের বিশিষ্ট সমাজসেবী জ্যোতির্ময় সিংহ মজুমদার চন্দন, সিলেট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এডভোকেট অশোক পুরকায়স্থ, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ সিলেট জেলা শাখার সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা গোপিকা শ্যাম পুরকায়স্থ চয়ন, সহ সভাপতি অধ্যাপক রজত কান্তি ভট্টাচার্য্য, সাধারণ সম্পাদক এ্যাপেক্সিয়ান চন্দন দাশ, পরিষদের প্রধান সমন্বয়ক অব. উপাধ্যক্ষ কৃষ্ণপদ সূত্রধর প্রমুখ।
রাত ৮টায় দরিদ্র অসহায়দের মধ্যে বস্ত্রদান উপকমিটির আহবায়ক হারাধন দেব প্রভাষের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি মোঃ নাসিম হোসাইন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ সিলেট মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ কুমার দেব, সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সিনিয়র আইনজীবী প্রশান্ত কুমার পাল, শ্রীশ্রী ঁবলরাম জিউর আখড়া পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক তপন চৌধুরী টুটুল প্রমুখ।
বার্ষিক মহালয়া উৎসবে বৃহত্তর সিলেটের দল মত নির্বিশেষে মহামায়ার সকল ভক্ত সজ্জনদের উপস্থিতি ও সার্বিক সহযোগিতা একান্তভাবে কামনা করা হয়েছে।