ছবি: সংগৃহীত
কক্সবাজারের সমুদ্র দেখতে গিয়েছিলেন পরিবারের সবাই মিলে। অসুস্থ স্ত্রী, ছোট্ট সন্তান, শ্যালক-শ্যালিকাদের নিয়ে কাটানোর কথা ছিল আনন্দের কিছু মুহূর্ত। কিন্তু সেই ভ্রমণই হয়ে উঠল এক পরিবারের জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায়। কাজের প্রয়োজনে আগেভাগে ফিরে এসেছিলেন নূর আলম। জানতেন না, তাঁর ফেলে আসা প্রিয়জনদের আর কখনো জীবিত দেখতে পাবেন না। শনিবার সকালে সংবাদমাধ্যমে আগুনের খবর দেখে খোঁজ নিতে গিয়ে জানতে পারলেন, স্ত্রী-সন্তানসহ তাঁর পরিবারের ছয়জনই আর বেঁচে নেই।
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকতে কাঠের তৈরি একটি রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে নিহত হয়েছেন একই পরিবারের ছয়জনসহ অন্তত ১০ জন। শনিবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে মেরিন ড্রাইভ সড়কসংলগ্ন টুপটুপ রিসোর্টে এ আগুন লাগে। আনন্দের ভ্রমণে যাওয়া মানুষগুলোর জন্য সমুদ্রতীরের সেই সকালটি পরিণত হয় মৃত্যুর বিভীষিকায়।
নিহত ছয়জন হলেন চুয়াডাঙ্গায় কর্মরত ওষুধ কোম্পানি ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের জ্যেষ্ঠ বিপণন কর্মকর্তা নূর আলমের স্ত্রী ফারিয়া কবির (৩৩), তাঁদের পাঁচ বছর বয়সী সন্তান ফাইজান নূর, নূর আলমের শ্যালক নাসির উদ্দিন (২৫) এবং তিন শ্যালিকা ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩)। নিহত আরেকজন নাফিসতা মীম (২৭)। এ ছাড়া নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. নাফিস তেহামীও রয়েছেন। বাকি তিনজনের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
নূর আলমের বাড়ি বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বড়কোঠা ইউনিয়নের গাজিরপাড় গ্রামে। কর্মসূত্রে প্রায় আট বছর ধরে চুয়াডাঙ্গায় থাকেন তিনি। পেশাগত প্রয়োজনে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে চুয়াডাঙ্গা শহরের দক্ষিণ হাসপাতালপাড়ার একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন।
নূর আলম জানান, তাঁর স্ত্রী বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। তারপরও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটাতে স্ত্রী-সন্তান ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে নিয়ে কক্সবাজার বেড়াতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বুধবার স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে চুয়াডাঙ্গা থেকে ঢাকায় যান তাঁরা। পরদিন বৃহস্পতিবার শ্যালক-শ্যালিকাসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হন।
কক্সবাজারে পৌঁছানোর পর পেশাগত কাজের প্রয়োজন দেখা দেওয়ায় শুক্রবার চুয়াডাঙ্গায় ফিরে আসেন নূর আলম। স্ত্রী-সন্তানসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের রেখে আসার সময় হয়তো ভেবেছিলেন, কাজ শেষ করে আবার তাঁদের কাছে ফিরবেন। কিন্তু শনিবার সকালে গণমাধ্যমে রিসোর্টে আগুন লাগার খবর দেখে খোঁজ নিতে গিয়ে জানতে পারেন, নিহত ছয়জনই তাঁর পরিবারের সদস্য।
একদিকে কর্মস্থলের দায়িত্ব, অন্যদিকে পরিবারের সঙ্গে কাটানো আনন্দের সময়-এই দুইয়ের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই বেছে নিয়েছিলেন পেশাগত প্রয়োজনকে। সেই সিদ্ধান্ত যে তাঁকে এমন এক দুঃসহ বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করাবে, তা কি কল্পনাও করেছিলেন নূর আলম?
যে স্ত্রীকে নিয়ে সমুদ্র দেখতে গিয়েছিলেন, যে সন্তানকে ঘিরে ছিল ভবিষ্যতের স্বপ্ন, যে শ্যালক-শ্যালিকাদের সঙ্গে ছিল পারিবারিক বন্ধন—তাঁদের কেউই আর ফিরবেন না। একটি অগ্নিকাণ্ড কেড়ে নিয়েছে তাঁর সংসারের সবচেয়ে আপন মানুষগুলোকে।
নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে নূর আলমের পরিবারের সদস্যদের বাইরে অন্যরা রাজধানীর বনশ্রী ও খিলগাঁও এলাকায় বসবাস করতেন। অগ্নিকাণ্ডে নিহত নাফিস তেহামী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের ‘চাইনিজ ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড কালচার’ প্রোগ্রামের শিক্ষার্থী ছিলেন। লায়লা জাহান নাবিলা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
এ ঘটনায় আহত ছয়জন কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাঁরা হলেন মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তাঁর স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), ইসমাইল হোসেন মাসুদ (৩০), তাঁর স্ত্রী মেহেরুন নেছা (২৭), মান্নান (৩৪) ও সামিদা (৩২)।
আহত ইসমাইল হোসেন ও তাঁর স্ত্রী মেহেরুন নেছা সম্পর্কে ফারিয়া কবিরের মামা-মামি। তাঁদের বাড়ি চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার দক্ষিণ ঠেটালিয়া গ্রামে। হতাহতদের স্বজন ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. আহাদ এসব তথ্য জানিয়েছেন।
আহাদ জানান, শনিবার সকালে তাঁদের ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই যাত্রার আগেই ঘটে গেল ভয়াবহ দুর্ঘটনা। একসঙ্গে এতজন স্বজনকে হারানোর শোক ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। পরিবারের সদস্যদের এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না স্বজনেরা।
স্থানীয় ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে মেরিন ড্রাইভ সড়কসংলগ্ন ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকতের টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পরে স্থানীয় বাসিন্দারা পুলিশের সহায়তায় আগুন নিয়ন্ত্রণ ও উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন।
বেলা সোয়া দুইটার দিকে ফায়ার সার্ভিসের কক্সবাজারের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসেন ১০ জনের মরদেহ উদ্ধারের তথ্য নিশ্চিত করেন।
সমুদ্রের কাছে ছুটি কাটাতে যাওয়া মানুষগুলোর জন্য যে সফর ছিল আনন্দ, স্বজনদের সঙ্গে সময় কাটানো আর স্মৃতি তৈরির উপলক্ষ, সেই সফরই কেড়ে নিল একাধিক প্রাণ। কোথাও অপেক্ষায় থাকা স্বজনেরা হারালেন প্রিয় মানুষকে, কোথাও একটি শিশুর ভবিষ্যৎ থেমে গেল, আর নূর আলমের জীবনে নেমে এল এমন এক শূন্যতা, যার গভীরতা কোনো ভাষায় মাপা সম্ভব নয়।
সমুদ্রের ঢেউ হয়তো আগের মতোই আছড়ে পড়ছে পাটুয়ারটেকের তীরে। কিন্তু সেই তীরের আগুনে পুড়ে যাওয়া একটি পরিবারের স্বপ্ন, ভালোবাসা আর একসঙ্গে বেঁচে থাকার গল্প আর কখনো আগের জায়গায় ফিরবে না।