ছবি: সংগৃহীত
নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ৩০ বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় নিয়ে দেশটির সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তিন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। সেখানে ২১ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠানো হয়। যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন হামলায় অন্তত ২০ বাংলাদেশির মৃত্যুর বিষয়ে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-১০ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহা. আসাদুজ্জামান। এ ঘটনায় মানব পাচার চক্রের অন্যতম হোতা জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমান (৫৫) ও আবু তাহের ওরফে লেন্টুকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।
এসআরবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৭ মে জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৩০ বাংলাদেশি রাশিয়ায় যান। নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাঁদের প্রতিশ্রুত চাকরিতে নিয়োগ না দিয়ে সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
পরে মাত্র ২১ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। এসআরবি কর্মকর্তা মোহা. আসাদুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশ থেকে নেওয়া ব্যক্তিদের যুদ্ধের উপযোগী শারীরিক সক্ষমতা, প্রশিক্ষণ কিংবা কৌশলগত প্রস্তুতি ছিল না।
তাঁদের কেন এত অল্প সময়ের প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধে পাঠানো হলো, সে বিষয়ে তদন্তে পাওয়া প্রাথমিক তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করতে তাঁদের একধরনের ‘শিকার’ হিসেবে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়ে থাকতে পারে। তাঁদের লক্ষ্য করে প্রতিপক্ষ ড্রোন হামলা চালালে সেই হামলার মাধ্যমে হামলাকারীদের অবস্থান শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হয় বলে ধারণা করছে সংস্থাটি।
এসআরবির তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের তিনটি ভাগে- প্রথম ভাগ, মধ্যভাগ ও শেষভাগে- মোতায়েন করা হয়েছিল। প্রথম দিনই ড্রোন হামলায় ১৭ জন নিহত হন। পরবর্তী সময়ে আরও তিনজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে ৩০ জনের মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর বিষয়ে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে এসআরবি।
জীবিত ব্যক্তিদের মধ্যে দুজন আহত অবস্থায় বাংলাদেশে ফিরেছেন। তাঁদের একজন রাজন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনের আঘাতে তাঁর কোমর ভেঙে যায় এবং শরীরের নিচের অংশ অবশ হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় বুকের ওপর ভর দিয়ে প্রায় চার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তিনি ক্যাম্পে পৌঁছান।
বাকি আটজনের মধ্যে দুজন মস্কোর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অন্য ছয়জন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছেন বলে জানিয়েছে এসআরবি।
এসআরবি জানিয়েছে, মানব পাচারের এ ঘটনায় বাংলাদেশি চক্রের পাশাপাশি রাশিয়ার ইগর নামের এক ব্যক্তি এবং কিরগিজস্তানের জুলিয়া নামের এক নারী জড়িত বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও অভিযান চলছে। চক্রের আরেক সদস্য মোস্তাফিজুরকেও গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হচ্ছে।
মোহা. আসাদুজ্জামান বলেন, প্রাথমিক অনুসন্ধানে তাঁরা জানতে পেরেছেন, রাশিয়ার যুদ্ধে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের একই ধরনের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ থেকেও বিভিন্ন সময় লোকজন গেছেন। তাঁদের মধ্যে গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, জামালপুর, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী ও গাজীপুরের বাসিন্দারা রয়েছেন।
এসআরবির এই কর্মকর্তা জানান, ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। তাঁদের কেউ কেউ ঋণ করে বিদেশে গিয়েছিলেন। এখন তাঁদের পরিবারের অনেকে স্বজনের মৃত্যুর খবর পেলেও মরদেহ দেখা কিংবা দেশে ফিরিয়ে আনার সুযোগ পাচ্ছেন না।
বিদেশে চাকরির প্রলোভনে অর্থ লেনদেনের আগে সতর্ক থাকা এবং যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বৈধতা যাচাই করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বিদেশে কর্মসংস্থানের আশায় বিপুল অর্থ ব্যয় করে যাওয়া ব্যক্তিদের এভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর অভিযোগ মানব পাচার ও বিদেশে কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করেছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত, জীবিত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।