প্রকাশিত : ১৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:১৪ (বুধবার)
দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে ঘিরে যত অভিযোগ

ছবি: সংগৃহীত

হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত থাকা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট প্রচার, সরকারবিরোধী তৎপরতায় অর্থায়ন এবং আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগে গ্রেপ্তার দুই অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা দেবাশীষ ও কাজী গুলশান আরাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করে পুলিশ। তবে এসব অভিযোগের বিরোধিতা করে তাঁদের আইনজীবীরা বলেছেন, রিমান্ড আবেদনে সুনির্দিষ্ট অপরাধের যথাযথ ব্যাখ্যা নেই।

গোয়েন্দা পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, গ্রেপ্তার দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও তাঁদের সহযোগীরা ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সাপোর্টার্স আলফা নম্বর # ১’ এবং ‘বিবিএম ট্রান্সপারেন্সি’ নামের দুটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পুলিশের অভিযোগ, এসব গ্রুপের মাধ্যমে দেবাশীষ ও গুলশান আরা সরকারবিরোধী তৎপরতার জন্য তহবিল সংগ্রহ করতেন। পাশাপাশি সহিংসতায় উসকানিমূলক ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করতেন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত ‘ইউনিটি কেয়ার’ ও ‘পাবলিক পার্লামেন্ট’ নামের দুটি প্ল্যাটফর্মের কার্যক্রমও তদন্তের আওতায় এসেছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, এসব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগে’র পলাতক শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছিল। পুলিশের অভিযোগ, আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন এবং রাষ্ট্রবিরোধী সংগঠিত তৎপরতা পরিচালনার উদ্দেশ্যে এসব যোগাযোগ করা হয়।

ফেসবুক পেজ ও অনলাইন প্রচারের অভিযোগ
দেবাশীষ ও গুলশান আরাকে গ্রেপ্তারের পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত বিভিন্ন কনটেন্টকেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।

পুলিশের রিমান্ড আবেদনে বলা হয়েছে, ‘কালআজকাল.কম’ নামের একটি ফেসবুক পেজের মাধ্যমে সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতায় উসকানি দেওয়ার মতো কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার করা হচ্ছিল। এ ছাড়া কাজী গুলশান আরার নামে থাকা একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্টের ঠিকানা উল্লেখ করে সেখান থেকে রাষ্ট্রবিরোধী প্রচার চালানোর অভিযোগ আনা হয়েছে।

পুলিশের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে গ্রেপ্তার দুই অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও তাঁদের সহযোগীরা সরকার এবং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক ও কুৎসামূলক প্রচারণা চালিয়ে আসছিলেন। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ থাকার অভিযোগও করা হয়েছে।

২০১৮ সালে গণভবনে যাওয়ার প্রসঙ্গ
গ্রেপ্তার দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তার অতীত রাজনৈতিক যোগাযোগের বিষয়েও রিমান্ড আবেদনে উল্লেখ করেছে পুলিশ। এতে ২০১৮ সালের ২৭ নভেম্বর জাতীয় নির্বাচনের আগে দেড় শতাধিক অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তার সঙ্গে গণভবনে গিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি একাত্মতা ও আনুগত্য প্রকাশের ঘটনায় কাজী গুলশান আরার অংশগ্রহণের কথা বলা হয়েছে।

ওই দিন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের গণভবনে গিয়ে শেখ হাসিনার প্রতি সমর্থন জানানোর ঘটনা সে সময় সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছিল।

পুলিশের দাবি, পরবর্তী সময়ে ১০১ জন সহযোগীকে নিয়ে ‘বঙ্গবন্ধু সেনা পরিষদ’ নামে একটি কমিটি গঠন করা হয়। এ সংগঠনের কার্যক্রমের সঙ্গে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও আনা হয়েছে।

রিমান্ড আবেদনে সংগঠনটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে বিদ্বেষ ছড়িয়ে দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন টক শোতে অংশ নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও অবজ্ঞা প্রকাশের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

পল্লবী থানার মামলায় আসামি ১০৩ জন
পল্লবী থানায় করা মামলায় দেবাশীষ ও গুলশান আরা ছাড়াও অজ্ঞাতনামা আরও ১০১ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলাটি করেছেন ডিবির পল্লবী জোনাল টিমের পুলিশ পরিদর্শক মো. আলী আকবর।

মামলায় দণ্ডবিধি, সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

আদালতে দেওয়া রিমান্ড আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা পাঁচটি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন। এগুলো হলো-সহযোগী আসামিদের পরিচয় ও অবস্থান শনাক্ত করা, রাষ্ট্রদ্রোহমূলক কাজে নিয়োজিত দেশি-বিদেশি ‘গুপ্তচরদের’ শনাক্ত করা, ডিজিটাল আলামত সংগ্রহ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহৃত অন্যান্য ওয়েবসাইট ও পেজ শনাক্ত করা এবং মামলার মূল ঘটনা উদ্‌ঘাটন করা।

এ ছাড়া অবৈধ অর্থায়নের উৎস অনুসন্ধানের কথাও বলা হয়েছে। পুলিশের দাবি, এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ এবং অন্যদের সংশ্লিষ্টতা যাচাই করতে দুই আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।

রিমান্ড আবেদনের বিরোধিতা আইনজীবীদের
আদালতে রিমান্ড শুনানির সময় পুলিশের অভিযোগের বিরোধিতা করেন অবসরপ্রাপ্ত দুই সেনা কর্মকর্তার আইনজীবীরা। তাঁদের বক্তব্য, আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট তথ্য ও ব্যাখ্যা রিমান্ড আবেদনে নেই।

গুলশান আরার আইনজীবী মোহাম্মদ মশিউর রহমান বলেন, একটি টক শোতে অংশ নিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করেছেন বলে তাঁর মক্কেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। কিন্তু টক শোতে তিনি এমন কী বক্তব্য দিয়েছেন, যার কারণে দেশ অস্থিতিশীল হয়ে গেল, তা উল্লেখ করা হয়নি। তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কী পাওয়া গেছে, রিমান্ড আবেদনে সেটিও বলা নেই।

দেবাশীষের আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মনসুর বলেন, তাঁর মক্কেলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অগ্রহণযোগ্য। রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করা হলেও কী কারণে এ অভিযোগ আনা হয়েছে এবং তাঁর অপরাধ কী, সে বিষয়ে রিমান্ড আবেদনে কোনো ব্যাখ্যা নেই।

অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন অর রশিদ বলেন, আসামিরা দেশকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে পতিত সরকারের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছিলেন। তাঁদের সঙ্গে দেশি-বিদেশি গুপ্তচরদেরও যোগাযোগ রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবীর দাবি, আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তাঁদের যোগাযোগ, কর্মকাণ্ড এবং সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তিদের বিষয়ে আরও তথ্য জানা সম্ভব হবে।