প্রকাশিত : ১২ অক্টোবর, ২০২৬ ২১:৪৯ (মঙ্গলবার)
মাটির গন্ধে দেবীবন্দনা, সংকটে লাখাইয়ের রুদ্রপালপাড়া

ছবি: ইমজা নিউজ

হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার মোড়াকরি ইউনিয়নের দক্ষিণ সীমান্তে ঐতিহ্যবাহী রুদ্রপালপাড়া। শারদীয় দুর্গাপূজা সামনে রেখে সেখানে এখন প্রতিমা তৈরির ব্যস্ততা। মাটির কাঠামোয় দেবী দুর্গা ও তাঁর পরিজনদের অবয়ব ফুটিয়ে তুলতে দিনরাত কাজ করছেন কারিগররা। পুরুষদের পাশাপাশি পরিবারের মা-বোনেরাও প্রতিমা গড়া, শুকানো, রং করা ও সাজসজ্জার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তাঁদের নিপুণ হাতের স্পর্শে পূর্ণতা পাচ্ছে দেবীবন্দনার আয়োজন। তবে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, যোগাযোগব্যবস্থার দুরবস্থা ও পরিশ্রমের তুলনায় কম পারিশ্রমিকের কারণে সংকটে পড়েছে কয়েক প্রজন্মের পুরোনো এই মৃৎশিল্প।

বলভদ্র নদীর তীরে মোড়াকরি রুদ্রপালপাড়ায় প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ বছর ধরে প্রতিমা তৈরির কাজ চলে আসছে বলে স্থানীয় কারিগরদের ভাষ্য। একসময় ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকায় এক নৌকা মাটি পাওয়া গেলেও এখন তা কিনতে গুনতে হচ্ছে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা।

মৃৎশিল্পী জুয়েল রুদ্রপাল জানান, প্রতি নৌকা ধুলামাটির দাম প্রায় ৩ হাজার টাকা, আর আঠালো মাটির দাম ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। প্রতি নৌকায় প্রায় ৩০ মণ মাটি থাকে, যা দিয়ে ৮ থেকে ১০টি প্রতিমা তৈরি করা যায়। সাধারণত ২০ হাজার টাকার প্রতিমা তৈরির চুক্তিতে অগ্রিম পাওয়া যায় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা।

এবার প্রতিমার দাম ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৩০, ৩৫, ৪০ ও ৪৫ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে। বড় ও নিখুঁত কাজের প্রতিমার দাম আরও বেশি। শিল্পী নিলিশ রুদ্রপালের তৈরি একটি প্রতিমার দাম ৮০ হাজার টাকা এবং ইন্দ্রজিত রুদ্রপালের একটি প্রতিমার দাম ৬০ হাজার টাকা।

জুয়েল রুদ্রপালের হিসাবে, ১০টি প্রতিমা আড়াই লাখ টাকায় বিক্রি হলে উপকরণের খরচ বাদে দেড় লাখ টাকা অবশিষ্ট থাকে। তবে এই অর্থই নিট লাভ নয়; এর মধ্য থেকে শ্রম, পরিবহন ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় মেটাতে হয়। ফলে বিক্রির অঙ্ক বড় হলেও প্রকৃত আয় কতটা থাকে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে কারিগরদের।

সড়ক নেই, প্রতিমা পরিবহনে ভরসা নৌকা প্রতিমা তৈরির পাশাপাশি পরিবহনব্যবস্থাও রুদ্রপালপাড়ার শিল্পীদের জন্য বড় সমস্যা। পাড়ার ভেতরে যাতায়াতের পথ সরু ও ভঙ্গুর মাটির রাস্তা। অনেক জায়গায় বসতবাড়ির ভেতর দিয়ে চলাচল করতে হয়। ফলে সরাসরি যানবাহন নিয়ে প্রতিমা আনা-নেওয়ার সুযোগ নেই। নদীপথ ও নৌকাই তাঁদের প্রধান ভরসা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার শাহবাজপুর বুড্ডা এলাকা থেকে প্রতিমা কিনতে আসা বিশ্ব চন্দ্র দাশ ও সুকেশ চন্দ্র দাশ জানান, নৌকায় যাতায়াতে তাঁদের প্রায় ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা সময় লাগে। নদীতে পানি কম থাকায় নৌকার গতি কমে যায়। এতে সময়ের পাশাপাশি বাড়ে পরিবহন ব্যয়। শুধু নৌকা ভাড়া বাবদই তাঁদের অতিরিক্ত ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা খরচ করতে হয়।

ক্রেতাদের অভিযোগ, নির্বাচনের সময় জনপ্রতিনিধিদের দেখা মিললেও পরবর্তী সময়ে এলাকার সমস্যা সমাধানে তেমন উদ্যোগ চোখে পড়ে না। তাঁদের মতে, একটি টেকসই সড়ক নির্মাণ করা হলে সরাসরি যানবাহনে প্রতিমা পরিবহন সম্ভব হতো। এতে কারিগরদের খরচ কমার পাশাপাশি রুদ্রপালপাড়া প্রতিমা তৈরির গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে আরও বিকশিত হতে পারত।

পরিশ্রমের তুলনায় ন্যায্য পারিশ্রমিক না পাওয়া এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বংশপরম্পরায় চলে আসা পেশা ছাড়ছেন অনেকেই। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রুদ্রপালপাড়ার প্রায় ৭০টি পরিবারের মধ্যে বর্তমানে ৪৫টি পরিবার মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। আয় কম হওয়ায় তরুণ প্রজন্মের অনেকে অন্য পেশায় ঝুঁকছেন।

স্থানীয় শংকর রুদ্রপাল জানান, বাপ-দাদার আমল থেকে চলে আসা মৃৎশিল্পের কাজ ছেড়ে তিনি এখন ‘লোকনাথ ফার্মেসি’ নামে একটি ওষুধের দোকান পরিচালনা করছেন। আগের পেশার তুলনায় বর্তমানে তিনি ভালো আছেন বলে জানান। 

তাঁর মতে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহজ শর্তে ঋণের সুযোগ থাকলে অনেক পরিবার এই পেশায় টিকে থাকার সাহস পেত।

তবে প্রতিকূলতার মধ্যেও ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন প্রবীণ কারিগর জগদিশ রুদ্রপাল। তাঁর বয়স আনুমানিক ৮০ থেকে ৮২ বছর। এ ছাড়া শান্তি রুদ্রপাল, জোতিষ রুদ্রপাল, নিশিকান্ত রুদ্রপাল, শিশুমন রুদ্রপাল, গোবিন্দ রুদ্রপাল, মন্টু রুদ্রপাল, নিতাই রুদ্রপাল, শান্ত রুদ্রপাল, দিলিপ রুদ্রপাল ও মাধবপুর উপজেলার হরিশ্যামা গ্রামের মেয়ে নিয়তি রানী রুদ্রপাল বিয়ে হয়ে আসার পর থেকে  প্রতিমা তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।এছাড়াও সবিতা, লিপি সহ আরো অনেক নারী শিল্পীরা কাজে ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে।

যোগাযোগের দুর্ভোগ সত্ত্বেও দূরদূরান্তের ক্রেতারা রুদ্রপালপাড়ায় তৈরি প্রতিমা কিনতে আসছেন। অগ্রিম বায়না দেওয়া ক্রেতারা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার রামপুর নোয়াগাঁও ও অলিপুর এবং সুনামগঞ্জের অষ্টগ্রামের সাপান্তর এলাকা থেকে নৌপথে প্রতিমা নিয়ে যেতে শুরু করেছেন।

এদিকে মোড়াকরি গ্রামে সুনীল রুদ্রপাল ও প্রমোদ রুদ্রপালের বাড়িতে দুটি এবং পাশের দাশহাটিতে শিবু দাশের বাড়িতে একটি দুর্গাপূজার আয়োজন চলছে।উৎসবকে ঘিরে প্রতিমা তৈরির কাজের পাশাপাশি চলছে সরবরাহের প্রস্তুতি।

রুদ্রপালপাড়ার মৃৎশিল্পীদের সমস্যা ও তাঁদের ঐতিহ্য সংরক্ষণের বিষয়ে হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. জি এম সরফরাজ বলেন,আমরা ঘটনাটি খতিয়ে দেখছি। অনুসন্ধানের পর প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে জানা যাবে। এরপর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কীভাবে সহযোগিতা করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।

মৃৎশিল্পীদের প্রত্যাশা, রুদ্রপালপাড়ায় যাতায়াতের জন্য টেকসই সড়ক নির্মাণ, সরকারি অনুদান ও সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা হলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে। তাঁদের মতে, মাটির সঙ্গে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা এই সম্পর্ক কেবল জীবিকার নয়, স্থানীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিরও অংশ।দেবী দুর্গার প্রতিমা গড়ার এই শিল্পে জড়িয়ে আছে বহু পরিবারের জীবন-জীবিকা, নারীদের শ্রম ও কয়েক শতকের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া না হলে কাঁচামালের ব্যয় ও যোগাযোগের দুর্ভোগে সেই ঐতিহ্য আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই রুদ্রপালপাড়ার কারিগরদের কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা- মাটির শিল্প বাঁচাতে কার্যকর সহযোগিতা ও উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা।

মৃৎশিল্পীদের প্রত্যাশা, রুদ্রপালপাড়ায় যাতায়াতের জন্য টেকসই সড়ক নির্মাণ, সরকারি অনুদান ও সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা হলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে। তাঁদের মতে, মাটির সঙ্গে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা এই সম্পর্ক শুধু জীবিকার নয়, এটি স্থানীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিরও অংশ। যথাযথ উদ্যোগের অভাবে সেই ঐতিহ্য 
হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।