ছবি: সংগৃহীত
ভারতে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন বিক্ষোভে পুলিশের হস্তক্ষেপ, গণগ্রেপ্তার এবং অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ সামনে এসেছে। বিশেষ করে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নেতৃত্বাধীন যুব আন্দোলনের বিক্ষোভ ঘিরে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং বিক্ষোভকারীদের ওপর নজরদারির বিষয়গুলোও আলোচনায় এসেছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১০ অক্টোবর দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আয়োজিত বিক্ষোভ ঠেকাতে দুই হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশন বলেছে, মৃত, অন্যত্র চলে যাওয়া এবং যাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি—এমন ভোটারদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ভুলভাবে নাম বাদ পড়লে পুনরায় নিবন্ধনের সুযোগও রয়েছে বলে জানিয়েছে কমিশন।
দেশজুড়ে বাড়ছে বিক্ষোভ
আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা (এসিএলইডি)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২ অক্টোবর পর্যন্ত ভারতে ১৮ হাজার ৬২৯টি বিক্ষোভের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৭ হাজার ৬৯১টি ছিল প্রতিবাদ কর্মসূচি, যার বেশির ভাগ শান্তিপূর্ণ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ। ৬৮৭টি ঘটনাকে সহিংস বিক্ষোভ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্তত এক হাজার ২০০টি বিক্ষোভে পুলিশ হস্তক্ষেপ করেছে।
২০১৬ সালে ভারতে বিক্ষোভের সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ৬৪২। ২০২৪ সালে তা বেড়ে ২২ হাজার ১৩০-এ পৌঁছায়। চলতি বছরের আগস্টে দেশজুড়ে আড়াই হাজারের বেশি বিক্ষোভ হয়। ওই মাসে দুই শতাধিক বিক্ষোভে বলপ্রয়োগের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দিল্লিতে সিজেপির বড় কর্মসূচিগুলো অনুষ্ঠিত হলেও অন্যান্য রাজ্যেও বিক্ষোভের সংখ্যা বেড়েছে। বিশেষ করে তেলেঙ্গানা, তামিলনাড়ু ও অন্ধ্রপ্রদেশে প্রতিবাদ কর্মসূচির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বলপ্রয়োগের আগে সতর্কবার্তার বিধান
ভারতের সংবিধানে শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হওয়ার অধিকার স্বীকৃত। তবে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ব্যবহৃত পদ্ধতি এবং সেগুলোর প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পুলিশি নির্দেশিকা অনুযায়ী, বেআইনি সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করার আগে সাধারণত বিক্ষোভকারীদের সতর্ক করা এবং পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করা উচিত। প্রয়োজন হলে পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যূনতম বলপ্রয়োগ করতে হবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে বলপ্রয়োগ বন্ধ করার বিধানও রয়েছে।
বিক্ষোভকারীরা ছত্রভঙ্গ হতে অস্বীকৃতি জানালে আইন অনুযায়ী তাঁদের আটক করা যেতে পারে। তবে বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা, আনুপাতিকতা এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। রয়টার্স জানিয়েছে, এসব নির্দেশিকা সাম্প্রতিক বিক্ষোভে কতটা অনুসরণ করা হয়েছে, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
ব্যারিকেড থেকে লাঠিচার্জ
বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতিগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যারিকেড স্থাপন ও লাঠিচার্জ। ব্যারিকেডের মাধ্যমে নির্দিষ্ট এলাকায় প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বিক্ষোভকারীরা ব্যারিকেড অতিক্রমের চেষ্টা করলে পরিস্থিতি অনুযায়ী পুলিশ ব্যবস্থা নিতে পারে।
লাঠিচার্জের সময় বাঁশ বা পলিকার্বনেটের লাঠি ব্যবহার করা হয়। তবে এ পদ্ধতিতে গুরুতর আহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। প্রতিবেদনে ভারতের জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরোর তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে লাঠিচার্জে ৬৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে দিল্লিতে নারী বিক্ষোভকারীদের ওপর লাঠিপেটার ঘটনাও মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের নজরে এসেছে। আন্তর্জাতিক নির্দেশিকায় মাথা, ঘাড়, মেরুদণ্ড ও পেটের মতো সংবেদনশীল স্থানে আঘাত এড়িয়ে চলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
জলকামান ও কাঁদানে গ্যাসের ব্যবহার
জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে ভারতীয় পুলিশ জলকামান ও কাঁদানে গ্যাসও ব্যবহার করে। জলকামানের উচ্চচাপের পানির ধারা আঘাতের কারণ হতে পারে। অন্যদিকে, কাঁদানে গ্যাস চোখ ও ত্বকে জ্বালাপোড়া এবং শ্বাসকষ্ট সৃষ্টি করতে পারে।
নির্দেশিকা অনুযায়ী, কাঁদানে গ্যাস সরাসরি কোনো ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে ছোড়া উচিত নয়। বদ্ধ বা সীমিত জায়গায় এ ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করলে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
মানবাধিকারকর্মীদের উদ্বেগ, জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার এসব পদ্ধতি প্রয়োগের সময় প্রয়োজনীয় সতর্কতা না মানলে সাধারণ মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
পেলেট গান ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে বিতর্ক
ভারতে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে পেলেট গানের ব্যবহার দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কের বিষয়। বিশেষ করে ২০১৬ সালে কাশ্মীরে পেলেট গানের আঘাতে বহু মানুষের গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা সামনে আসার পর এ অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়।
জাতিসংঘের নির্দেশিকায় আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ধাতব পেলেট ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়েছে। এ ধরনের অস্ত্রের আঘাতে চোখসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরও কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। জীবন বা সম্পত্তির ওপর আসন্ন গুরুতর বিপদ দেখা দিলে শেষ উপায় হিসেবে তা ব্যবহারের বিধান রয়েছে। এ ক্ষেত্রেও সতর্কবার্তা, প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় নজরদারি ও আটক
বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাইয়ে দিল্লির যুব বিক্ষোভে পুলিশ ‘ইক্ষণ’ নামের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহার করে। এর মাধ্যমে জনতার আকার পর্যবেক্ষণ এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে শনাক্ত করার চেষ্টা করা হয়।
অক্টোবরের বিক্ষোভে পুলিশের শরীরে সংযুক্ত ক্যামেরা ব্যবহারের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দিল্লিভিত্তিক ডিজিটাল অধিকার সংগঠন ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশন মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তির নির্ভুলতা, আইনি ভিত্তি ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
বিক্ষোভের সময় চলাচলে বিধিনিষেধ এবং ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনাও ঘটেছে। এসব ব্যবস্থা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার যুক্তিতে নেওয়া হলেও সেগুলোর প্রয়োজনীয়তা ও প্রভাব নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
সাংবাদিকদের আটক নিয়েও উদ্বেগ
বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের আটক ও হয়রানির অভিযোগও উঠেছে। রয়টার্সের ১২ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়, দিল্লিতে বিক্ষোভের খবর সংগ্রহের সময় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রায় তিন ডজন সাংবাদিককে কয়েক ঘণ্টার জন্য আটক করা হয়েছিল। কয়েকজন সাংবাদিকের অভিযোগ, তাঁদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করা হয় এবং মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সাংবাদিকদের কাজের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করা হয়েছিল। আদালত সাংবাদিক ও আইনজীবীদের দায়িত্ব পালনে বাধা না দেওয়ার পক্ষে নির্দেশ দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কিছু সাংবাদিকের দাবি, আদালতের নির্দেশের পরও আটকের ঘটনা ঘটেছে।
তদন্তের দাবি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন বিক্ষোভে বলপ্রয়োগের অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালনের সময়ও পুলিশের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড ও প্রযোজ্য আইন অনুসরণ করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা সংশোধনে পক্ষপাতের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ক্ষমতাসীন বিজেপিও বিরোধীদের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
বিক্ষোভে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, গণগ্রেপ্তার এবং অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার রক্ষা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নজরদারি প্রযুক্তির ব্যবহারে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলোও আলোচনায় রয়েছে।