প্রকাশিত : ১১ অক্টোবর, ২০২৬ ১৮:৫৮ (সোমবার)
ধর্ষণ মামলায় ব্যতিক্রমী রায়, সন্তানের ভরণপোষণ দেবে সরকার

ছবি: সংগৃহীত

রাজবাড়ীর পাংশায় বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে এক নারীকে ধর্ষণের মামলায় ফারুক হোসেন (৪০) নামে এক ব্যক্তিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাঁকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানার অর্থ ভুক্তভোগী নারীকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এ ছাড়া ওই নারীর গর্ভে জন্ম নেওয়া সন্তানের বয়স ২১ বছর পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত তার ভরণপোষণের ব্যয় রাষ্ট্র বহন করবে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

রোববার (১১ অক্টোবর) রাজবাড়ীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও জেলা ও দায়রা জজ মো. তহিদুল ইসলাম এ রায় দেন। দণ্ডপ্রাপ্ত ফারুক হোসেন পাংশা উপজেলার নিশ্চিন্তপুর গ্রামের আহম্মদ খার ছেলে। জামিনে মুক্ত হওয়ার পর থেকে তিনি পলাতক রয়েছেন।

আদালতের রায় সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী রেখা খাতুন একজন তালাকপ্রাপ্ত নারী। পাশাপাশি বাড়ি হওয়ায় ফারুক হোসেন তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন। ২০১৮ সালের ৩০ মে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁকে খোকসা রেলস্টেশনসংলগ্ন নিজের এক আত্মীয়ের বাসায় নিয়ে যান ফারুক। সেখানে তাঁকে ধর্ষণ করা হয় বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়। পরে প্রায় দুই মাস ওই বাসায় এবং পরবর্তী সময়ে ঢাকার একটি বাসায় রেখে বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে তাঁর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন ফারুক।

একপর্যায়ে রেখা খাতুন অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। বিয়ের কাগজপত্র চাইলে ফারুক বিয়ের বিষয়টি অস্বীকার করেন এবং তাঁকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

২০১৮ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সেখান থেকে কৌশলে বের হয়ে বাড়িতে ফিরে আসেন রেখা। পরে স্থানীয়ভাবে সালিশ হলেও থানায় মামলা করতে গিয়ে ব্যর্থ হন তিনি। এরপর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে নালিশি দরখাস্ত দাখিল করেন। আদালতের নির্দেশে পাংশা থানায় মামলাটি এজাহার হিসেবে রেকর্ড করা হয়।

মামলার তদন্তে মেডিকেল পরীক্ষার মাধ্যমে রেখা খাতুনের অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়। পরে তিনি রাফিউল হোসেন নামে একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। তদন্ত শেষে ফারুক হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।

রায়ে আদালত ধর্ষণের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় ফারুক হোসেনকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেন। অর্থদণ্ড অনাদায়ে তাঁকে আরও এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।

আদালত রায়ে উল্লেখ করেন, অর্থদণ্ডের টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে ভুক্তভোগী নারীকে দেওয়া হবে। দণ্ডিত ব্যক্তির বর্তমান সম্পদ থেকে ওই অর্থ আদায় করা সম্ভব না হলে ভবিষ্যতে অর্জিত সম্পদ থেকে তা আদায় করা যাবে।

এ ছাড়া রায়ে রাফিউল হোসেনকে ফারুক হোসেনের জৈবিক সন্তান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে বাবার কাছ থেকে প্রাপ্য সব আইনগত অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। সন্তানের বয়স ২১ বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তার ভরণপোষণের ব্যয় রাষ্ট্র বহন করবে। পরে সরকার দণ্ডিত ব্যক্তির কাছ থেকে ওই অর্থ আদায় করতে পারবে। সন্তানের ভরণপোষণের অর্থ নির্ধারণ ও তা বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে রাজবাড়ীর জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

রায়ে আরও বলা হয়েছে, আসামি গ্রেপ্তার হলে বা আত্মসমর্পণ করলে তাঁর বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা কার্যকর করা হবে।

মামলার আইনজীবী জাহিদ উদ্দিন মোল্লা জানান, ফারুক হোসেনকে আদালত যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দিয়েছেন। জরিমানার অর্থ ভুক্তভোগী নারীকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সন্তানের বয়স ২১ বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তার ভরণপোষণের ব্যয় রাষ্ট্র বহন করবে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। রায়ে বাদীপক্ষ সন্তুষ্ট।