ছবি: সংগৃহীত
বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, আধুনিক শিল্পায়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক সম্পর্ক জোরদারের লক্ষ্য নিয়ে মালয়েশিয়ায় শুরু হয়েছে চার দিনব্যাপী সেলাঙ্গর বিনিয়োগ ও শিল্পপার্ক প্রদর্শনী (স্পার্ক) ২০২৬।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) কুয়ালালামপুর কনভেনশন সেন্টারে (কেএলসিসি) জমকালো অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সেলাঙ্গর আন্তর্জাতিক ব্যবসা সম্মেলনের (এসআইবিএস) উদ্বোধন করেন রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী দাতুক সেরি আমিরুদ্দিন শারি। আগামী ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে এ আয়োজন।
সম্মেলনের অন্যতম আকর্ষণ স্পার্ক ২০২৬ প্রদর্শনীতে বাংলাদেশসহ আটটি দেশের প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। মোট ১৯৮টি স্টলে তুলে ধরা হচ্ছে বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা, শিল্পায়ন পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক সুযোগ। অংশগ্রহণকারী অন্য দেশগুলো হলো জাপান, ফিলিপাইন, কেনিয়া, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ড।
কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশনের বিশেষ উদ্যোগ ও সহযোগিতায় এবারের প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছে ইনভেস্ট বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ব্রেইন স্টেশন ২৩-এর মালয়েশীয় সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘ব্রেইন স্টেশন ২৩ টেক এসডিএন বিএইচডি’।
এ অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের সফটওয়্যার প্রকৌশল, ডিজিটাল উদ্ভাবন ও আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিসেবা দেওয়ার সক্ষমতা তুলে ধরা হচ্ছে। ব্যাংকিং, আর্থিক প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও খুচরা বিক্রিসহ বিভিন্ন খাতে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে সেবা দেওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে ব্রেইন স্টেশন ২৩-এর।
প্রদর্শনীতে প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব চাহিদাভিত্তিক সফটওয়্যার, মুঠোফোনের অ্যাপ, স্বয়ংক্রিয়করণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উপাত্ত বিশ্লেষণ এবং বর্ধিত ও ভার্চ্যুয়াল বাস্তবতাভিত্তিক প্রযুক্তি সমাধান প্রদর্শন করছে। এসব প্রযুক্তি বিদেশি দর্শনার্থী ও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ তৈরি করছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে প্রযুক্তিসেবা রপ্তানি এবং দীর্ঘমেয়াদি যৌথ প্রকল্প সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
প্রদর্শনীর প্রথম দিন বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন পরিদর্শন করেন মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মঞ্জুরুল করিম খান চৌধুরী। এ সময় মালয়েশিয়ার উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সদস্যরাও প্যাভিলিয়ন ঘুরে দেখেন।
উদ্বোধনী বক্তব্যে সেলাঙ্গরের মুখ্যমন্ত্রী আমিরুদ্দিন শারি রাজ্যটির শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ কৌশলের পরিবর্তনের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সেলাঙ্গর আর শুধু কম খরচে পণ্য উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে থাকতে চায় না। নিজস্ব উদ্ভাবন, প্রযুক্তি ও মেধাস্বত্বের ভিত্তিতে শিল্পের বিকাশ ঘটিয়ে ‘মালয়েশিয়ায় তৈরি’ ধারণা থেকে ‘মালয়েশিয়ায় নকশা ও প্রকৌশল’ভিত্তিক অর্থনীতিতে প্রবেশ করতে চায় রাজ্যটি।
বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, যারা কেবল সস্তা জমি কিংবা কম মজুরির শ্রম খুঁজছেন, সেলাঙ্গর তাদের লক্ষ্য করে বিনিয়োগ আকর্ষণ করছে না। বরং উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ জনশক্তি, উদ্ভাবন এবং টেকসই অংশীদারত্ব নিয়ে আসতে আগ্রহী বিনিয়োগকারীদের স্বাগত জানানো হচ্ছে।
বিশেষ করে অর্ধপরিবাহী চিপের নকশা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং পরিবেশবান্ধব উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পের আন্তর্জাতিক কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সেলাঙ্গর।
আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য বিনিয়োগপ্রক্রিয়া সহজ করা এবং শিল্পায়নের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে তিনটি কৌশলগত উদ্যোগ চালু করেছে ইনভেস্ট সেলাঙ্গর বেরহাদ। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দাতুক হাসান আজহারি ইদ্রিস উদ্যোগগুলো উদ্বোধন করেন।
এগুলোর মধ্যে রয়েছে সেলাঙ্গরের বিনিয়োগ নির্দেশিকা ও প্রচারমূলক প্রকাশনা, দক্ষ জনশক্তির বাজার ও সক্ষমতা নিয়ে বিশেষায়িত প্রতিবেদন এবং ‘ইনভেস্ট সেলাঙ্গর প্রেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক’ কর্মসূচি।
আয়োজকদের মতে, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী শিল্পপার্ক নির্বাচন, দক্ষ কর্মীর প্রাপ্যতা সম্পর্কে ধারণা লাভ এবং বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় তথ্য সহজে পাবেন।
চার দিনব্যাপী এ আয়োজন বৈশ্বিক বিনিয়োগকারী, শিল্পপার্ক উন্নয়নকারী এবং উৎপাদন খাতের প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ও ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করছে।
প্রদর্শনীতে মালয়েশিয়ার শীর্ষস্থানীয় আবাসন ও শিল্পপার্ক উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠান ইকোওয়ার্ল্ড, সিমে ডার্বি প্রপার্টি, সানওয়ে রাওয়াং সিটি ও এনসিটি গ্রুপ অংশ নিয়েছে। পাশাপাশি স্যান্ডিস্ক, নেক্সপেরিয়া, অপস্টার ও স্কাইচিপসহ ১৪০টিরও বেশি প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান তাদের আধুনিক প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন তুলে ধরছে।
এবারের সম্মেলনে চীন, বাংলাদেশ, কানাডা, জার্মানি, ভারত ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ৩৫ জন উচ্চপর্যায়ের আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিকে আতিথ্য দিচ্ছে ইনভেস্ট সেলাঙ্গর। তাঁদের জন্য একান্ত ব্যবসায়িক বৈঠক, শিল্পপার্ক সরেজমিনে পরিদর্শন এবং ব্যবসায়িক যোগাযোগ তৈরির বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
শিল্পায়নের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়নও এবারের সম্মেলনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেলাঙ্গর পানি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ‘দূষিত পানি নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনার নীতি’ এবং পানি পুনর্ব্যবহারের উদ্যোগ বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। এ ছাড়া জাপানের টোকিও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প সহায়তা কেন্দ্রের সহযোগিতায় আন্তসীমান্ত ব্যবসা নিয়ে বিশেষ সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে।
প্রদর্শনীর অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে ১৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে ‘পারমাণবিক শক্তি: আসুন আলোচনা করি’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সেমিনার। ওয়ার্ল্ডওয়াইড হোল্ডিংস বেরহাদের আয়োজনে এতে মালয়েশিয়ার পরমাণু শক্তি উপদেষ্টা পরিষদের প্রতিনিধি এবং জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা অংশ নেবেন। সেমিনারে দেশটির ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা ও পারমাণবিক শক্তির বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা এবং সম্ভাব্য কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরার কথা রয়েছে।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, স্পার্ক ২০২৬ মালয়েশিয়ার শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি বাংলাদেশসহ অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে বাণিজ্য ও প্রযুক্তিসেবা সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ তৈরি করবে।