প্রকাশিত : ১৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:২১ (বুধবার)
সৌদি আরবে ক্ষেপনাস্ত্র হামলায় আহত ২৭ জনের মধ্যে ১৬ জন ওমরাহ যাত্রী

ছবি: সংগৃহীত

সৌদি আরবের রিয়াদে বাদশা খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আহত বাংলাদেশির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ জনে। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়।

আহত বাংলাদেশিদের মধ্যে ১২ জন প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন। বাকি আহতরা রিয়াদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১১ জন প্রবাসী কর্মী এবং ১৬ জন ওমরাহ যাত্রী।

স্থানীয় সময় গত শনিবার বিকেল সোয়া ৩টার দিকে বিমানবন্দরটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। দূতাবাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ ঘটনায় ১৩ জন নিহত ও ৩০৮ জন আহত হন।

সৌদি আরবে হুতি বিদ্রোহীদের হামলার জেরে ঢাকা থেকে সৌদি আরবগামী বিভিন্ন ফ্লাইটের ৯ হাজার ২৬৯ জন বাংলাদেশি যাত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। মঙ্গলবার সকালে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) এ তথ্য জানিয়েছে। তবে এ হিসাবে রিয়াদ এয়ারওয়েজের যাত্রীরা অন্তর্ভুক্ত নন।

নিহত দুই বাংলাদেশির একজন বগুড়ার শাহজাহানপুর উপজেলার মাদলা গ্রামের মো. শাহেদ আহম্মেদ। তিনি রিয়াদের ‘সাদ আল ঈসা কন্ট্রাক্টিং কোম্পানির’ জেদ্দা প্রকল্পে প্লাম্বার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

অপরজন কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার বদরপুর গ্রামের ওমরাহ ভিসাধারী মো. নাসরুল্লাহ বদরপুরি। তিনি রিয়াদ হয়ে জেদ্দায় যাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন।

আহত ২৭ বাংলাদেশির মধ্যে ১৫ জন রিয়াদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

রিয়াদ ন্যাশনাল গার্ড এ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন নওগাঁর সাফফাত রহমান। ওমরাহ যাত্রী সাফফাতের অবস্থা ‘অত্যন্ত সংকটজনক’। বর্তমানে বার্ন ইউনিটের আইসিইউতে ভর্তি রাখা হয়েছে তাঁকে। তাঁর ডান পা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, মুখমণ্ডল ঝলসে গেছে এবং ডান হাতে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে।

ওমরাহ যাত্রী কুমিল্লার মো. দাউদুল ইসলামও এ হাসপাতালে ভর্তি। তাঁর ডান পায়ের হাঁটু থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি আশঙ্কামুক্ত, তবে সুস্থ হতে সময় লাগবে।

ঢাকার মো. সাইদুল ইসলাম সৌরভও ওমরাহ যাত্রী। তাঁর অবস্থা গুরুতর। ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে তাঁর বাম পা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অস্ত্রোপচার করে তা কেটে ফেলতে হয়েছে। দূতাবাসের প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।

ঢাকার আরেক বাসিন্দা আবুল মনসুর মো. রিয়াজ উদ্দিনের দুই পায়ে ‘হালকা অস্ত্রোপচার’ করা হয়েছে। তিনি ‘মোটামুটি সুস্থ’ আছেন।

ঢাকার মো. আবদুল্লাহ এ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন। তাঁর দুই পা ভেঙে গেছে। ডান পায়ে রড লাগানো হয়েছে, বুকের ডান পাশে পুড়ে গেছে এবং মুখে নল দিয়ে অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে। তাঁর গোড়ালিতে অস্ত্রোপচার করা হবে।

ঢাকার আরমান হোসেনের পায়ে ও বাম হাতের কনুইয়ে কাচের টুকরো ঢুকেছিল। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সেগুলো বের করা হয়েছে। তাঁর অবস্থা উন্নতির দিকে।

এ হাসপাতালে ভর্তি ময়মনসিংহের মো. মাসুদের হাঁটু থেকে গোড়ালি পর্যন্ত মাংস ঝলসে গেছে। সফল অস্ত্রোপচার হলেও সুস্থ হতে সময় লাগবে।

এ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন যশোরের নাজমা আক্তার। বুকের বাম পাশে ক্ষেপণাস্ত্রের ভাঙা অংশ ঢুকে যাওয়ায় অস্ত্রোপচার করে তা বের করা হয়েছে। আঘাত গুরুতর হওয়ায় সম্পূর্ণ সুস্থ হতে সময় লাগবে।

একই জেলার মাহফুজ তাঁর মা নাজমা আক্তারের সঙ্গে ওমরাহ করতে গিয়েছেন। তাঁর হাত, বুক ও শরীরে হালকা আঘাত রয়েছে। তবে তিনি সুস্থ আছেন এবং আহত মায়ের পাশে রয়েছেন।

গাজীপুরের মো. ইমাদুল ইসলাম উরুতে আঘাত পেয়েছেন। তাঁর সফল অস্ত্রোপচার হয়েছে। দু-এক দিনের মধ্যে হাসপাতাল ছাড়বেন তিনি।

নড়াইলের মো. জামাল উদ্দিনের চোখের নিচে ক্ষেপণাস্ত্রের ছোট ভাঙা অংশ ঢুকে পড়ায় অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। তিনিও দু-এক দিনের মধ্যে হাসপাতাল ছাড়বেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কাজী নূরুল্লাহর ডান হাতের আঙুল ও দুই পা আগুনে ঝলসে গেছে। তাঁর শরীরে সফল অস্ত্রোপচার হয়েছে। বর্তমানে তিনি আশঙ্কামুক্ত।

নোয়াখালীর মো. ওমর ফারুকের দুই পা ও ডান হাতের মাংস খুলে পড়ার পর অস্ত্রোপচার ও সেলাই দেওয়া হয়েছে। তিনিও আশঙ্কামুক্ত।

সিলেটের ফয়েজ আহমদ নাঈমের মাথা, হাত ও পায়ে কাচের টুকরো ঢুকে যাওয়ায় সেলাই দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে তিনি আশঙ্কামুক্ত।

গাইবান্ধার মো. রফিক মিঞা মাথায় আঘাত পেয়েছেন। সেলাইয়ের পর তাঁর অবস্থার উন্নতি হচ্ছে।

প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ১২ জন
হামলায় আহত হয়ে প্রাথমিক চিকিৎসার পর হাসপাতাল থেকে বাসা বা হোটেলে ফিরেছেন ১২ জন। তাঁরা হলেন—হাফেজ হাসান (ঢাকা), মোহাম্মদ, ফয়সাল আহমদ আব্দুল হক (ঢাকা), ইসমাইল হোসেন, মো. মিসবাহ উদ্দিন হিরক, মো. রায়হান ইসলাম (ভোলা), সালমা আক্তার, মো. শাহাদাত হোসেন (নোয়াখালী), মোশাহিদ আহমেদ সৈকত (সিলেট), জাহিদ আহমদ (নোয়াখালী), সোবহ সাদেক মো. শাহজাহান সরকার এবং উমায়ের (চাঁদপুর)।

ঘটনার পর আটকে পড়া যাত্রীদের মধ্যে ১৭ জনকে ম্যারিয়ট হোটেল, ২৫ জনকে রেডিসন ব্লু এবং ৪০ জনকে রিয়াদ প্রিমিয়ার ফান্ডাসিয়ালের ডরমিটরিতে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছে বাংলাদেশ দূতাবাস।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রিয়াদ থেকে ঢাকাগামী সৌদি অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইনসের বিশেষ ফ্লাইট (এসভি-৮০৪) যোগে প্রায় ৪০০ বাংলাদেশি যাত্রীকে দেশে ফেরানোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা হয়েছে। যেসব যাত্রীর পাসপোর্ট হারিয়ে গিয়েছিল, তাঁদের জন্য জরুরি ট্রাভেল পারমিট দেওয়া হয়েছে।

বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে বিধিনিষেধের কারণে গত শনিবার রাত থেকে সোমবার মধ্যরাত পর্যন্ত বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি ও ট্রানজিট রুটে চলাচলকারী মোট ৬১টি ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত হয়েছে। এর মধ্যে ২২টি সরাসরি ফ্লাইট এবং ৩৯টি ট্রানজিট ফ্লাইট।

সরাসরি ফ্লাইটগুলোর মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ৯টি, ইউএস-বাংলার ২টি, সৌদিয়ার ৪টি এবং রিয়াদ এয়ারওয়েজের ৭টি রয়েছে। ট্রানজিট ফ্লাইটের মধ্যে ইন্ডিগো, এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজ, ফ্লাইদুবাই, সালাম এয়ার ও ইজিপ্ট এয়ারের ফ্লাইট রয়েছে।

এদিকে, চলমান পরিস্থিতিতে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা-রিয়াদ রুটের সব ফ্লাইট স্থগিত করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসও ২১ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা-রিয়াদ-ঢাকা রুটের সব ফ্লাইট বাতিল করেছে।

রিয়াদ এয়ারওয়েজের তথ্য পাওয়া গেলে ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীর মোট সংখ্যা হালনাগাদ করা হবে বলে জানিয়েছে বেবিচক।