প্রকাশিত : ১১ অক্টোবর, ২০২৬ ২০:২৮ (সোমবার)

তালতো ভাইয়ের সংজ্ঞা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ থাকতে পারে। কেউ বলেন, শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়তার জটিল সমীকরণে যাঁর আবির্ভাব, তিনিই তালতো ভাই। আবার কোনো কোনো অঞ্চলে ভাবির ভাইকেও তালতো ভাই বলা হয়। আত্মীয়তার এই সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, নিজের সরাসরি দায় না থাকলেও আত্মীয়তার খাতিরে সুবিধা নেওয়ার একটা সুযোগ থাকে। কেউ উন্নতি করলে আরেকজনের বুক ফুলে ওঠে, কেউ সম্পদশালী হলে অন্যজনও আত্মীয়তার গৌরবে গর্বিত হন।

বাংলাদেশের উন্নয়ন আর দুর্নীতির সম্পর্কটাও অনেকটা সে রকম। একজনের নাম উন্নয়ন, অন্যজনের নাম দুর্নীতি। দুজনের কাজ আলাদা, পরিচয় আলাদা, নীতিকথাও আলাদা। কিন্তু একসঙ্গে চলতে তাদের খুব একটা অসুবিধা হয় না। বরং কখনো কখনো মনে হয়, একজন ছাড়া অন্যজনের পথচলাই অসম্পূর্ণ!

উন্নয়ন বলে, ‘আমি রাস্তা বানাই, সেতু বানাই, ফ্লাইওভার বানাই, মেট্রোরেল বানাই। মানুষের জীবন সহজ করি।’

দুর্নীতি মুচকি হেসে বলে, ‘আর আমি সেই রাস্তার ব্যয় বাড়াই, সেতুর হিসাব ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দিই, প্রকল্পের মেয়াদ বাড়াই, ঠিকাদারের সঙ্গে বোঝাপড়া করি। তোমার কাজের মধ্যে আমারও একটু কাজ থাকে।’

উন্নয়ন তখন গম্ভীর মুখে বলে, ‘এসব কী বলছ! আমি তো মানুষের জন্য কাজ করি।’

দুর্নীতি জবাব দেয়, ‘তা তো করোই। তবে মানুষের জন্য বরাদ্দ টাকার কিছু অংশ যদি আমার আত্মীয়স্বজনের হাতে যায়, তাতে তোমার আপত্তি কোথায়? শেষ পর্যন্ত তো প্রকল্পের একটা ফলক থাকবে, ফিতা কাটা হবে, ছবি উঠবে। মানুষ অন্তত বুঝবে, কিছু একটা হয়েছে।’

উন্নয়ন আর কথা বাড়ায় না। কারণ তার সামনে তখন উদ্বোধনের ব্যস্ততা। পেছনে কত টাকা গেল, কত টাকা এল, কত টাকা কার পকেটে ঢুকল—এসব হিসাব রাখার দায়িত্ব তো তার নয়! সে শুধু দৃশ্যমান হতে চায়। দুর্নীতি চায় অদৃশ্য থাকতে। দুজনের কাজের ধরন আলাদা হলেও লক্ষ্য পূরণে বেশ মিল।

আমাদের দেশে উন্নয়নকে ভালোবাসার লোকের অভাব নেই। দুর্নীতির বিরোধিতা করার লোকেরও অভাব নেই। মুশকিল হলো, উন্নয়নের সুবিধা নিতে গিয়ে দুর্নীতির সঙ্গে আপস করতে আমাদের অনেকেরই আপত্তি থাকে না।

একটা সেতু হয়েছে- বাহ, কী উন্নয়ন!

সেতুর নির্মাণব্যয় অস্বাভাবিক বেশি- আচ্ছা, এসব তো বড় প্রকল্পে হয়ই।

একটি রাস্তা হয়েছে- দারুণ!

এক বছর না যেতেই রাস্তার পিচ উঠে গেছে- কী আর করা, বৃষ্টি হয়েছে অনেক!

একটি ভবন উদ্বোধন হয়েছে- উন্নয়নের জোয়ার!

ভবনের নির্মাণকাজে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে- এসব বিরোধীদের অপপ্রচারও হতে পারে!

আমরা উন্নয়নের ফলক দেখি, ফিতা দেখি, উদ্বোধনের ছবি দেখি। কিন্তু সেই ফলকের পেছনে লুকিয়ে থাকা হিসাবের খাতা দেখতে চাই না। কারণ ফলক চোখে পড়ে, হিসাবের খাতা দেখতে হলে চোখ একটু কুঁচকাতে হয়। আর চোখ কুঁচকালে অনেক সময় নিজের পছন্দের মানুষের মুখও অস্পষ্ট হয়ে যায়।

দুর্নীতির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, সে একা থাকে না। তার আত্মীয় আছে, বন্ধু আছে, শুভাকাঙ্ক্ষী আছে। আছে এমন এক সামাজিক ব্যবস্থা, যেখানে কে কত সৎ, তার চেয়ে কে কত টাকা আয় করেন, সেটাই অনেক সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

পাড়ার একজন সরকারি কর্মকর্তা নতুন গাড়ি কিনেছেন। বাড়ি করেছেন। ছেলেমেয়েকে বিদেশে পড়তে পাঠিয়েছেন। আত্মীয়স্বজনের অনুষ্ঠানে বড় অঙ্কের টাকা উপহার দিচ্ছেন। সবাই তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ- ‘ভাই, কী উন্নতি করেছেন!’

কেউ জানতে চায় না, এই উন্নতির সঙ্গে তাঁর বেতনের কোনো সম্পর্ক আছে কি না। বরং যিনি সৎ পথে থেকে সীমিত আয়ে সংসার চালান, তাঁকেই কখনো কখনো শুনতে হয়, ‘জীবনে কিছু করতে পারলেন না!’

এ যেন এক অদ্ভুত সামাজিক অঙ্ক। সৎ মানুষটির সম্পদ কম বলে তাঁর যোগ্যতা কম। অসৎ মানুষটির সম্পদ বেশি বলে তাঁর বুদ্ধি বেশি। একজন নিয়ম মেনে চলেন বলে পিছিয়ে পড়েন, অন্যজন নিয়মের ফাঁকফোকর দিয়ে এগিয়ে যান বলে সফল হন।

তখন দুর্নীতি আর অপরাধ থাকে না; হয়ে ওঠে কৌশল। অবৈধ আয় হয়ে ওঠে উপরি পাওনা। আর অনিয়ম করে সম্পদ অর্জনকারী হয়ে ওঠেন পরিবারের গর্ব, সমাজের সম্মানিত ব্যক্তি, এলাকার প্রভাবশালী মানুষ।

এই সমাজে দুর্নীতিবাজের সন্তানও কখনো বাবার সম্পদ নিয়ে গর্ব করে। আত্মীয়স্বজন তাঁর বাড়িতে দাওয়াত খেয়ে বলেন, ‘আহা, কী উন্নতি করেছে!’ কেউ কেউ আবার মনে মনে হিসাব করেন, এমন একটা সুযোগ যদি তাঁদেরও হতো!

এখানেই উন্নয়ন আর দুর্নীতির আত্মীয়তার সম্পর্কটা আরও গভীর হয়। দুর্নীতি শুধু রাষ্ট্রের টাকা লুট করে না, মানুষের বিবেকেরও একটা অংশ দখল করে নেয়। একসময় মানুষ দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলার আগে হিসাব করে, অভিযুক্ত ব্যক্তিটি তাঁর কতটা আপন, কতটা প্রভাবশালী, আর তাঁর কাছ থেকে ভবিষ্যতে কী সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।

ব্যাংকের টাকা লুট হলো। হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণের নামে বেরিয়ে গেল। কোথাও হলমার্ক, কোথাও নাসা গ্রুপ, কোথাও এস আলম গ্রুপ, কোথাও ইসলামি ব্যাংকের কেলেঙ্কারি- নাম বদলায়, পদ্ধতি বদলায়, কিন্তু প্রশ্নগুলো একই থাকে। কারা টাকা নিল? কারা সহযোগিতা করল? কারা নজরদারির দায়িত্বে ছিল? আর শেষ পর্যন্ত টাকা ফেরত এল কতটুকু?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে দুর্নীতি খুব একটা স্বস্তি বোধ করে না। সে তখন উন্নয়নকে সামনে ঠেলে দেয়।

‘দেখুন, দেশে কত রাস্তা হয়েছে! কত সেতু হয়েছে! কত বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে!’

উন্নয়নও তখন বলে, ‘আমার কাজ তো আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন।’

কেউ যদি বলে, ‘কিন্তু প্রকল্পের ব্যয় এত বেশি হলো কেন? কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে কেন? দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত কোথায়?’

তখন দুজনেই একটু বিরক্ত হয়। উন্নয়ন বলে, ‘আমার ভালো কাজগুলো দেখুন।’ দুর্নীতি বলে, ‘সবকিছুতে নেতিবাচকতা খোঁজার কী আছে?’

অর্থাৎ, উন্নয়ন চাইলে দুর্নীতির হিসাব চাওয়া যাবে না- এমন এক অদ্ভুত যুক্তি আমাদের সামনে হাজির হয়। যেন উন্নয়নের সঙ্গে দুর্নীতির সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তোলাই উন্নয়নবিরোধিতা!

অথচ উন্নয়ন আর দুর্নীতি এক জিনিস নয়। উন্নয়ন মানুষের জীবনমান বাড়ায়, দুর্নীতি সেই উন্নয়নের সুফল কেড়ে নিতে পারে। উন্নয়ন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে, দুর্নীতি সেই অধিকারকে ব্যক্তিগত সুবিধায় রূপান্তরিত করে। উন্নয়ন রাষ্ট্রের সম্পদ বাড়ায়, দুর্নীতি রাষ্ট্রের সম্পদকে কিছু মানুষের ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত করে।

সবচেয়ে বিপজ্জনক দুর্নীতি সেটি, যা গরিব মানুষের প্রাপ্যটুকু কেড়ে নেয়।

একজন দরিদ্র মানুষ সরকারি সহায়তার আশায় তালিকায় নাম লেখালেন। তাঁর ঘরে খাবার নেই, সন্তানকে স্কুলে পাঠানোর খরচ নেই। অথচ সরকারি সহায়তার তালিকায় দেখা গেল, তাঁর নাম নেই। আছে এমন একজনের নাম, যাঁর পাকা বাড়ি আছে, জমি আছে, ব্যবসা আছে, রাজনৈতিক পরিচয় আছে। কেন এমন হলো?

কারণ দরিদ্র মানুষটির হয়তো সুপারিশ করার কেউ নেই। আর যিনি প্রকৃত অভাবী নন, তাঁর আছে পরিচিত লোক, প্রভাবশালী আত্মীয় কিংবা সংশ্লিষ্ট কারও সঙ্গে বোঝাপড়া করার ক্ষমতা।

এখানে দুর্নীতি শুধু টাকা চুরি করেনি; একজন মানুষের প্রাপ্য অধিকারটুকুও চুরি করেছে, তার ভবিষ্যত চুরি করেছে। যে উন্নয়ন দরিদ্র মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর কথা, সেই উন্নয়নের দরজায় দাঁড়িয়ে দুর্নীতি বলেছে, ‘আপনার নাম তালিকায় নেই। পরে আসুন।’

এই ‘পরে আসুন’ কথাটির মধ্যেই আমাদের উন্নয়ন-দুর্নীতির সম্পর্কের অনেকখানি ইতিহাস লুকিয়ে আছে।

অবশ্য উন্নয়ন আর দুর্নীতির সম্পর্ক নিয়ে কথা বললে কেউ কেউ বলেন, ‘ভাই, একটু-আধটু দুর্নীতি না হলে কাজ হয় না।’

কী চমৎকার যুক্তি! যেন দুর্নীতি ছাড়া সিমেন্ট জমে না, ইটের গাঁথুনি শক্ত হয় না, রাস্তার পিচ বসে না, সেতুর পিলার দাঁড়ায় না। দুর্নীতি বুঝি উন্নয়নের অপরিহার্য উপকরণ—সিমেন্ট, বালু, পাথরের পাশেই তার একটা নির্দিষ্ট অনুপাত থাকা দরকার!

এ যুক্তি মেনে নিলে আগামী দিনে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন একটি বিষয় খোলা যেতে পারে- ‘উন্নয়ন ও দুর্নীতির সমন্বিত প্রকৌশল’। সেখানে শেখানো হবে, কত শতাংশ কাজ করলে প্রকল্প দৃশ্যমান হবে, কত শতাংশ ব্যয় বাড়ালে সংশ্লিষ্টদের সন্তুষ্টি বজায় থাকবে, আর কত শতাংশ অনিয়ম করলে কেউ সহজে ধরতে পারবে না।

অবশ্য পরীক্ষার খাতায় সঠিক উত্তর লিখলেই হবে না; ব্যবহারিক পরীক্ষায় পাস করতে হলে একটি প্রকল্পের উদ্বোধনও সফলভাবে সম্পন্ন করতে হবে!

ব্যঙ্গের কথা বাদ দিলেও বাস্তবতা হলো, কোনো উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেই পুরো প্রকল্পকে বাতিল বলে দেওয়া যায় না। আবার একটি প্রকল্পের দৃশ্যমান সুফল আছে বলেই তার ব্যয়, স্বচ্ছতা কিংবা জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তোলা বন্ধ করা যায় না। উন্নয়ন কতটা হয়েছে, তার পাশাপাশি কত টাকায় হয়েছে, কাদের উপকারে এসেছে এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হয়েছে কি না- এসব প্রশ্নও জরুরি।

কারণ একটি রাস্তা তৈরি হওয়া উন্নয়ন, কিন্তু সেই রাস্তা নির্মাণের নামে জনগণের টাকা আত্মসাৎ করা উন্নয়ন নয়। একটি হাসপাতাল নির্মাণ উন্নয়ন, কিন্তু সেখানে চিকিৎসক, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সেবা না থাকা উন্নয়নের উদ্দেশ্যকে ব্যর্থ করতে পারে। একটি বিদ্যালয় নির্মাণ উন্নয়ন, কিন্তু দরিদ্র শিশুরা সেখানে পড়ার সুযোগ না পেলে সেই উন্নয়নের সামাজিক মূল্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।

উন্নয়নকে তাই দুর্নীতির সঙ্গে আত্মীয়তার বন্ধনে বেঁধে রাখার কোনো প্রয়োজন নেই। বরং তাদের আলাদা করে চেনা জরুরি।

কিন্তু সমস্যা হলো, আমাদের সমাজে উন্নয়ন যতটা দৃশ্যমান, দুর্নীতির বিচার ততটা দৃশ্যমান নয়, দুর্নীতির বিচার হতে-হতে দুর্নীতিবাজ মরে যায়। বড় বড় প্রকল্পের উদ্বোধন হয়, কিন্তু বড় বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির পরিণতি নিয়ে জনমনে প্রায়ই প্রশ্ন থেকে যায়। কেউ কেউ শাস্তি পান, কেউ কেউ দীর্ঘদিন বিচারের মুখোমুখি হন, আবার কারও বিরুদ্ধে অভিযোগের নিষ্পত্তি হতে হতে মানুষের আগ্রহই হারিয়ে যায়।

এ অবস্থায় সাধারণ মানুষের মনে একটি বিপজ্জনক ধারণা জন্ম নিতে পারে- দুর্নীতি করে ধরা না পড়তে পারলেই সফল হওয়া যায়। আর ধরা পড়লেও ক্ষমতা, অর্থ কিংবা প্রভাব থাকলে শেষ পর্যন্ত পথ বের করা সম্ভব।

এই ধারণা ভাঙতে হলে শুধু দুর্নীতিবিরোধী বক্তব্য দিলেই হবে না। প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, কার্যকর বিচার, লুট হওয়া অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ এবং সরকারি ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে এমন সামাজিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে অবৈধ সম্পদের প্রদর্শনী নয়, সৎ উপার্জনই সম্মানের কারণ হবে।

উন্নয়ন আর দুর্নীতির আত্মীয়তার গল্পের শেষটা তাই অন্য রকম হওয়া উচিত।

উন্নয়ন বলুক, ‘তোমার সঙ্গে আমার কোনো বিরোধ নেই, যদি তুমি নিয়ম মেনে চলো। কিন্তু আমার নাম ব্যবহার করে জনগণের টাকা লুট করলে তোমাকে আর আত্মীয় বলে পরিচয় দেব না।’

দুর্নীতি হয়তো তখনও হাসবে। বলবে, ‘দেখা যাবে। তোমার নামে যত প্রকল্প, আমারও তত পরিচিতি!’

উন্নয়ন এবার আর চুপ থাকবে না। সে বলবে, ‘আমার পরিচয় মানুষের উপকারে। তোমার পরিচয় ব্যক্তিগত লাভে। এত দিন তুমি আমার পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছ বলে আমরা এক হয়ে যাইনি।’- এই কথাটিই আজ সবচেয়ে বেশি জরুরি।

উন্নয়ন দরকার, দুর্নীতি নয়। বড় প্রকল্প দরকার, বড় লুটপাট নয়। সম্পদ সৃষ্টি দরকার, সম্পদের অন্যায্য বণ্টন নয়। আর সবচেয়ে বেশি দরকার এমন একটি সমাজ, যেখানে কারও সাফল্য দেখে মানুষ তাঁর আয়ের উৎস নিয়ে প্রশ্ন করতে লজ্জা পাবে না।

তালতো ভাই হোক আর দূরসম্পর্কের আত্মীয়- সম্পর্কের খাতিরে কাউকে অপরাধের দায় থেকে মুক্তি দেওয়া যায় না। উন্নয়ন আর দুর্নীতিও তাই আত্মীয়তার অজুহাতে একে অন্যের দায় এড়িয়ে যেতে পারে না।

উন্নয়ন যদি সত্যিই মানুষের জন্য হয়, তবে তাকে দুর্নীতির ছায়া থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে। আর দুর্নীতি যদি উন্নয়নের নাম ভাঙিয়ে সুবিধা নিতে চায়, তবে তার সেই আত্মীয়তার পরিচয় প্রকাশ করাও রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব।

নইলে একদিন দেখা যাবে, উন্নয়নের বাড়িতে বিশাল আলোকসজ্জা, উদ্বোধনের মঞ্চে অতিথিদের ভিড়, ফলকে বড় বড় অক্ষরে সাফল্যের ঘোষণা- আর পাশের ঘরে বসে দুর্নীতি হিসাব করছে, পরের প্রকল্পে তার ভাগ কত!

তখন প্রশ্ন উঠবে, উন্নয়ন আসলে কার? জনগণের, নাকি উন্নয়ন আর দুর্নীতির যৌথ পরিবারের?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু বক্তৃতায় নয়, প্রকল্পের হিসাব-নিকাশে, আদালতের রায়ে, সরকারি অর্থের ব্যবহারে এবং সাধারণ মানুষের জীবনে দৃশ্যমান হতে হবে।

কারণ উন্নয়ন যদি জনগণের অধিকার হয়, তবে দুর্নীতি সেই অধিকারের আত্মীয় নয়- প্রতিপক্ষ।